পূর্ববঙ্গে ভিটেছাড়া, কিছু ভাবনা (৫)

(ছবি: নিরঞ্জন রায়)
অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ১৪ অক্টোবর: “ছেড়ে আসা জন্মভূমি”। কেন এমনভাবে জন্মভূমি ছেড়ে চলে আসতে হলো? ফিরে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছে? বিশদ জানতে চেয়েছিলাম দক্ষিণ কলকাতার একটি স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন রায়ের কাছে।

বয়স প্রায় ৮৫। ২০২২-এর ২৩ মার্চ তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, “কথায় বলে ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী”। আর সেই জন্মভূমি, যেখানে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ও আমার জন্মস্থান। যেখানে আমি প্রথম হাঁটতে শিখেছি, যার জলহাওয়ায় বড় হয়েছি, তা এক দিন ছেড়ে চলে আসতে হল। ঘরবাড়ি, জমিজমা, পুকুর ঘাট, আম-কাঁঠালের বাগান, ঠাকুর মন্ডপ সবকিছু ফেলে উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিম বঙ্গে চলে আসতে হল।

কেন? উত্তর, আমরা না কি স্বাধীন হলাম! এ কেমন স্বাধীনতা? কোটি কোটি মানুষকে বাস্তুচ্যূত করে, নির্যাতন ও দাঙ্গার মুখে ফেলে একেমন স্বাধীনতা! স্বাধীনতার স্বাদ যে এত ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতী তা পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘুরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন এবং এখনও টের পাচ্ছেন।

পূর্ববঙ্গে প্রায় ১৭ পুরুষ ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা থাকতেন। তারও আগে বংশের পূর্বসূরীরা থাকতেন বর্ধমানের মঙ্গলকোট গ্রামে। মারাঠা বর্গীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ওঁরা পূর্ববঙ্গের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে চলে যান। পূর্ববঙ্গে আমাদের একটি ঠিকানা ছিল। গ্রামের নাম হাসনপুর। ডাকঘর ফতেপুর। জিলা ময়মনসিংহ। ঠিকানা আমার হারিয়ে গেছে দেশ বিভাগের ফলে। তবে হারায়নি জন্মভূমির স্মৃতি। গ্রামটি অধুনা বাংলাদেশে নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে। ভাটি অঞ্চল নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওড়ের দেশ। বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া যাতায়াত করার উপায় ছিল না।

আমাদের যৌথ পরিবার। তিন উঠানের বাড়িতে ৭/৮খানা টিনের ঘর ছিল। শুধু দক্ষিণের ঘরটি পাকা ছিল। ঐ ঘরেই আমরা থাকতাম। বাড়ির পূবে ও দক্ষিণে পুকুর ছিল। পূবের পুকুরটি খাল দ্বারা মগরা নদীর সঙ্গে যুক্ত। ঐ পুকুর ঘাটে ২/৩টি নৌকা বাধা থাকত। দক্ষিণের পুকুর পাড়ের চারদিকে আম, জাম, কাঠাল ও লিচু গাছ ছিল। শহরের বাড়িটা ছিল ময়মনসিংহ শহরে প্রায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর। পচাপুকুরপাড়ায় ১ নম্বর গার্লস স্কুল রোডে।

বাড়ি ও গ্রামের সবুজ ছায়া মাখা শীতল ছবি এখনও স্মৃতি পটে ভেসে ওঠে। কিন্তু একদিন সেই সাধের গ্রাম ছেড়ে ময়মনসিংহ শহরে চলে আসলাম। শহরে আমাদের বাসা বাড়ি ছিল। ১৯৪৫ সাল থেকে আমরা শহরবাসী হয়ে গেলাম। বাড়িতে থেকে গেলেন শুধু বিধবা ধন পিসি আর কাজের মেয়ে মেঘলাদি। বহু দিনের পুরাতন চাকর মিয়াফর বহাল থাকল তাঁদের দেখাশোনার ও বাইরের কাজের জন্য। আমরা শুধু স্কুলের ছুটিছাটায় বাড়িতে যেতাম। বাড়ি গেলে আর ফিরে আসতে ইচ্ছে করত না।

নিরপত্তার কারণে গ্রাম ছেড়ে শহরে এলাম। কিন্তু ১৯৪৬/৪৭-এর পর থেকে শহরের অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। লুটতরাজ ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা প্রায়ই এদিক সেদিক ঘটছিল। ইতিমধ্যে বড় জেঠু মারা যান। ছোট কাকা বাড়ির মেয়েদের ও জেঠতুতো ভাইদেরকে নিয়ে কলকাতার কাছে বেলঘড়িয়াতে চলে যান। আমরা মা-বাবার সঙ্গে ময়মনসিংহে থেকে গেলাম।

আমরা একে একে সবাই বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে এলাম। কিন্তু এলেন না আমার বয়স্কা ধন পিসিমা। তিনি চোখের জলে মঙ্গল কামনা করে সকলকেই বিদায় দিয়েছিলেন। তাঁকে আনা গেল না। ধন পিসিমা বলতেন, “আমি জন্মেছি এই মাটিতে, মরবোও এই মাটিতে।” হলোও তাই। তিনি তাঁর পৈতৃক ভিটাতেই দেহত্যাগ করলেন, কিন্তু দেশত্যাগী হলেন না।

যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। বিষয় আসয় চার ভাগ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে আমি ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে আই. এ.পাস করে কলকাতায় চলে আসি। সঙ্গে বাবা ছিলেন। হাওড়ায় শিবপুরে দীনবন্ধু কলেজে বি. এ. প্রথম বর্ষে ভর্তি হলাম। বাবা আবার দেশে ফিরে গেলেন। শিবপুরে জ্যাঠতুতো দাদা চিনিদার (পরমেশ রায়) এর বাসায় থেকে গেলাম।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. পাস করে বি.এড.করলাম। তারপর শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে কসবায় বাড়ি ভাড়া করে সংসার পাতলাম। ছোট বোন ভাবনাকে নিয়ে এলাম। তখনও বাবা-মা ও অন্য তিন ভাইয়েরা ময়মনসিংহে থেকে গেলেন। ১৯৬২ সালে রামগড়ে দুই কাঠা জমি কিনে বহু কষ্ট করে নিজস্ব একটি বাড়ি করলাম। ছোট বোন ভাবনার বিয়ে দিলাম।

এরপর গঙ্গা-পদ্মা নদীতে অনেক জল নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে গেছে। ১৯৭১সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাক হানাদার বাহিনীর বাঙ্গালী গণহত্যার পালা। বিশেষ করে হিন্দু নিধন শুরু হয়।বাবা-মা ভাইদের নিয়ে মেঘালয় সীমান্ত পেরিয়ে কষ্টে, প্রাণ হাতে করে, দীর্ঘ পথ হেঁটে, বাঘমারা শিবিরে আশ্রয় নেয়। সে এক ভয়াবহ কষ্টের দেশত্যাগের কাহিনী! সেখান থেকে ওঁদের কলকাতায় নিয়ে আসি। এক ভাই অবশ্য কর্মসূত্রে থেকে যান ঢাকায়। তাঁর স্ত্রী ছিলেন শিক্ষিকা। দুজনই এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাঁদের দুই কন্যা কানাডায়।

হাসানপুরে আমাদের সম্পত্তি খাস জমি বলে ঘোষণা করে দেয় সরকার। ২০০৯ সালে একবার দেখতে গিয়েছিলাম। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন বোর্ডের অফিস— এ সব হয়েছে। দেখতে দেখতে আমার শৈশবের ঘরবাড়িগুলোর কথা মনে পড়ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *