আমাদের ভারত, ৫ ফেব্রুয়ারি: আমরা দৈনিক যে খাদ্য গ্রহণ করি তা শুধু পেট ভরানো বা শুধু পুষ্টি লাভের জন্য নয়, নীরোগ থাকতে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থেকে সাত্ত্বিক জীবনলাভ করতে। অথচ চাষে নানান রকম ক্ষতিকারক কীটনাশক এবং রাসায়নিক ব্যবহারের দৌরাত্ম্যে বাড়ছে। এরফলে, মহিলাদের ব্রেস্ট-ক্যান্সার, শিশুদের লিউকেমিয়া, বয়স্কদের রক্ত ও স্নায়বিক সংক্রান্ত রোগ বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বাড়ছে চর্মরোগের প্রকোপ, টিউমার, জিনগত বৈষম্য, অন্তঃক্ষরা নানান গ্রন্থির সমস্যা। তাই জৈব সবজির ব্যবহার বাড়লে এই বিষের প্রভাব থেকে অনেকটাই দূরে থাকা যাবে। তাছাড়া, নিজেরা একটু চেষ্টা করলেই বাড়িতে এই সবজি চাষ করতে পারি। এমনকি শহরের মানুষ এই জৈব ফসল করতে পারবেন। শহরের বাসিন্দারা ফসল ফলবেন জমিতে, ছাদে, টবের মাটিতে।
শহরে বাড়ির মালিক তাঁর ছাদে, বারান্দায়, জানালার খাঁচায় জৈব বাগান তৈরি করতে পারেন। এমনকি ফ্ল্যাটের মালিকও পারেন তাঁর বারান্দা বা জানালার খোপে টব রেখে, বস্তায় বা বোতলে মাটি রেখে তাতে নানান ফসল ফলাতে। যেমন বস্তায় হলুদ, আদা; টবে লঙ্কা, ভেন্ডি, ক্যাপসিকাম, বেগুন। এমনকি টবে লতানে সব্জি যেমন, লাউ, কুমড়ো, শসা, উচ্ছে লাগিয়ে তা জানালায় বা ছাদে লতিয়ে দিতে পারেন।
ছাদে সামান্য মাটি ফেলে তাতে লালশাক, কাটোয়া ডাঁটা, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, মেথিশাক, পাটশাক ইত্যাদি চাষ করতে পারেন। অনেকে ছাদে বড় টবে মাটি রেখে আম্রপালি, মঞ্জিরা হাইব্রিড আম, বেঁটে জাতের পেয়ারা, ডালিম, করমচা, চেরি, মুসম্বি, পাতি ও বাতাবি লেবু, সবেদা ইত্যাদি চাষ করে নিতে পারেন, কোনোরকম কেমিক্যাল ব্যবহার না করে।
শহরতলীতে যাদের বাড়ির সামনে এক চিলতে জমি আছে এবং তাতে ভালো আলো-বাতাস খেলে, তারাও রচনা করতে পারবেন পুষ্টি বাগান। বাগানের বর্জ্য, রান্নার তরকারির খোসা, মাছের কাঁটা, মাংসের হাড় ইত্যাদি ব্যবহার করে বাগানেই বানিয়ে নেওয়া যায় কম্পোস্ট সারের ভাণ্ড। গ্রামের মানুষ গোবর ও গোমূত্র ব্যবহার করে গোবর সার, তরল জৈবসার এবং কেঁচো ব্যবহার করে ভার্মি-কম্পোস্ট বা কেঁচোসার বানিয়ে এই পুষ্টিবাগানে প্রয়োগ করতে পারেন।

অপুষ্টির অভিশাপ থেকে গ্রাম-বাংলাকে শাপমুক্ত করতে ছড়িয়ে দিন পুষ্টিবাগানের এই প্রস্তুত পাঠ। সবজি উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও এখনো দেশের সমস্ত মানুষ আজও দৈনিক ন্যূনতম মাত্রায় সবজি তাদের ব্যঞ্জনে পায় না। অথচ সামান্য সচেতনতা ও প্রচেষ্টা থাকলে কি এতটা অপুষ্টির পরিমণ্ডল থাকা উচিত? পুষ্টিবাগানের তথ্য ও তার নিবিড় পাঠ বাংলার মানুষকে বাস্তু-বাগান রচনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করবে। বাড়ির পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী ও গৃহকর্ত্রীরাই মিলেমিশে রচনা করবেন এই বাগান।

