রাজেন্দ্রলাল রায়ের কাটা মাথা একটি রুপার থালায় সাজিয়ে গোলাম সরোয়ারকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। গোলাম সারোয়ারের নির্দেশে তারই দুই সেনাপতি রাজেন্দ্রলাল রায়ের সুন্দরী মেয়েকে বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করে।
নোয়াখালীর এই মুসলিম আক্রমণের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল, মুসলমান মেয়েরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই দাঙ্গায় হিন্দু হত্যার নেতৃত্ব দেয় এবং পুরুষ সঙ্গীদের হিন্দুর বাড়িতে লুট ও ধর্ষণের সহযোগিতা করে।
শান্তনু সিংহ
আমাদের ভারত, ৯ অক্টোবর: মালাউন মেয়েগুলোর গন্ধ আমার ভালো লাগে, ব্রাহ্মণ হোক আর চাঁড়াল হোক আর কৈবর্ত, যাই হোক, ওগুলোর গন্ধ ভালো, একটা তীব্র প্রচন্ড দমবন্ধকরা মহাপ্রার্থিব গন্ধ ছুটে আসে ওদের স্তনে থেকে, বগলের পশম থেকে, উরু থেকে, ওদের কুঁচকির ঘামেও অদ্ভুত সুগন্ধ; ওদের কুচকির ঘামের অদ্ভুত সুগন্ধটা হয়তো গাঁদা তুলসী রক্তজবা পদ্ম বকুল শেফালি গন্ধরাজ ফুলের সাথে ওদের একটা সম্পর্ক আছে ব’লে, আর ওরা ক্রীড়াও করে ভালো, মনে হয় ওদের প্রত্যেকেরই কামসূত্র মুখস্ত; এমনকি কৈবর্ত মেয়েগুলোর গন্ধ আমাকে পাগল করে, আমি কৈ আর গজার মাছের মত গন্ধ পাই, মনে হয় পুকুরে ডুব দিয়ে কাদার ভেতর থেকে মাছ ধরছি।” (পাক সার জুমিন সাদ বাদ – পৃ : ২০) ।
প্রখ্যাত বাংলাদেশী লেখক হুমায়ুন আজাদের উপরের বর্ণনা থেকে ১৯৪৬ সালের কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতে নোয়াখালীতে হিন্দু মেয়েদের উপর মুসলমানদের ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণ হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। আজকেই সেই রাত। নোয়াখালির হিন্দু মানুষের দুঃখ, চিৎকার, যন্ত্রণা, শোক, বেঁচে থাকার আকুতি, লক্ষ্মীদের ধর্ষণ থেকে মুক্তির চেষ্টা; যেন সেদিনের পূর্ণিমার আলোকে ম্লান করে দিয়েছিল।
নোয়াখালীতে হিন্দুনিধনের আগে ঘটে গেছে দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। তার দেড়দিন পর হিন্দুরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
কলকাতায় হিন্দুদের সেই প্রতিক্রিয়া মুসলিম লীগের বিশেষ করে মহম্মদ আলি জিন্নার সম্মানে আঘাত করে। তাই তিনি চাইলেন হিন্দুদের এমন একটা সবক শিক্ষা দিতে যেখানে হিন্দুদের হয় মৃত্যুবরণ নতুবা ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কিছু বিকল্প থাকবে না। বেছে নেওয়া হল কলকাতা থেকে অনেক দূরে জল বেষ্টিত হিন্দু সংখ্যালঘু নোয়াখালী।।
নোয়াখালীর হিন্দু নিধন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। কলকাতা দাঙ্গার পরপরই মুসলিম লীগ নোয়াখালীতে দাঙ্গার পটভূমিকা তৈরি করতে থাকে। নোয়াখালীর দাঙ্গার দায়িত্ব দেওয়া হয় গোলাম সারোয়ার*** বলে এক স্থানীয় নেতার উপর ।
গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করা হতে থাকে যে, কলকাতায় প্রচুর মুসলমানকে হিন্দুরা মেরেছে। প্রচারের প্রভাব এমন হয়েছিল যে রাস্তা ঘাটে কোনও হিন্দুকে দেখলেই মুসলমানরা জিজ্ঞাসা করতো, “কলকাতায় ক’টা মুসলমান মারলি?” ওরা ইচ্ছে করেই “তুই” কথাটা হিন্দুদের অপমান করার জন্য বলতে শুরু করে।
এই সময় Bengal Press Advisory Committee নোয়াখালীর বিভিন্ন থানায় জমা দেওয়া ডাইরি ঘেঁটে প্রমাণ করেছিল যে, সেপ্টেম্বর মাস, ১৯৪৬ থেকেই হিন্দু নিধনের একটা পরিকল্পনা, একটা আবহাওয়া নোয়াখালীতে তৈরি করা হতে থাকে। প্রায় রোজই নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে মিছিল বের করা হচ্ছিল। হিন্দুদের দোকান থেকে জিনিস না কেনার জন্য মুসলমানদের কাছে আবেদন করা হতে থাকে। সমস্ত হিন্দুকে জবাই করা হবে বলে শাসনো হতে থাকে।
১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬ কোনও একজন হিন্দু অভিযোগ করে, ” আমাদের জীবন এখানে সুতোর উপর দিয়ে ঝুলছে। আমাদের সবাইকে খুন করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওরা বলছে শুধু হাই কমান্ডের নির্দেশ পাওয়া যায়নি বলে এখনো কিছু করা হচ্ছে না।”
হিন্দুদের মনসিকভাবে হীনমন্য করার জন্য গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে মিছিল করে প্রায় রোজই হিন্দুদের দেবস্থানে গরুর মাংস নিক্ষেপ করা হতে থাকে।
নোয়াখালীতে প্রচুর পাঠান মুসলমান ও বিহারী মুসলমান এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মুসলমান সৈন্যদের নিয়ে আসা হয়। কারণ মুসলিম নেতৃত্ব একদম স্থির প্রতিজ্ঞ ছিল, যেন কোনোভাবেই হিন্দুরা কলকাতার মত প্রতিরোধ করতে না পারে। ওই সময় সাংবাদিকদের লেখা থেকে জানা যায়, the heads of miscreants were Ex-Servicemen
এই সমস্ত প্রস্তুতি নেবার পর ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে মুসলমান জনতা হিন্দু বাড়িগুলো আক্রমণ করতে থাকে। নোয়াখালীর এই মুসলিম আক্রমণের অন্যতম বিশেষত্ব ছিল, মুসলমান মেয়েরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই দাঙ্গায় হিন্দু হত্যার নেতৃত্ব দেয় এবং পুরুষ সঙ্গীদের হিন্দুর বাড়িতে লুট ও ধর্ষণের সহযোগিতা করে।
তৎকালীন বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য কংগ্রেস নেতা কামিনী কুমার দত্ত নোয়াখালী ঘুরে এসে জানান, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সমস্ত নোয়াখালী জেলাকে মুসলমান করবার উদ্দেশ্য নিয়েই নোয়াখালীর হিন্দু নিধন শুরু করা হয়েছিল।
“হয় মৃত্যু নতুবা কুরআন” ছাড়া নোয়াখালীর হিন্দুদের আর কোনও বিকল্প ছিল না। অক্টোবর ১৬, ১৯৪৬, স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা হল – প্রায় ২০০ বর্গ মাইল অঞ্চল নিয়ে হিন্দুদের খুন করা হচ্ছে, তাদের মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে তাদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, হিন্দুদের মন্দিরগুলোকে গরুর মাংস ফেলে অপবিত্র করা হচ্ছে।
শুধু কলমা পড়ে বা গরুর মাংস খেয়ে নিজেদের মুসলমান প্রমাণ করা যেত না। মুসলমান হয়েছে তা প্রমাণ করার জন্য ওই হিন্দুকে তার মেয়ে বা বোনকে কোনও মুসলিম লীগের গুন্ডার সাথে বিয়ে দিতে হতো। এই ব্যাপারে হাজিগঞ্জ থেকে উদ্ধার পাওয়া এক বাঙালি হিন্দু ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা- “ওরা বলল, আমাদের বাড়ির মেয়েদের সাথে ওদের বাড়ির ছেলেদের বিয়ে দিতে হবে। আমার মামাতো বোন দেখতে খুব সুন্দরী। অনেকেরই চোখ ওর দিকে। এমনকি প্রেসিডেন্ট নিজেই মামার কাছে ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। মামার তখন না বলার কোনও উপায় ছিল না। ওই মামাতো বোনটির বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। ওই প্রেসিডেন্টের বয়স ৫৫। আমরা সবাই মিলে পরামর্শ করলাম। সেই মতো মৌলভীর কাছে গিয়ে বললাম, আমরা এখন সবাই মুসলমান হয়ে গেছি, তাই মামাতো বোনকে বিয়ে করা যায়। আমি আমার মামাতো বোনকে বিয়ে করতে চাই। ভাগ্য ভালো, মৌলভী রাজি হয়ে গিয়েছিল। আমরা বেশ কয়েক দিন স্বামী স্ত্রীর অভিনয় করলাম। তারপর মিলিটারি গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে।”
নোয়াখালী হিন্দু নিধনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের সবক শিখিয়ে সমগ্র নোয়াখালী জেলাকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করা।
নোয়াখালীতে হিন্দু নিধন জানতে ভারত সেবাশ্রম সংঘের দায়িত্বপ্রাপ্ত সন্ন্যাসী স্বামী ত্রম্ব্যকানন্দ মহারাজের অভিজ্ঞতার সমতুল্য আর নেই – “অক্টোবরে বেগমগঞ্জ বাজার এলাকায় সভা ছিল। বক্তা গোলাম সারোয়ার। সভায় প্রায় সভায় ১৫ হাজার শ্রোতার সামনে গোলাম সারোয়ার ভয়ংকর হিন্দু বিদ্বেষপূর্ণ ভাষণ দিলেন। থানার দারোগা নিজে উপস্থিত ছিলেন। ভাষণ শেষ হওয়ার পরই মুসলিম জনতা ওখানকার হিন্দু দোকানগুলো লুট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
“এরপর জনতা আলাদা আলাদা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে তিন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
“একটি দল স্থানীয় জমিদার সুরেন্দ্রনাথ সুরেন্দ্র কুমার বসুর বাড়ি আক্রমণ করে। তাঁকে অন্তত নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়। এরপর জনতা সুরেন্দ্রবাবুর কাছারি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে পালিয়ে আসা অনেক হিন্দু নারী ও শিশু ওই কাছারি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের তাদের অনেকেই আগুনে জ্যান্ত পুড়ে মারা যায়। যারা কোনক্রমে ওই জতুগৃহ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়।
“অপর একটি দল নোয়াখালীর ডিস্ট্রিক্ট বারের সভাপতি করপাড়ায় রাজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়ি আক্রমণ করে। কিন্তু সেখানে হিন্দুরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করলে দাঙ্গাকারীরা পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাধা পেয়ে ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং আশেপাশে আক্রমণ চালায়। রাজেন্দ্রলাল রায় বেগমগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ জানান। কিন্তু কোনও প্রশাসনিক সাহায্য পাননি।
“পরদিন সকাল আটটায় এক বিরাট জনতা রাজেন্দ্রলাল রায়ের বাড়ি আক্রমণ করে। এবারও দাঙ্গাকারীরা পিছু হটে। এভাবে পরপর তিনবার দাঙ্গাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। চতুর্থবার তারা সফল হয়। স্থানীয় মুসলিম লীগ এম.এল.এ গোলাম সারোয়ারের নির্দেশে আক্রমণকারীরা প্রথমেই রাজেন্দ্রলাল রায়কে হত্যা করে। তারপর তাঁর পরিবারের সবাইকে এবং তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া সবাইকে হত্যা করা হয়। রাজেন্দ্রলাল রায়ের কাটা মাথা একটি রুপার থালা সাজিয়ে গোলাম সরোয়ারকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। গোলাম সারোয়ারের নির্দেশে তারই দুই সেনাপতি রাজেন্দ্রলাল রায়ের সুন্দরী মেয়েকে বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করে।
নোয়াখালীর দাঙ্গার অন্যতম অভিমুখ ছিল হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ ও জোরপূর্বক বিবাহ। আই.সি.এস মিস্টার সিমসন নোয়াখালী দাঙ্গার তদন্ত করতে গিয়ে লিখেছেন, “একটি এলাকায় ৩০০র বেশি এবং আরেকটি এলাকায় ৪০০ র বেশি হিন্দু মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মুসলমান জনতার ধারণা যে, হিন্দুরা মেয়েদের শ্রদ্ধা করে ও পবিত্রতার প্রতীক মনে করে। তাই হিন্দু নারীকে অপমান করতে পারলেই হিন্দু ধর্মকে আঘাত করা যাবে (to the Muslim crowd, vioilaon of the honour of the Hindu women meant the exposure of the most protected aspect of the Hindu identity and religion )।
নোয়াখালীর বর্বরতার একটি ধারণা পাওয়া যাবে স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা থেকে।
“একটি ছোট্ট মেয়ে আমাকে ওই গল্পটি বলেছিল। বাড়িতে মুসলমান আক্রমণ হলে ওই বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ লোক, যিনি বাড়ির অভিভাবক, যিনি আবার পেশার মোক্তার, ওই উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে এগিয়ে যান। কিন্তু তিনি কথা বলার আগেই তার মাথাটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এবার মেয়েটির বাবার পালা। তখন মেয়েটির ঠাকুমা তাঁর ছেলেকে বাঁচানোর জন্য ছেলের (মেয়েটির বাবা) শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ওদের কাছে ছেলের প্রাণ ভিক্ষা চান। কিন্তু এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ওই মুসলমান জনতা মহিলার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং তাঁর অচেতন দেহ ছুড়ে ফেলে দেয়। এরপর মেয়েটির বাবাকে মারার জন্য উদ্যোগী হলে মেয়েটি বাবার প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসে এবং বাড়ির যে সমস্ত সোনা গহনা এবং ৪০০ টাকা দিয়ে বাবাকে না মারার জন্য বলে। ঘাতক ওই মেয়েটির থেকে বাঁ হাতে সমস্ত সোনা গহনা এবং ৪০০ টাকা টাকা নিয়ে ডান হাতে মেয়েটির বাবাকে তরোয়ালের কোপ মারে।
