পার্থ খাঁড়া, আমাদের ভারত, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৩ মার্চ: বর্তমান বিশ্বের গভীর জ্বালানি সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে বিকল্প শক্তির উৎস এবং উন্নত উপকরণের (Advanced Materials) গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রাসঙ্গিকতাকে সামনে রেখেই মেদিনীপুর কলেজের (স্বশাসিত) পদার্থবিদ্যা বিভাগের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে কলেজের বিবেকানন্দ হল এবং সেমিনার হলে আয়োজিত হচ্ছে তিন দিনের এক বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ‘অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস অ্যাট দ্য এনার্জি- এনভায়রনমেন্ট নেক্সাস: টুওয়ার্ড এ গ্রিনার ফিউচার’ শীর্ষক এই বিদগ্ধ সমাবেশে দেশ-বিদেশের বরেণ্য বিজ্ঞানী ও গবেষকরা আগামী দিনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বিভাগের গৌরবোজ্জ্বল ১০০ বছর উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এই মহতি অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও বিশিষ্ট গুণীজনদের সংবর্ধনার মধ্যে দিয়ে। বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের এই যজ্ঞে মুখ্য পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ ড: অসিত পাণ্ডা। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড: দীপক কুমার কর ভার্চুয়ালি এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। উভয়েই তাঁদের বক্তব্যে সম্মেলনের গুরুত্বের কথা বলেন। পদার্থবিদ্যা বিভাগের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে তারা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত সকলকে ভবিষ্যতের জন্য শুভেচ্ছা জানান। অধ্যক্ষ উন্মোচন করেন সেমিনারের অ্যাবস্ট্রাক্ট ভলিউমের। সেমিনারের ব্যপারে শ্রোতাদের অবগত করেন সম্মেলনের চেয়ারম্যান ডঃ রাজীব প্রধান এবং সম্মেলনের মুখ্য আহ্বায়ক ডঃ অভিজিৎ বেরা। সিএসআইআর এবং এএনআরএফ -এর আর্থিক আনুকূল্যে আয়োজিত এই সম্মেলনটি আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে তারা আশা ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল শক্তি ও পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক। বিশেষ করে জ্বালানি কোষ বা ‘ফুয়েল সেল’-এর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত উপকরণের গবেষণা নিয়ে আলোকপাত করেন বক্তারা। বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা যেভাবে ঘনিয়ে আসছে, তাতে হাইড্রোজেন শক্তি বা উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তির ব্যবহার যে অপরিহার্য, তা প্রতিটি আলোচনায় উঠে আসে।
সম্মেলনটি প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। আইআইটি খড়্গপুরের অধ্যাপক ড: সামিত কুমার রায় তাঁর সূচক বক্তৃতায় সেমিকন্ডাক্টর ও ন্যানো-ফটোনিক্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোকপাত করেন। দ্বিতীয় সূচক বক্তা তাইওয়ানের ‘অ্যাকাডেমিয়া সিনিকা’র বিশিষ্ট গবেষক ড: ইং-শো হোওয়াং সশরীরে উপস্থিত থেকে তাঁর মূল্যবান গবেষণাপত্র পাঠ করেন। এ ছাড়াও জার্মানি, ইতালি এবং কানাডার গবেষকরা এই বিদগ্ধ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। পিছিয়ে ছিল না ভারতের অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও। আইআইটি খড়্গপুর, আইএনএসটি, জেএনইউ এবং বিআইটিএস পিলানির মতো প্রথিতযশা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা তাঁদের সাম্প্রতিক কাজের নির্যাস তুলে ধরেন।

তিন দিনের এই অধিবেশনে মোট ১৮টি গবেষণাপত্র উপস্থাপিত হয়। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের গবেষকদের কাজের উৎসাহ দিতে আয়োজিত হয়েছিল পোস্টার সেশন, যেখানে ৩০টি গবেষণামূলক পোস্টার প্রদর্শিত হচ্ছে। তবে অ্যাকাডেমিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ১৩ মার্চের সন্ধ্যেয় বিভাগের ছাত্র- ছাত্রীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ১৪ মার্চ সন্ধ্যার আকাশ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি। এন সি রানা স্কাই অবজারভেশন সেন্টারের সহযোগিতায় আয়োজিত এই সেশনটি ছাত্র- ছাত্রীদের মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে বলে আয়োজকরা মনে করেন।
শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে মেদিনীপুর কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগ কেবল তার অতীত ঐতিহ্যকেই উদযাপন করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক সবুজ ও সমৃদ্ধ পৃথিবীর স্বপ্ন বপন করল।

