অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১৫ অক্টোবর: “ঠিক করেছিলাম দেশান্তরী হব না। কিন্তু পারলাম না”
“দেশ স্বাধীন হল। ভাগ হয়ে গেল বাংলা। হিন্দুদের ওপর মুস্লিমদের অত্যাচার বাড়ছিল। তবু আমরা ঠিক করেছিলাম দেশান্তরী হব না। কিন্তু পারলাম না”। ২০২২-এর পুজোর মুখে এই প্রতিবেদককে কথাগুলো বললেন শঙ্কর চক্রবর্তী।
তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কেন দেশ ছাড়লেন? কিভাবে এলেন? জবাবে বলেন, “পরিস্থিতির জন্য পাড়ার ভাল ভাল বহু লোকই এপারে চলে আসছিলেন। ১৯৪৮ থেকে যেন দেশান্তরী হওয়ার ঢল নামতে লাগল। দেশভাগের আগে থেকেই পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। দাঙা লেগেই থাকত। অনেকে সাত পুরুষের ভিটে ছেড়ে দেশান্তরী হতে লাগলেন। বাবা ছিলেন মাষ্টারমশাই। পড়শিরা কেউ কেউ তাঁকে বললেন, “বাঁচতে চাইলে বাচ্চাদের নিয়ে চলে যান মধুসূদনবাবু!” একটা সময়ে তিনিও অনুভব করলেন। আমাদের বললেন, “আর থাকতে পারবি না রে এখানে। চল চলে যাই!”
নিজের দেশ ছেড়ে কোথায় যাব? কোথায় গিয়ে উঠব? এসবের উত্তর ছিল না। ছ’ভাইবোন, মা ঠাকুমা বাবার সঙ্গে ঘর ছাড়লাম। ১৯৪৯ সালে বনগ্রাম লেনের বাড়ি ছেড়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আমরা এলাম ঢাকা ষ্টেশনে। ঢাকা থেকে ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ, সেখান থেকে লঞ্চে গোয়ালন্দ পেরোলাম। প্রাণ আর ইজ্জত বাঁচাতে দলে দলে অনেকে দেশ ছাড়ছেন। পথে মুসলমান গুণ্ডারা লুঠপাট করছে। ঝুঁকি নিয়ে এলাম কলকাতায়। শুনেছি বাড়িটা নাকি নীলামে বিক্রি হয়ে গিয়েছে।
অধুনা বাঁশদ্রোণীর লাগোয়া খানপুরের বাসিন্দা। জন্ম ১৯৩৫-এ ঢাকায়। তাঁর কথায়, “ঢাকায় আমাদের বাড়িতে একসময় দুর্গাপুজো হত। কিন্তু নানা কারণে কখনও আমার জীবন পুজোকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি। এই পুজোর সময় তবু মনে পড়ে ঢাকার কথা। ব্রাহ্মণপাড়ার বাড়িতে আত্মীয়দের আনাগোনা। কত আনন্দ!”
বিক্রমপুরে থাকতেন আমার ঠাকুর্দা। তিনি ঢাকায় এসে বাড়িটা করেন। বেশ বড় বাড়ি। ঠিকানা ৩৮, বনগ্রাম লেন। বাড়িতে দুর্গাপুজো হত। কিন্তু আমার জন্মের আগেই তিনি মারা যান। পুজো বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশে অনেক বাড়িতে পুজো হত। ওঁরাও আমাদের স্বজন ছিলেন। আমাদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম দ্বিতীয়। পড়তাম প্রিয়নাথ পাল হাইস্কুলে।
জন্মাষ্টমীর সময় খুব জমকালো সমাবেশ হত আমাদের ব্রাহ্মণপাড়ায়। জ্যাঠা ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের মুহুরি। ছয় পিসীর ছ’জনই কলকাতায় থাকতেন। পুজোর সময় সবাই সপরিবারে মাসখানেকের জন্য ঢাকার বাড়িতে আসতেন। দোতলা বাড়ি। অনেক ঘর। এমনিতে আমরা থাকতাম একতলায়। ওঁরা এলে দোতলায় থাকতেন। বাড়িটা ভরে যেত। বড়ির পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুঃখ উড়ে যেত ওই মিলনে। আর ঠাকুমা সারাদিন কত রকম খাবারের যে আয়োজন করতেন! উনিই ছিলেন পরিবারের শেষ কথা।
জীবন এভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু পরিচিতরা এখানে কেউ থাকতে দেননি। উদয়াস্ত ঘুরেও বাবা কোনও বাঁচার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। চেতলাহাটে একটা বস্তির ভাড়ার ঘর যোগার করলেন। টালির ছাদের নিচে কোনওক্রমে মাথা গুঁজলাম ৬ ভাইবোন, বাবা-মা আর ঠাকুমা, মোট ৯ জন। বাবা কাজ না পেয়ে যজমানি শুরু করলেন। কী অভাব! এরকম অবস্থাতে মারা গেলেন ঠাকুমা।” বলতে বলতে ফোনে কেঁদে দিলেন শঙ্করবাবু।
তিনি জানান, “ঢাকার বাড়িটা বাবা এক বিহারি মুসলমানকে দুবছরের অগ্রিম নিয়ে ভাড়া দিয়ে দিয়েছিলেন। বোধহয় হাজার তিন টাকা পেয়েছিলেন। ওরা ভাড়ার টাকা আর দেয়নি। এপার বাংলায় এসে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে যখন বাবা লড়াই করছেন, বকেয়া টাকা নিতে ১৯৫২-তে আমাকে একবার পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়। তখনও পাসপোর্ট চালু হয়নি। ঝুঁকি নিয়ে এসেছিলাম। সে এক অন্য কাহিনী। এর মধ্যে সামান্য টাকায় টালিগঞ্জের আজাদগড়ে একটা জমি যোগার করলেন বাবা। পুজো আসে, পুজো যায়। আমাদের আর সেসব খুব একটা নাড়া দিত না। বেঁচে থাকাটাই তখন বড় প্রশ্নের।
টেকনিক্যাল স্কুলে পাঠ সমপান্তে বেসরকারি সংস্থায় একটা কাজ যোগাড় করলাম। দিদি আর এক বোনের বিয়ের পর আমি বিয়ে করলাম ১৯৬০-এ। ১৯৭৩-এ মারা গেলেন বাবা, ’৭৮-এ মা। ১৯৮০-তে প্রযুক্তি পরামর্শদাতা হিসাবে গেলাম ইয়েমেনের রাজধানী সানা-এ। ওখানে মা লক্ষীর আশীর্বাদ পেলাম। খুব দুঃখের, বাবা-মা আমার সেই প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারলেন না।
আজ ৮৭ বছর বয়সে এই পুজোর মরশুমে ঘুরেফিরে মন চলে যায় ঢাকার ব্রাহ্ণণপাড়ায়। কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি এভাবে ভিটে থেকে আমাদের প্রায় উৎখাত হতে হবে। শূন্য থেকে শুরু করতে হবে নতুন জীবন। কিন্তু যা গিয়েছে, তা যাক! জীবনসায়াহ্ণে ভাবি, ঠাকুর যা করেছেন, ভালই করেছেন।“

