আমাদের ভারত, হুগলী, ১ জুলাই: করোনার ভ্রুকুটি কাটতেই শ্রীরামপুরের মাহেশ, গুপ্তিপাড়া, চন্দননগর, দশঘড়া, চুঁচুড়া সহ জেলার একাধিক জায়গার রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে উৎসবে মাতল গোটা হুগলী জেলা। শুক্রবার বিকেলে ভক্তদের উন্মাদনা ও উদ্দীপনাকে পাথেয় করে সাড়ম্বরে জগন্নাথদেব বলরাম ও সুভদ্রারা গেলেন মাসির বাড়ি।
এদিন বিকেলে রথের টান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভক্তদের ভক্তি আর উৎসাহের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল মাহেশের পুণ্যার্থীদের। লক্ষাধিক ভক্তের উপস্থিতিতে জগ্ননাথদেব এদিন মাসির বাড়ি যাত্রা শুরু করেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ যেতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।

এদিনের এই রথযাত্রাকে ঘিরে মানুষের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মত। শ্রীরামপুরের এই রথযাত্রা দেখতে জেলা ছাড়িয়ে আশেপাশের জেলা থেকে প্রচুর পুণ্যার্থী মাহেশে ভিড় জমিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক এই রথযাত্রাকে উৎসাহিত করতে এদিন শ্রীরামপুরে বিভিন্ন গণসংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রকম প্রচার অভিযান চালান হয়।
৬২৬ বছর ধরে শ্রীরামপুরের মাহেশে জগন্নাথ মন্দিরে এই বিগ্রহের পুজো হয়ে আসছে। প্রতি বছর এই বিগ্রহগুলির অঙ্গরাগ সংস্কার হয় মাত্র। কিন্তু মূল কাঠামোর কোনও রুপ পরিবর্তন হয় না। পুরীতে প্রতি ১২ বছর অন্তর মূর্তির পরিবর্তন হলেও মাহেশের মূর্তির কোনও পরিবর্তন হয় না। যে সকল সেবায়েত মাহেশের ওই বিগ্রহগুলির অঙ্গরাগ করেন, তাদের কথায় কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বিগ্রহগুলি দিন দিন ভারী হয়ে যাছে।
প্রথম দিকে মাহেশে কাঠের তৈরি রথ থাকলেও সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই রথের আকার আকৃতি বদলে গিয়েছে। বহু বছর আগে কলকাতার বাসিন্দা কৃষ্ণকান্ত বসুর আর্থিক ব্যায়ে ১২৫টন ওজনের রথটি মার্কিন কোম্পানীকে তৈরির বরাত দেন। ৫০ ফুট উচ্চতার এই রথটির ৯টি চুড়া বর্তমান। রথের সামনে তামার তৈরি নীল ও সাদা রঙের ঘোড়া রয়েছে। ১০০ গজের ২টো ম্যনীলা রোফ দড়ি আছে। এই দড়ি ২টো রথ টানার কাজে ব্যবহার করা হয়।
শ্রীরামপুর রথের দিন সকাল থেকেই মন্দিরে পুজোপাঠ ও ভোগের ব্যবস্থা করা হয়। এদিন দুপুরে জগন্নাথ দেব, মাসির বাড়ি যাবার উদ্যেশ্যে সোনার গহনায় সুসজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে রথে ওঠেন। রীতি মেনে তিথি নক্ষত্র দেখে মন্দির সংলগ্ন স্নান পিড়ির মাঠে জগ্ননাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে স্নান করানোর সঙ্গে সঙ্গেই সামগ্রিক ভাবে শ্রীরামপুর মাহেশে রথযাত্রার প্রাক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কথিত আছে, শ্রীরামপুরের মাহেশের এই জগন্নাথ মন্দিরে চৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদার আগমণে এই ভূমি
পূন্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। রথের রশিতে টান দিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাহেশে এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন, মাহেশ জিউ ট্রাষ্টি বোর্ডের সম্পাদক সৌমেন অধিকারী।
এদিন রথযাত্রাকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে জেলা পুলিশ ব্যাপকভাবে তৎপর ছিল। এদিন বিশেষ নজরদারির জন্যে পুলিশের তরফে ড্রোন ওড়ানো হয়েছিল। ছিল কয়েকশো পুলিশ কর্মী। যদিও রথ উৎসবকে কেন্দ্র করে কোথাও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
শ্রীরামপুরের পাশাপাশি রথ উৎসবকে ঘিরে উন্মাদনা ছিল চন্দননগর ও গুপ্তিপাড়ায়। ১৭৫৮ খ্রীষ্টাব্দে যাদুবেন্দু ঘোষ নামে এক ব্যবসায়ী স্বপ্নে আদেশ পেয়ে চন্দননগরের রথ তৈরি করেন। প্রথম দিকে এই রথটি কাঠের থাকলেও বর্তমানে রথটি লৌহ দ্বারা নির্মিত।
অন্যদিকে গুপ্তিপাড়ার রথ ২৮৩ বছরে পদার্পন করল। ১৭৪০ সালে এই রথ উৎসব শুরু করেন মধুসুদানন্দ। পুরীর রথের সঙ্গে গুপ্তিপাড়ার রথের পার্থক্য হল, পুরীর রথকে জগন্নাথ দেবের রথ বলে, আর গুপ্তিপাড়ার রথকে বলে বৃন্দাবন জিউর রথ। গুপ্তিপাড়ার রথের বৈশিষ্ঠ হল, এখানে ভান্ডার লুট হয়। ভারতবর্ষের কোথাও এই ভান্ডার লুট হয় না।

