স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ১৩ মার্চ: নদিয়ার ঐতিহ্যবাহী শহর শান্তিপুর শুক্রবার এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহের সাক্ষী থাকল। অযোধ্যা ধাম থেকে আনা প্রভু শ্রী রামের পবিত্র চরণ পাদুকাকে সামনে রেখে শহর জুড়ে অনুষ্ঠিত হলো এক বিশাল নগর পরিক্রমা, যেখানে হাজার হাজার ভক্ত ও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলেন। শ্রী কৃত্তিবাসের রাম মন্দির ট্রাস্টের উদ্যোগে আয়োজিত এই নগর পরিক্রমা শহরের বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে যেন ভক্তি, আবেগ ও সাংস্কৃতিক গৌরবের এক বিরল পরিবেশ তৈরি করলো। এই পবিত্র চরণ পাদুকা সম্প্রতি অযোধ্যার শ্রীরাম জন্মভূমি থেকে শান্তিপুরে নিয়ে আসেন কৃত্তিবাস রাম মন্দির ট্রাস্টের সভাপতি ও শান্তিপুরের প্রাক্তন বিধায়ক অরিন্দম ভট্টাচার্য।

জানা গেছে, গঙ্গার তীরে অবস্থিত শ্রী কৃত্তিবাস রাম মন্দির তীর্থক্ষেত্রে প্রস্তাবিত রাম মন্দিরের শিলান্যাস অনুষ্ঠানের সময় এই চরণ পাদুকা সেখানে স্থাপন করা হবে। শুক্রবার বিকেল চারটেয় শান্তিপুরের বড় গোস্বামী বাড়ি থেকে শুরু হয় এই নগর পরিক্রমা। শহরের বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করে শেষ হয় হাটখোলা পাড়ার গোকুল চাঁদ বাড়িতে। পথ জুড়ে হাজার হাজার মানুষ “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি তুলে এই শোভাযাত্রায় সামিল হন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্য ছিল স্থানীয় মহিলাদের অংশগ্রহণ। রাস্তার দু’পাশে এবং বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে তারা পুরো পথ জুড়ে ভক্তি ভরে ফুলের বর্ষণ করেন। মুহূর্তেই শহরের বাতাস যেন উৎসবের আবহে ভরে ওঠে। শুধু তাই নয়, পথ জুড়ে সারি সারি প্রদীপের আলো, স্থানীয় ব্যান্ড দলের বাদ্যযন্ত্র, আর আকাশ জুড়ে আতস বাজির ঝলকানি, এই শোভাযাত্রাকে এক ভিন্নমাত্রা প্রদান করে। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শান্তিপুরে এমন বিশাল আকারের ধর্মীয় শোভাযাত্রা খুবই কম দেখা গিয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবে শান্তিপুর এক সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। একদিকে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব, যেখানে শ্রী অদ্বৈত আচার্যের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, অন্যদিকে শাক্ত উপাসনার ঐতিহ্য, যেমন মা জগদ্ধাত্রী এবং অন্যান্য দেবীর পূজা। এই শহরেই জন্মেছিলেন মধ্যযুগের কবি মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝা। যিনি প্রায় ছয় শতাব্দী আগে রচনা করেন বাংলার কৃত্তিবাসী রামায়ণ। তাঁর হাত ধরেই সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায় রামকথা।
বর্তমানে সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে শান্তিপুরে শ্রী কৃত্তিবাস রাম মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অযোধ্যা থেকে আনা চরণ পাদুকা এবং পবিত্র মৃত্তিকা যেন এই উদ্যোগের প্রতীকী সেতুবন্ধন, অযোধ্যা ও শান্তিপুরের মধ্যে এক নতুন আধ্যাত্মিক যোগসূত্রের ইঙ্গিত।
এই নগর পরিক্রমায় শহরের সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। অনেকেই এটিকে শান্তিপুরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অনেকের মতে ১৩ মার্চ ২০২৬ দিনটি শান্তিপুরের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যেদিন অযোধ্যার পবিত্র ঐতিহ্য ও কৃত্তিবাসের শান্তিপুর একসঙ্গে ভক্তির এক নতুন অধ্যায় রচনা করলো।