যথাযথভাবেই বাংলার প্রধানমন্ত্রী হুসেন শাহ সোরাবরদী জানান যে ওখানে সামান্য গন্ডগোল হয়েছে, বেশি কিছু নয়। সাথে ইংরেজ রাজকর্মের রচনা রাজকর্মচারীর পোঁ ধরেন, নোয়াখালীতে মৃত্যুর সংখ্যা তিন অংক ছাড়ায়নি।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভাইসরয়কে মুসলমানদের এই হিন্দু নিধন বন্ধ করার জন্য হস্তক্ষেপের দাবি জানান, কিন্তু ভাইসরয় হস্তক্ষেপ করতে রাজি হলেন না। কারণ তিনি জানালেন, এটা তো স্বাভাবিক যে মুসলমানদের হিন্দু বাড়ির মেয়েদের ওপর লোভ থাকবেই। কারণ মুসলমান বাড়ির মেয়েরা হিন্দু বাড়ির মেয়েদের মতন সুন্দরী নয় (large scale abduction of Hindu women was quite natural since Hindu women were more handsome than Hindu women)
নোয়াখালীর মুসলমান আক্রমণে হিন্দু মেয়েদের কি অবস্থা ছিল তার বিস্তৃত বর্ণনা করেছেন মিস মুড়িয়াল লিস্টারের লেখায়। ৬ নভেম্বর ১৯৪৬ লিস্টার লেখেন, “দুর্দশা সবচেয়ে বেশী ছিল নারীদের। এদের মধ্যে অনেকেই স্বচক্ষে আপন স্বামীকে নিহত হতে দেখেছে। তারপর বল প্রয়োগে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্বামীর হত্যাকারীদের কোনও একজনকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছে। নারীদের চোখে ছিল মৃতের চাহনি। সে চাহনি হতাশার অভিভক্তি নয়। কারণ হতাশারও একটা ক্রিয়া থাকে। এ যেন সম্পূর্ণ অন্ধকার। গোমাংস ভক্ষণ ও ইসলামের প্রতি আনুগত্য শপথ জোর করে চাপানো হয়েছিল এবং তা না করলেই মৃত্যুদণ্ড। ”
গান্ধী তখন দিল্লিতে। তাঁর কাছে নোয়াখালীর জন্য কি করা উচিত জানতে চাইলে গান্ধী জানান, “নোয়াখালীর হিন্দুরা যেন কখনোই অসহায়ভাবে মৃত্যুর বরণ না করে। তাদের উচিত একটিও শব্দ উচ্চারণ না করে হত্যাকারী তরবারির দিকে মাথা এগিয়ে দেওয়া। তাহলে দাঙ্গা থেমে যাবে।”
নোয়াখালীর ধর্ষিতা ও অপহৃত মহিলাদের প্রতি তাঁর আহ্বান “মেয়েদের জানা উচিত, কিভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সুতরাং খুব সাহসের সঙ্গে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে এবং এর জন্য একটুও দুঃখ করা উচিত নয়। তাহলেই তাদের উপর এই অত্যাচার বন্ধ হয়ে যাবে।”
গান্ধী আরও উপদেশ দেন, “অযথা রক্তপাত না ঘটিয়ে প্রত্যেক হিন্দুর উচিত মুসলমান আক্রমণের কাছে আত্মসমর্পণ করা।”
গান্ধীর এই উৎকট ব্যাখ্যার তীব্র প্রতিবাদ করে কংগ্রেস সভাপতি আচার্য কৃপালিনী এবং তার স্ত্রী সুচেতা কৃপালিনী দ্বার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, আজকে রাজেন্দ্রলাল রায় হিন্দুদের আদর্শ হওয়া উচিত।
গতকাল রাতে কৃপালিনীর GANDHI HIS LIFE AND THOUGHT পড়তে পড়তে ঘুমিয়েছিলাম। কখন জানি না। হঠাৎ সকালে ঘুম ভাঙলো পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের শব্দে :
“দেখো কে এসেছে মা আমিনা’র কোলে।”
আজকের এই কোজাগরি পূর্ণিমার রাতে মা আমিনার কোলে কেউ এসেছেন কিনা জানি না, কিন্তু এই কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে মুসলিম লীগ নেতা গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে নোয়াখালীর ২০০ মাইল অঞ্চল জুড়ে, হিন্দু নিধন, হিন্দু নারী ধর্ষণ, হিন্দুকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ এর ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এই লেখা। আগামী দিনে পূর্ণিমার আলোয় স্নাত হয়ে আমাদের লক্ষ্মীরা প্রাণ খুলে বলতে পারবে তো – এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে।
এই নোয়াখালীতে হিন্দু নিধনের প্রেক্ষাপট অনেক আগে থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল।