এখন বলি এই জৈবচাষে কী করবেন আর কী করবেন না। প্রথম কথা জৈবচাষে রাসায়নিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। অজৈব-সার, রাসায়নিক কীটনাশক, রোগনাশক, মাকড়নাশক, কৃমিনাশক ব্যবহার না করে তার পরিবর্তে জৈবসার ব্যবহার করে এবং জৈব পদ্ধতিতে কীটপতঙ্গ, রোগজীবাণু, মাকড় বা মাইট, ফসলের কৃমি বা নিমাটোড দমনের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাই হল জৈব চাষ। তাতে কৃত্রিম হর্মোনের ব্যবহারও নিষিদ্ধ, নিষিদ্ধ জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বীজ ব্যবহার।

পুষ্টি বাগানের ফসল চক্র:
প্লট -১: জলদি ফুলকপি এবং সাথি ফসল রূপে পালং শাক (আষাঢ় থেকে আশ্বিন), আলু (কার্তিক থেকে ফাল্গুন), নটেশাক (চৈত্র থেকে আষাঢ়)।
প্লট -২ : নাবি বাঁধাকপি (আশ্বিন থেকে মাঘ), ভেন্ডি (ফাল্গুন থেকে আষাঢ়), মুলো (আষাঢ় থেকে ভাদ্র)।
প্লট -৩: ফুলকপির সঙ্গে সাথি ফসল ওলকপি (আশ্বিন থেকে মাঘ), গ্রীষ্মকালীন বেগুন সঙ্গে সাথি ফসল নটে শাক (ফাল্গুন থেকে ভাদ্র)।
প্লট -৪: জলদি বাঁধাকপি সঙ্গে সাথি ফসল পালং (ভাদ্র থেকে অঘ্রাণ), মটরশুঁটি (পৌষ থেকে বৈশাখ), বরবটি (জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ)।
প্লট – ৫: জলদি ফুলকপি সঙ্গে সাথি ফসল লালশাক (শ্রাবণ থেকে কার্তিক), পিঁয়াজ (অঘ্রাণ থেকে জ্যৈষ্ঠ), বরবটি (জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ)।
প্লট – ৬: ভেন্ডি (শ্রাবণ থেকে অঘ্রাণ), আলু (অঘ্রাণ থেকে ফাল্গুন), বরবটি (চৈত্র থেকে আষাঢ়)।
প্লট – ৭: টম্যাটো (কার্তিক থেকে ফাল্গুন), ভেন্ডি (বৈশাখ থেকে ভাদ্র), মুলো (ভাদ্র থেকে কার্তিক)।
প্লট – ৮: বরবটি (ভাদ্র থেকে কার্তিক), পেঁয়াজ (অঘ্রাণ থেকে বৈশাখ), লালশাক (জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ)।
প্লট – ৯: লালশাক (কার্তিক থেকে অঘ্রাণ), টম্যাটো (অঘ্রাণ থেকে বৈশাখ), উচ্ছে (বৈশাখ থেকে আশ্বিন)।
প্লট – ১০: বেগুনের সঙ্গে সাথি ফসল পালং (আষাঢ় থেকে ফাল্গুন), নটে শাক ( চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ)।
প্লট -১১: পেঁয়াজ (কার্তিক থেকে বৈশাখ), ভেন্ডি (জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন)

জৈবচাষে জৈবসার হিসাবে ব্যবহার করা যায় সবুজসার, সবুজ-পাতা সার, গোবর সার, খামারজাত কম্পোস্ট (ফার্ম ইয়ার্ড ম্যানিওর), ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো-সার), ফসফো-কম্পোস্ট, পোল্ট্রি-সার, প্রাণীজ গুঁড়োসার (শিং ও হাড়গুঁড়ো), খোল (নিম, মহুয়া, করঞ্জা, তিসি, বাদাম খোল প্রভৃতি) ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া ব্যবহৃত হয় জীবাণু সার যেমন অ্যাজোটোব্যাকটর, অ্যাজোস্পাইরিলাম, ফসফেট সলিউবিলাইজার ব্যাক্টেরিয়া, ভ্যাম ইত্যাদি।
সবুজসার বা গ্রিন ম্যানিউরের মধ্যে রয়েছে ধইঞ্চা, বরবটি, শণ প্রভৃতি শিম্বগোত্রের বিশেষ ফসল। তা অল্প সময়ের জন্য জমিতে চাষ করে নিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। তারপর মূল ফসল ফলাতে হয়।
এছাড়া নানান উদ্ভিদের পাতাকেও জমিতে মিশিয়ে দেওয়া যায়, যেমন সুবাবুল, করঞ্জা, সজনে, গ্লিরিসিডিয়া, বাবুল, রেড়ী, নিম, মহুয়া ইত্যাদি। সবুজ সার ও সবুজ-পাতা সারের ব্যবহারে মাটির জলধারণ ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে সেচের জলের চাহিদা কমায়। মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব দূর করতেও সাহায্য করে সবুজসার, উপরন্তু শেকড় দিয়ে মাটির নিচুস্তরের খাদ্যোপাদান টেনে হাজির করে উপরের স্তরে যা পরবর্তী ফসলকে খাবার যোগায়।

