বিশেষ সংবাদদাতা, আমাদের ভারত, বার্নপুর, ২৬ আগস্ট: তিন দশকের লড়াইয়ের পরেও অনেকটাই যেন দুয়োরানি বাড়ির মালিকরা। এখনও ভাড়াটিয়ারাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার বার্নপুরে পশ্চিম বর্ধমান লোকাল হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভায় এই মন্তব্য করেন গৃহমালিকরা। এ ব্যাপারে রাজ্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তাঁরা। মালিকদের স্বার্থে ১২-দফা দাবি সরকারকে রূপায়িত করার দাবিও পেশ করা হয় সভায়।
সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে এসেছিলেন ‘দি ক্যালকাটা হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের’ তিন প্রতিনিধি। এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার রক্ষিত ভাষণে বলেন, “১৯৫৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘শাপমোচন’। সিনেমায় ১০ টাকা অনাদায়ী থাকায় মালিক বহিষ্কার করে দেন ভাড়াটিয়া উত্তমকুমারকে।
উত্তমকুমারের কন্ঠে ‘শোনো বন্ধু শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’। আলোড়িত হল বঙ্গবাসী। এর পর ১৯৫৬ সালে প্রণীত হল ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রেমিসেস টেনেন্সি অ্যাক্ট। তার পরে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন গৃহমালিকরা।“
গত কয়েক দশকে কীভাবে গৃহমালিক সমিতি পুরনো আইন বাতিলের আন্দোলন করেছে– ১৯৯৭ সালের নয়া বাড়িভাড়া আইন, ২০০২ সালে তার পরিমার্জন, অবশেষে সম্প্রতি কেন্দ্রের নয়া মডেল টেনান্সি আইন— এর ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করেন সুকুমারবাবু। সমিতির সহ সভাপতি অশোক সেনগুপ্ত এদিন সভায় বলেন, “আইন না মানার প্রবণতা এবং মালিক-ভাড়াটিয়া বিরোধে শাসক দলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এই পরিস্থিতিকে আরও নেতিবাচক করে তুলেছে।“ সমিতির কর্মকর্তা জয়দীপ ব্রহ্ম বলেন, “সমস্যার আর একটা বড় কারণ, ঠিক কোন ধারায়, কীভাবে বাড়িভাড়া আইনের রূপায়ণ দরকার, সে ব্যাপারে স্বচ্ছ আইনি জ্ঞান খুব কম লোকের মধ্যেই আছে। আইনজীবীদেরও এ ব্যাপারে সম্যক ধারণা কম।“ তিনি জানান, কেন্দ্র সব রাজ্যকে নয়া আইন রূপায়ণ করতে বলেছে। অসম চটজলদি তা রূপায়িত করেছে। কর্ণাটকে শীঘ্রই তা করার কথা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেলদোল নেই।

পশ্চিম বর্ধমান লোকাল হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পলক ব্যানার্জি বলেন, আসানসোল-বরাকর অঞ্চলে ভাড়াটিয়া সমস্যার চাপে নাজেহাল গৃহমালিকরা দু’বছর আগে এই সংগঠন তৈরি করেন। কিন্তু জন্মের পরেই করোনা ও লকডাউনে সব কাজ বন্ধ থাকে। এবার কলকাতার মূল সংগঠনের সহযোগিতায় আমরা আরও সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াসে ব্রতী হব। সংগঠনের সম্পাদক বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, “পরিস্থিতির চাপে অনেক মালিক ভাড়া না দিয়ে বাড়ি ফাঁকা রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতি বছর যে হারে মুদ্রাস্ফিতী হচ্ছে, সেই অনুপাতে ভাড়াবৃদ্ধি, বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত অর্থ ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে আদায়ের নিশ্চয়তা, ভাড়াটিয়ার নতুন ট্রেড লাইসেন্স এবং পুনর্নবীকরণের ক্ষেত্রে মালিকের সম্মতিসূচক পত্র (এনওসি) বাধ্যতামূলক করা, ভাড়াটিয়া মামলায় ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মত দ্রুত নিষ্পত্তিকরণ, বংশপরম্পরায় ভোগদখল বন্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা প্রভৃতি ১২-দফা দাবি সরকারকে রূপায়িত করতে হবে।“ এই দাবিপত্র তিনি এদিনের সভায় পেশ করেন।
সভায় ছিলেন স্থানীয় সমিতির সহ সভাপতি সুজিত লায়েক, কোষাধ্যক্ষ কার্তিক গড়াই, মহম্মদ শামিন, প্রমুখ। তাঁরা বলেন, ভাড়াটিয়ারা অনেকে ভাড়া দিচ্ছেন না। কিন্তু পুরসভা মালিকদের কাছ থেকে করের টাকা বুঝে নিতে চাইছেন। এই অবস্থায় বাড়ছে মালিকদের অসহায়তা। ভাড়াটিয়ার সমস্যায় জর্জরিত স্থানীয় অনেকে এসেছিলেন কলকাতার সমিতির অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে।