১৯২০ সাল পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কংগ্রেস পার্টিতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের মহত্তম দূত (best ambassador of Hindu Muslim Unity) মনে করা হোত। ১৯১৬ সালে লখনৌ সম্মেলনে জিন্নাহকে এই উপাধি দিয়েছিলেন কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। কিন্তু ১৯২০ সালে খিলাফতপন্থী ভারতের মুসলমানদের সহায়তায় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কংগ্রেসের ক্ষমতা দখল করবার পর জিন্নাহ’র সাথে কংগ্রেসের দূরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯২০ সালের নাগপুর কংগ্রেসে এই ফাটল মোটামুটি একটা স্থায়ী রূপ ধারণ করে। গান্ধীর “স্বরাজ” ও “অহিংসা” তত্ব জিন্নাহর কাছে যেমন অবাস্তব ছিল, তেমনি জিন্নাহ বিরোধিতা করেছিলেন খিলাফত আন্দোলনের নামে মুসলমানদের ভেতরে বিদেশি আনুগত্য তৈরি করার। কিন্তু গান্ধীর প্ররোচনায় নাগপুর কংগ্রেসে জিন্নাহকে যারপরনায় অপমানিত করা হয়।
১৯২৮ সালের সাইমন কমিশনের ভারতবর্ষে আগমন এবং সেই কমিশনের কাছে মতিলাল নেহেরুর ও জহরলাল নেহেরুর তৈরি রিপোর্ট, যা “নেহেরু রিপোর্ট” বলে খ্যাত, জমা দেওয়ায় জিন্নাহর সাথে কংগ্রেসের ফাটল একদম সম্পূর্ণ করে ফেলে। জিন্নাহর “চৌদ্দ দফা” দাবি কংগ্রেসের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। কলকাতায় ‘অল পার্টি কনফারেন্স’এ জিন্নাহর দাবি ধূলিসাৎ করে দেন হিন্দু মহাসভা নেতা এম আর জয়কর।
এরপর কিছুদিন বিরত থাকার পর জিন্নাহ আবার ভেসে ওঠেন ১৯৩৪ সালে। ওই সময় মুসলমানরা লাহোরের একটি গুরুদ্বারা “মসজিদ” বলে দাবি করে আন্দোলন শুরু করে, যা “শহীদগঞ্জ বিতর্ক” বলেই পরিচিত। উভয় পক্ষই জিন্নাহর পরামর্শ চাইল। কারণ কংগ্রেস এই ‘সাম্প্রদায়িক’ ব্যাপারে মাথা গলাতে চাইল না। অতি বাস্তববোধ সম্পন্ন জিন্নাহ এই বিতর্ক না মিটিয়ে ধীরে ধীরে অন্য বাতাবরণ সৃষ্টি করতে থাকলেন।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস আশাতীত জয় লাভ পায়। ১৫০০ আসনের মধ্যে কংগ্রেসের কাছে আসে ৭৫০ টা আসন। পাঁচটি প্রদেশে কংগ্রেস একক ভাবে সরকার গঠন করে। দুটি প্রদেশে সংযুক্ত সরকার।
এই নির্বাচনে জিন্নার মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হল। এমনকি বাংলা এবং পাঞ্জাবের মত মুসলমান প্রধান প্রদেশেও জিন্নাহর মুসলিম লীগ ফললাভ করতে পারল না। বাংলায় সরকার গঠন করে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক প্রজা পার্টি এবং পাঞ্জাবে মুসলিম লীগের চরম বিরোধী স্যার খিজির হায়াত খানের নেতৃত্ব ইউনাইটেড পার্টি। সিন্ধু প্রদেশে ৩০টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগের ভাগ্যে জুটলো মাত্র ৩ টি আসন।
জিন্নাহ নিজের প্রিয় খাবার ছিল শুয়োরের মাংস ও তার সাথে ফরাসি ওয়াইন। আম মুসলমানের মধ্যে নিজেকে দেখতে ঘৃণা বোধ করতেন।। সারা জীবনে একবার মাত্র পবিত্র কোরআন ছুঁয়েছিলেন। মহামতি গোখলের হয়ে তাঁর আইনি লড়াই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ইতিহাসের এক সম্পদ। মুসলমানদের নিয়ে গান্ধীর সম্পূর্ণ রাজনীতিকে বিরোধিতা করে নিজের সম্পর্কে দাবি করেছিলেন – I AM A NATIONALIST FIRST, NATIONALIST SECOND AND NATIONALIST THIRD”। এমনকি ১৯৩৩ সালে যখন জিন্নাহ ইংল্যান্ডের ইংল্যান্ডে যান তখন পাকিস্তান ধারণার জনক পরিকল্পনার জনক রহমত আলী তাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে যোগদান করার আহ্বান জানালে তিনি পরিষ্কার না করে দিয়ছিলেন। কিন্তু সেই জিনাহ পরে হয়ে উঠলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রধান স্তম্ভ।
মাত্র দুই পুরুষ আগে হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া পরিবারের মহম্মদ আলী জিন্নাহ স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমোঘ দূরদৃষ্টিকে সত্য প্রমাণ করে দিলেন – হিন্দু সমাজ থেকে একজন চলে যাওয়ার অর্থ শুধুমাত্র একজন হিন্দুর সংখ্যা কমে যাওয়া নয়, একজন হিন্দু শত্রু তৈরি হওয়া।
মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁর ঘোষিত অবস্থান “NATIONALIST FIRST, NATIONALIST SECOND AND NATIONALIST THIRD” বেমালুম অস্বীকার করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, ‘কয়েক শতক আগে যেদিন প্রথম হিন্দুটি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল সেদিনই পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়ে গেছে।” তিনি আরো ঘোষণা করলেন, “মুসলমানরা হিন্দুর সাথে কখনো থাকতে পারে না।” অসম্ভব বাস্তববাদী এবং আসুরিক ইচ্ছা শক্তির অধিকারী জিন্নাহ ইতিমধ্যে ভারতবর্ষের মুসলমানদের মানসিকতা ধরে ফেলেছেন ।
এর মাত্র কিছুদিন আগেই কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জহরলাল নেহেরু আবেগ তাড়িত হয়ে ঘোষণা করলেন: “The Hindu-Muslim problem or communalism was at its core of a problem of UPPER MIDDLE CLASS PEOPLE who only made up a small fraction of the Indian population. The so called Hindu-Muslim problem is not a genuine problem concerning the masses but self seekers.”
“হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা যারা সমাজের খুবই সামান্যতম অংশ এবং যারা শুধু নিজেদের স্বার্থ নিয়ে থাকে।”
জহরলাল নেহেরুর এই তত্ত্ব খারিজ করে দিয়ে মহম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যাখ্যা করলেন, “ভারতবর্ষের সমস্যা সম্প্রদায়গত নয় বরং জাতিগত। এটা খুবই দুঃখের যে হিন্দু বন্ধুরা ইসলাম ও হিন্দুত্বের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারছেন না। ইসলাম এবং হিন্দুত্ব শুধু আলাদা ধর্ম নয় দুটি আলাদা ও বিপরীত জাতিসত্তা। হিন্দু ও মুসলমান, দুজনের ইতিহাস আলাদা। দুজন দুটি পৃথক ইতিহাস থেকে প্রেরণা পায়। হিন্দুর মহাপুরুষ মুসলমানের কাছে বর্জিত, আবার মুসলমানের মহাপুরুষ হিন্দুর কাছে বর্জিত। মুসলমানরা সংখ্যালঘু নয়। মুসলমান একটা জাতি। তাই তাদের অবশ্যই নিজেদের বাসভূমির অধিকার আছে।
জিন্নাহর “মুসলমান আলাদা জাতি” তত্ত্বের প্রথম রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সিলমোহর দিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (COMMUNIST PARTY OF INDIA) । পলিটব্যুরোর মিটিং এ সাজ্জাদ জাহির প্রস্তাব আনলেন – পাকিস্তানের দাবি একটি ন্যায়সঙ্গত এবং গণতান্ত্রিক দাবি। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হলো। ভারতবর্ষের মানুষ প্রথম শুনল, মুসলিম লীগও যা বলতে পারেনি- “পাকিস্তানের দাবি মানতে হবে – তবেই ভারত স্বাধীন হবে।”
জিন্নাহ নিজেও জানতেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র পাওয়া এত সহজ নয়। তাই এত সহজে পাকিস্তান পেয়ে যাওয়ার পর বিস্মিত জিন্নাহ তাঁর এ.ডি.সি. কে বলেছিলেন, “আমি জীবনে কখনোই ভাবেনি যে পাকিস্তান দেখে যেতে পারব।”
পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি করার পেছনে জিন্নাহর অবদান যতটুকু তার থেকেও বেশি অবদান কংগ্রেসের। আত্মসম্মানহীন কংগ্রেস নেতাদের জিন্নাহর কাছে লজ্জাহীন আত্মসমর্পণ পাকিস্তান তৈরির ক্ষেত্রে এক বিরাট অবদানের স্বাক্ষর রেখে গেছে। ১৯৪৬ সালে গান্ধী উপযাজক হয়ে জিন্নাহর সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করেছিলেন। সেখানে জিন্নাকে তিনি শুধু “কায়েদ-ই-আজম” বলে সম্বোধন করেই ক্ষান্ত হননি, জিন্নাহার কাছে করুনা ভিক্ষা করেন, “আমি আপনার বা ইসলামের শত্রু নই। আমি আপনাদের দ্বীন সেবক মাত্র। আপনাকে ফিরিয়ে দেবেন না।” গান্ধীর এই আত্মসমর্পণ’কে জিন্না পরে ব্যাখ্যা করেছিলেন “MR. GANDHI, AT ANY RATE, IN HIS PERSONAL CAPACITY, ACCEPTED THE PRINCIPLES OF PARTION OR DIVISION OF INDIA.”
ইতিমধ্যেই ১৯৪৫ -৪৬ কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচিন হয়। কংগ্রেসের এই দুর্বল আত্মসম্মানহীন ভূমিকা বিশ্লেষণ করে বীর সাভারকর এবং ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অ-মুসলমানদের বারবার আবেদন জানালেন, কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার অর্থ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেওয়া। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা।
অ-মুসলমান জনসাধারণ ঢেলে কংগ্রেসকে ভোট দিল। মুসলিম সংরক্ষিত আসনে মুসলিম লীগ ৮৬.৬ % ভোট পেল। কংগ্রেসের পক্ষে জুটল মাত্র তিনটি মুসলমান আসন। মাত্র নয় বছরের মধ্যে মুসলমান জনতার এই ভোল বদল অবিশ্বাস্য ছিল না। কারণ পবিত্র কোরআন হাদিস এই উপমহাদেশের মুসলমানদের মানসিক গঠন যেভাবে তৈরি করেছিল, ভয়ংকর বাস্তববাদী জিন্নাহ সেটাকে নিজের মতো কাজে লাগিয়েছিলেন। এই ফলাফলের উৎসাহিত জিন্নাহ দাবি করলেন, “কংগ্রেস যে দাবি করছে, মুসলমানরা ওদের সাথে আছে, এই নির্বাচনে সেটা সব ভুল প্রমাণিত হলো । আর যে মুসলমানরা কংগ্রেসের টিকিটে জিতেছে তাদের সর্বত্র পদাঘাত করা হবে।”
১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ক্যাবিনেট মিশনের কথা ঘোষণা করলেন। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ, উভয় রাজনৈতিক দলকেই আহ্বান জানানো হল প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করার জন্য। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, কংগ্রেস থেকে পাঠানো কোন মুসলমান প্রতিনিধির সাথে আলোচনায় বসবেন না। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের ব্যাখা অনুযায়ী তিনি পরিষ্কার জানালেন, হিন্দুরা হচ্ছে শত্রু, কাফের, কিন্তু অ-লীগপন্থী কংগ্রেসের মুসলমান হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক, মুনাফিক।
দুঃখজনকভাবে জিন্নাহর এই দাবির কাছে মাথা নিচু করে কংগ্রেস তাদের প্রতিনিধি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এর পরিবর্তে “হিন্দু’ নেহেরুকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান।
গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের দুর্বলতা জিন্নার কাছে প্রকট হয়ে উঠছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন “চাই” কথাটা জোর দিয়ে বললেই কংগ্রেস সমস্ত কিছু মেনে নেবে। ৬ জুলাই, ১৯৪৬ জিন্নাহ ঘোষণা করলেন, মুসলিম লীগ ১৬ই আগস্ট সারা ভারতবর্ষ জুড়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পালন করবে। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কি, সে ব্যাপারে জিন্না কোনোরকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় করলেন না। পরিষ্কার জানালেন, “মুসলমানদের কাছে পিস্তল আছে এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে।”
প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পরীক্ষাগার হিসেবে বেছে নেওয়া হল বাংলা। প্রথমত, বাংলায় মন্ত্রিসভা ছিল মুসলীম লীগের। দ্বিতীয়, বাঙালি হিন্দুর মানসিকতা সম্পর্কে জিন্নাহর ধারণা ছিল যে, এখানে মুসলমানের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সামলানোর ক্ষমতা বা মানসিকতা বাঙালি হিন্দুর নেই।
মুসলিম লীগের এই প্রত্যক্ষ সংগ্রামের বিরুদ্ধে মাঠে নামল একমাত্র হিন্দু মহাসভা। কংগ্রেস নিরব দর্শক। এমনকি পরবর্তীকালে যখন কলকাতা দাঙ্গা বা নোয়াখালীতে হিন্দু নিধন চলছে, তখন জওহরলাল নেহেরু দিল্লিতে বসে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবিদারী নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে জ্যোতি বসু এক উদ্ভট ব্যাখ্যা খাড়া করলেন যা কমিউনিস্টদের চিরকালীন দ্বিচারিতাকে প্রমাণ করে। ১৩ ই আগস্ট ১৯৪৬ বঙ্গীয় আইন পরিষদে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জ্যোতি বসু জানালেন, “মূলত আমাদের চেষ্টা হবে মুসলিম লীগের ডাকা বন্ধের দিন শান্তি বজায় রাখা। তাই যেখানে প্রয়োজন সেখানে আমরা বন্ধ সমর্থন করব যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে আমরা বন্ধের বিপক্ষে থাকব।”
১৬-১৯, ১৯৪৬ আগস্ট কলকাতা দেখল প্রত্যক্ষ সংগ্রামের কিস্তি। কিম ক্রিস্টেন লিখলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আমার স্নায়ু যথেষ্ট শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধও এত পৈচাশিক নয়। এ এক মধ্যযুগীয় বর্বর উন্মাদনা।
প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে পৈশাচিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। কলকাতার মুসলমান মেয়র সাজিদ খান সক্রিয়ভাবে এই দাঙ্গা পরিচালনা করেছিলেন। দাঙ্গার কয়েকদিন আগে কলকাতা পুলিশের রদবদল করা হয়েছিল এবং সমস্ত মুসলমান পুলিশ অফিসারকে কলকাতার বিভিন্ন থানায় এবং লালবাজারের হেডকোয়ার্টারে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম দেড় দিন পর মুসলিম লীগের নিরবিচ্ছিন্ন আক্রমণকে প্রতিরোধ করে হিন্দুরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। নেতৃত্ব দেন গোপাল মুখার্জি ( যিনি গোপাল পাঁঠা বলে পরিচিত), বিজয় সিংহা নাহার, রাম চ্যাটার্জী প্রমুখ। বিহারী এবং শিখ সম্প্রদায় এই প্রতিআক্রমণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যা থেকেই খেলা ঘুরতে থাকে। বাঙালি, বাংলায় বসবাসকারী শিখ ও বিহারীদের পাল্টা আক্রমণে মুসলমানরা প্রমাদ গুনতে থাকে। উত্তর কলকাতার একটি মসজিদের দেওয়াল ভেঙ্গে দিয়ে হিন্দুরা পোস্টার সাঁটিয়ে দেয়, “এই গর্ত দিয়া আল্লাহ পালাইয়া গিয়াছেন।”
কলকাতায় হিন্দুদের সেই প্রতিক্রিয়া মুসলিম লীগের বিশেষ করে মহম্মদ আলি জিন্নার সম্মানে আঘাত করে। তাই তিনি চাইলেন হিন্দুদের এমন একটা সবক শিক্ষা দিতে যেখানে হিন্দুদের হয় মৃত্যুবরণ নতুবা ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কিছু বিকল্প থাকবে না। বেছে নেওয়া হল কলকাতা থেকে অনেক দূরে জল বেষ্টিত হিন্দু সংখ্যালঘু নোয়াখালী।।

***এটি গোলাম সরোবরের দুষ্প্রাপ্য ছবি। এই প্রথম আমাদের ভারতে প্রকাশিত হল। নোয়াখালীর এক যোদ্ধা গোলাম সরোবরের বাড়িতে গিয়ে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছবিটি তুলে এনেছিলেন। দুর্ভাগ্য, নিরাপত্তার কারণে এখানে তাঁর নাম প্রকাশ করা যাবে না। তার জন্য ক্ষমা প্রার্থী।
(নোয়াখালী নোয়াখালী বইয়ের লেখক এই প্রবন্ধের লেখক শান্তনু সিংহ।)
‘মনেপ্রাণে হিন্দুত্ববাদী’দের কাছে অনুরোধ। আমাদে সাহায্য করুন। খুব আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে সাড়ে পাঁচ বছর ধরে বাংলায় একমাত্র আমরাই প্রতিদিন এই ধরণের খবর করছি। আমরা ২৫ জন রিপোর্টার এর সঙ্গে যুক্ত। 🙏
ব্যাঙ্ক একাউন্ট এবং ফোনপে কোড:
Axis Bank
Pradip Kumar Das
A/c. 917010053734837
IFSC. UTIB0002785
PhonePay. 9433792557
PhonePay code. pradipdas241@ybl