এই সার গাছের জন্য ব্যবহার করলে মাটিতে বায়বীয় চলাচল বজায় রাখে এবং মাটিতে উপকারী জীবাণু বাসা বাধতে সক্ষম হয়। সব্জির বীজতলায় জীবাণু সার হিসাবে অ্যাজোস্পাইরিলাম ব্যবহার করা যায়, ফসফেট সলিউবিলাইজার দিয়ে জমির অদ্রবণীয় ফসফরাস দ্রবণীয় অবস্থায় গাছের গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ভ্যাম-সারে ফসলের শিকড়ের মাধ্যমে ছড়ানো রোগ প্রতিহত করা যায়। এই সার মাটিতে ফসফরাস, সালফার ও জিঙ্কের সরবরাহ বাড়ায়।
আজকাল বহু জৈবচাষী বেগুন, পেঁয়াজ, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপির ফলন ও গুণমান বাড়াতে অ্যাজোটোব্যাক্টর নামক জীবাণু সার ব্যবহার করছেন। তৈলবীজ থেকে পাওয়া খোলে নানান মাত্রায় উদ্ভিদের খাবার সঞ্চিত রয়েছে। রেড়ি খোল প্রয়োগে উইপোকা মরে, নিম খোলে কৃমিশত্রু দমন করা যায়। মহুয়া খোল জমিতে দিলে দুমাস পরে তা গ্রহণযোগ্য হয়। রেড়ি খোল ধীরে পচে বলে গাছ তা গ্রহণ করতে যথেষ্ট সময় পায়।

জৈব কীটনাশক বোটানিক্যাল পেস্টিসাইড বা উদ্ভিজ্জ কীটনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয় নিমের অ্যাজাডাইরেক্টিন, আতা বীজের নির্যাস, লেমন ঘাস, তুলসী ক্বাথ। নিমাটোড বা কৃমির জন্য ব্যবহার করা চলে গাঁদাফুলের মূলের গুঁড়ো। জীবাণু কীটনাশক হিসাবে ব্যবহৃত হয় নানান ছত্রাক, ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাস। যেমন ট্রাইকোডারমা এট্রোভিরিডি দমন করে টমেটো ও আলুর নাবি ধ্বসা রোগ, ট্রাইকোডারমা ভিরিডি দমন করে টমেটোর গোড়া পচা, পাসিলোমাইসেস আলু ও টমেটোর নিমাটোড, ভারটিসিলিয়াম লঙ্কার জাবপোকা, স্টারমিয়া প্রজাতির ছত্রাক দমন করে বেগুনের ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা। ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ব্যাক্টেরিয়া বাঁধাকপির ডায়ামণ্ড ব্যাকমথ দমন করে। পাসটিউরিয়া দমন করে টমেটো ও লঙ্কার নিমাটোড। নিউক্লিয়ার পলিহেড্রোসিস ভাইরাসকেও নানান পোকা দমন করতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পরজীবী বন্ধুপোকার মধ্যে ব্রাকন, ট্রাইকোগ্রামাকে ব্যবহার করা হয় ভিণ্ডির কাণ্ড ও ফল ছিদ্রকারী পোকা এবং টম্যাটোর ফল ছিদ্রকারী পোকা দমন করতে। এছাড়া আলোক ফাঁদ ব্যবহার করে বহু শত্রুপোকাকে মেরে ফেলা যায়, জমিতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে যারা ফসলের অপকারী পোকা ধরে খায়, ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করে ফলের মাছি দমন করা যেতে পারে, ফাঁদ ফসলের চাষ করে পোকাকে মূল ফসল থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

