Historic verdict, Supreme Court, ঐতিহাসিক রায়! দেশে প্রথম এক তরুণকে ইচ্ছামৃত্যুর অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের

আমাদের ভারত, ১১ মার্চ: এই গল্প মুক্তি পাওয়ার আর্তনাদের গল্প। এই গল্প নিষ্কৃতিতেই তৃপ্ত হবার গল্প।সন্তানের ইচ্ছা মৃত্যুর দাবিতে লড়াইয়ের গল্প। বাবা মাও যে ভালোবাসার কারণেই সন্তানের মৃত্যু চাইছেন সেই গল্প।

দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা তরতাজা মেধাবী এক ছেলে স্কুলগন্ডি পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মোহালির চন্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিলেন। থাকতে শুরু করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেসে। সেই সময় মেসের চারতলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটে। ওই তরুণ আঘাত পান মাথায়। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। প্রাণে বেঁচে গেলেও কোমায় চলে যান তিনি।

তেরো বছর ধরে শয্যাশায়ী বছর ৩২- এর হরিশ রানার নিষ্কৃতি মৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তরুণের নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করেন তার ৬২ বছরের বাবা অশোক রানা মা নির্মলা দেবী। সন্তানের মৃত্যু কামনার মতো ভয়ঙ্কর বেদনায় স্তব্ধ তাঁরা, বাকরুদ্ধ তাঁরা। কিন্তু সত্যি কি এছাড়া কোনো উপায় ছিল তাদের?

২০১৩ সালের ২০ আগস্ট থেকে রাখি বন্ধনের দিন দুর্ঘটনায় প্রাণে বাঁচলেও অক্ষম হয়ে পড়েন হরিশ। শরীরে ১০০ শতাংশ পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়। মাথা থেকে পা সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। বিছানাই তার আশ্রয়। ছেলেকে সারিয়ে তুলতে কম চেষ্টা করেননি মা- বাবা। এইমস, রামনগর লোহিয়া, লোক নায়ক এবং দিল্লি ফর্টিস হাসপাতালে ছুটে গেছেন তাঁরা। কিন্তু কোনো চিকিৎসাই যন্ত্রণার অন্ধকার থেকে হরিশ আর তার মা-বাবাকে বের করে আনতে পারেনি। বরং প্রতিদিন চোখের সামনে নিজের ছেলেকে প্রাণহীন পুতুলের মত পড়ে থাকতে দেখেছেন বৃদ্ধ দম্পতি। আর চোখের জল ফেলেছেন। ডাক্তারি পরিভাষায় হরিসের পার্সিস্টেন্ট ভেভেজিটেটিভ স্টেট হয়েছে।

ছেলের এই দুর্বিসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না এই বৃদ্ধ দম্পতি। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন অশোক রানা ও নির্মলা দেবী।

এই অবস্থায় ২০২৪ সালে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তাঁরা। মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে ছেলের জন্য নিষ্কৃতি মৃত্যুর দাবি জানান। যদিও জীবন যুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে হেরে চলা দুটি মানুষের ইচ্ছেতে সায় দেয়নি হাইকোর্ট। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন হরিশের বাবা-মা। প্রাথমিক আবেদনে সাড়া দেয়নি সুপ্রিম কোর্টও। যদিও প্রতিবার আদালতে হরিশের বাবা-মা’ই বার্তা দেন, যখন বাবা-মা তাদের সন্তানের মৃত্যু কামনা করেন তখন তা নিষ্ঠুরতা নয় বরং ভালোবাসার টানেই ছেলের জীবন শেষ করে দেওয়ার অনুমতি চাইছেন তাঁরা।

আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েও আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন বাবা অশোক রানা ও মা নির্মলা দেবী। ছেলের চিকিৎসা চালাতে ২০২১ সালে নিজেদের তিন তলা বাড়ি বিক্রি করে দেন। শেষ সম্বল পেনশনের কয়েকটা টাকা। হরিশের ভাই আশিষ বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। তার চাকরি পাওয়ার পরে সংসারের টানাটানি কিছুটা কমলেও হরিশের চিকিৎসা চালাতে নাভিশ্বাস উঠেছে দম্পতির। এই অবস্থায় ২০২৫ সালে আবারো সুপ্রিম কোর্টে হরিশের নিষ্কৃতি মৃত্যুর আবেদন করেন বৃদ্ধ-দম্পতি।

এবারে দুটি মেডিকেল বোর্ডের মতামত শুনে নিষ্কৃতি মৃত্যুর অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। সজল চোখে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কেবি বিশ্বনাথন।

নিষ্কৃতি মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার সময় আবেগঘন বক্তব্যে দুই বিচারপতির বেঞ্চ বলে, একজন মানুষের স্বেচ্ছা-মৃত্যুর অধিকার আছে? এই প্রশ্ন মনে পড়ে মার্কিন মন্ত্রী হেনরি ওয়ার্ড বিচারের বিখ্যাত উক্তি, মানুষ জীবন চায় কি না ঈশ্বর জানতে চায় না। বাধ্যতামূলক তা গ্রহণ করতে হয়। হরিশের নিষ্কৃতি মৃত্যুর রায় দিতে গিয়ে বিচারপতির বেঞ্চ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটের প্রসিদ্ধ লাইনটি, “টু বি অর নট টু বি” র উল্লেখ করেন। বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা, বিচারপতি কেবি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার সময় হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রশংসা করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘ ১৩ বছর তারা পুত্রের পাশে থেকেছেন। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি ২ মেডিকেল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার এবং সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন হরিশের জন্য মঙ্গল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *