কল্যাণ চক্রবর্তী
আমাদের ভারত, ১ মে: সিলেটে বৃষ্টির মেঘ কাগেশ্বর। একটি সিলেটি ধাঁধা ছিল, “কালো গাই কাগেশ্বর/ উড়া করে পবন ভরে।/ মুড়ুৎকরি ডাক ছাড়ি/ শত নালে দুধ পড়ে।” মেঘ থেকে দুধের ধারার মতো বৃষ্টি পড়ার কথা। আমরা সেটাই ২৪ পরগণায় ছোটোবেলায় শুনেছি “কালো গরু কাল শিরে দুধ দেয় পাঁচ সের/ যখন গরু হামলায় পাড়ার লোক সামলায়।”
তখন একটাই চব্বিশ পরগণা। আর এই অখণ্ড জেলার খড়দহে বসে ছোটোবেলা থেকেই মেঘ নিয়ে একটা দারুণ অনুভূতি মনের মেঘে খেলা করে বেড়াতো। ময়মনসিংহ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা হারামামির শাশুড়ী হঠাৎ-হঠাৎ বৃষ্টি এলেই বলতেন, “আকাশ থেকে নামল বুড়ি কাঁথা কম্বল লইয়া। আমার কাঁথাখান কে তুলবো বইয়া?” আমরা ছোটোরা তাঁকে চিল্লিয়ে বলতাম, “ও বুড়ি তোমার কে হয় গো?” পরে শিষ্ট সাহিত্যে বুড়ির খানিকটা স্বরূপ জানতে পেলাম, “মনে জানি ভগবান মহেশের লীলা/ মহীতলে মাঘ শেষে মেঘরস দিলা।” মেঘরস মানে বৃষ্টি।
কিশোরগঞ্জ থেকে কিশোর নান্টু যখন এসেছিলো, ওর ধারণা ছিল, দেবতা মেঘে টান দিলে তবেই বৃষ্টি পড়ে। কিন্তু নানান কাজে দেবতার টান দেওয়া হয়ে ওঠে না, তাই সময়মতো বৃষ্টি পাই না আমরা। আবার টানা দিয়ে বেঁধে রেখে দেবতা যদি আনমনা হয়ে যান, তো জল জমে যাবে। নান্টু একদিন মেঘবৃষ্টির ছড়া আবৃত্তি করল, “এৎ গাছ টান দিলে বেত গাছ লড়ে/ কুক করে ডাক দিলে ঝনঝনাইয়া পড়ে।” আমরাও ঝনঝনিয়ে হেঁসে গড়াগড়ি খেলাম৷ নান্টুর মুখ লাল। কী যে মজার আলোচনা হত ছোটোবেলায় আটঘরি ভাড়াটিয়ার ছেলেমেয়েদের মধ্যে! এখন ভাবি কত সব মিশ্র কল্পনা নিয়ে বড় হয়েছি। পূর্ববঙ্গে হিন্দু নির্যাতনের ফলে নানান জেলার মানুষ এপার বাংলায় এসে এক একটি ক্লাস্টারে মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। সব দুর্গতি আর খারাপের মধ্যে এটাই একমাত্র সদর্থক প্রাপ্তি ছিল কচিকাঁচাদের।
বৃষ্টি আসার লক্ষণ দেখা দিতেই আমরা চিল্লিয়ে বলতাম, “আয় বৃষ্টি ঝেঁপে।” তারপর দেখি রহড়া বাজারের দোকানিরা গেঞ্জি তুলে মস্ত ভুঁড়ি বার করে অশান্ত কৃষ্ণ-কালো মেঘকে বলছে, “আয় আয়…।” ছোটোরা তো বলতাম। বড়দের মেপে কথা বলতে হয় তো! তাই ধান মেপে দিলে নিজের জন্য পাছে কম পড়ে! ফ্রি বৃষ্টি যদি হয় তো হোক! এখন ভাবি গাছ লাগাবো না, জল ভরবো না, বৃষ্টি চাইবো। মগের মুল্লুক নাকি!
খড়দার মধ্যেই একটা বৃষ্টি-সংস্কৃতির আবহ তখন দেখেছি। বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছিল ‘মেঘ্যারানির কুলো নামানো’। নমঃশূদ্র হরিমতি দিদি টালির বাসাবাড়িতে একবার এই ব্রত করলেন। এটাকে বলা যেতে পারে ইমিটেটিভ ম্যাজিক। লোকসংস্কৃতি ও বিশ্বাস-সংস্কারের মূল ভিত্তিভূমি। আমি যা করবো, বাস্তবে সেটাই ঘটবে এবং ব্রতপালন করেই তা ঘটানো যাবে, এটাই মূল থিয়োরি। বৃষ্টির অনুকরণ মূলক জাদুপ্রক্রিয়া। অনেক দিন বৃষ্টির অভাবে সবাই হাঁসফাঁস করছি। এক বৈশাখের বিকেলে হরিদির বর টালির চালে উঠলেন এক বালতি জল নিয়ে। ঘটি দিয়ে জল ঢালছেন তো ঢালছেন। সমস্ত দিন উপবাসী থেকে হরি দি নীচে লালপেড়ে শাড়ি পরে কুলো দিয়ে টালি থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা বরণ করে নিচ্ছেন। তলার মাটি ক্রমশ ভিজে যাচ্ছে। হরিদির বর কুয়ো থেকে জল তুলে আরও কয়েক বালতি ঢাললেন চালে। হরি দির ছেলে খোকা, মেয়ে সুন্দরী, কৃষ্ণা, জ্যোৎস্নাদের সঙ্গে আমরাও ছোটোরা টলির ফোঁটা ফোঁটা জলে ভিজছি। হরি দি বলেই চলছেন, “আয়রে আয় মেঘ্যারানি/তোরে দিমু জলপানি। আয়রে আয় মেঘ্যারানি/তোরে দিমু ডাবেরপানি।” মুসলমান ছাড়া জলকে ‘পানি’ বলতে দেখেছিলাম কোনো হিন্দু রমণীকে।
আমরা ছোটোরা এক মজার আয়োজন করেছিলাম আরও কিছু আগে। সেটা হল ব্যাঙের বিবাহের আয়োজন। পাড়ায় তখন একঝাঁক সম বয়সী বাচ্চা। নমুদির এঁদো পুকুর পাড়ে ঢিল মারতেই বুঝতে পেরে গেলাম কোথায় কোথায় থপথপিয়ে ব্যাঙ দৌড়লো। একঝাঁক কিশোর ঝপাৎ করে পুকুরে নেমে ধরে ফেললাম দুটো সোনা ব্যাঙ। ব্যাঙের জগতে যত কৌলিন্য সোনা ব্যাঙের। আমরা বলতাম ফর্সা ব্যাঙ। কুনো ব্যাঙের গায়ে আঁচিল, ওদের নাকি কুষ্ঠ হয়েছে। কুষ্ঠ রোগীকে সৎকার না করলে অন্যদের পরজন্মে কুনোব্যাঙ হয়ে জন্মাতে হবে! তা সোনাব্যাঙ ধরা হয়ে গেলে ঘেঁটুফুলের মালা গেঁথে দুজনের গলায় পড়ানো হল। আগেই মশা মেরে ঘেঁটুপাতায় আধমরা করে রেখেছি। নানান লৌকিক ছড়া বলে, কাঁসর পিটিয়ে, ঘন্টা নেড়ে দুই ব্যাঙের মালাবদল হল। তারপর উপবাসী ব্যাঙের মুখ ‘হাঁ’ করে মশা খাওয়ানো হল। তখনও বিকেলের পড়ন্ত সূর্য। হঠাৎ ঈশান কোণে কালোর আভা। আমরা কানাকানি করছি। “ঈশান কোণেতে ওই যে ঝড়ের বাণী/ গুরু গুরু রবে কী করিছে কানাকানি।” নামলো কী তবে? মেঘের দেবতা পাঠালো কী যৌতুক? হবে কী কজ্জল বিকেল? সুধীর চীৎকার করে গাইছে, “হাঁড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘা, মেঘে হাড়িয়া মেঘের নাতি, / গিস্সি আইসে দেওয়ার ঝাড়ি হে।” ওর বাবা ভদ্রেশ্বর জোয়াদ্দার বাড়িতেই একবার হাঁড়িয়া বা চাল-চোয়ান মদ বানিয়েছিলেন, শুনেছিলাম। তারমানে হাঁড়িয়া মেঘ কী ওরকমই দেখতে? ক্রমে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘে ভরে গেলো চতুর্দিক। আকাশে ধুমধুম, যেন হাজার হাজার বড় হাঁড়ি ভাঙছেন কোনো দেবতা। সুনির্মল বসুর কবিতা আবৃত্তি শুরু করেছি ওরই মধ্যে, “মেঘে মেঘে ঠোকাঠুকি/ কড়্ কড়্ শব্দ,/ভয় পেয়ে খোকাখুকি/ নির্বাক নিঃস্তব্ধ।” সবার বাড়ি থেকে ছুটে এসেছেন মা৷ আমরা রণেভঙ্গ দিলাম৷ পরে জানলাম, কালবৈশাখীর ঝড় বৈশাখে মাঝেমধ্যেই হয়, এর সঙ্গে ব্যাঙের বিয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
একটা কথাই শুধু বলতে বাকী রয়ে গেলো। ওই দিন আমরা ব্যাঙের বিবাহ উপলক্ষে কী খেয়েছিলাম! আমাদের মেনুতে ছিল, জীবনবাবুর বাড়ির বাগান থেকে তুলে আনা নোনাফল আর গোড়াই-বুকাইদের বাড়ির ধবধবে জামরুল। আর কখনও ব্যাঙের বিয়ে দেওয়া হয়নি যদিও। তবে কাকতালীয় ভাবে মেঘের দেবতা কিন্তু সেদিন একমেঘ বৃষ্টি পাঠিয়েছিলেন। ওটাই আমাদের অনেকদিন মনে ছিল।

