শিয়ালদহ মিউনিসিপাল মার্কেট থেকে এনআরএস— ১৫০ বছরের এক উজ্জ্বল যাত্রা

আমাদের ভারত, কলকাতা, ৭ ফেব্রুয়ারি: আধুনিক চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং সিপাহী বিদ্রোহ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনের অবসানের পর বৃটিশ রাজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকারী বিভিন্ন প্রকল্পের অঙ্গ হিসাবে ১৮৭৪ খৃষ্টাব্দে শিয়ালদহ মিউনিসিপাল মার্কেট হাসপাতালকে ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলে রূপান্তরিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৮ খৃষ্টাব্দে এটি ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল ও কলেজে উন্নিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৫০-এ হাসপাতালটিকে বাংলা তথা ভারতের গর্ব অন্যতম উজ্বল তারকা চিকিৎসক ও কলেজের প্রাক্তন কৃতি ছাত্র স্যার নীলরতন সরকারের নামাঙ্কিত করা হয়। সেদিন যে চারাগাছটি রোপিত হয়েছিল দেড়শো বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ সেটি দেশের অন্যতম প্রধান মেডিক্যাল কলেজ হিসাবে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল স্কুল ও কলেজের মতো মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই ২০২৩-এ চলছে এই প্রতিষ্ঠানের সার্ধ শতবার্ষিকি উদযাপন।

দেড়শো বছরের এই দীর্ঘ সময়ে কলেজ জন্ম দিয়েছে বহু কৃতি ছাত্র তথা প্রথিতযশা চিকিৎসকের। স্যার নীলরতন সরকার (১৮৬১-১৯৪৩), ডা: হৈমবতী সেন, ডা: রামচন্দ্র দত্ত, উনিশশ বাহাত্তর সালের ব্রোঞ্জ জয়ী ওলিম্পিক হকি দলের সদস্য ডা: ভেস পেজ, প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার ডা: গীতা ঘোষ, প্রভৃতি বহু বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী চিকিৎসক এই মেডিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে তাঁদের ছাত্র জীবন সম্পূর্ণ করেছেন।

অন্যদিকে, এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ চিকিৎসা গবেষণার একটি তীর্থ ক্ষেত্র। ১৯১২ সালে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ স্যার কেদারনাথ দাস বাঙ্গালি মহিলাদের পেলভিসের উপযোগী ডেলিভারির জন্য একটি ফরসেপ আবিষ্কার করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে যেটি ‘দাসেস ফরসেপ’ বা বেঙ্গল ফরসেপ নামে পরিচিত। এর প্রায় দশ বছর পর এই হাসপাতালে গবেষণা করেই স্যার উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী ১৯২২ সালে মারণ রোগ কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করেন। গবেষণার এই ধারা বজায় থাকে স্বাধীনতার পরেও।

পঞ্চাশের দশকে প্যাথোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শম্ভুনাথ দে আবিষ্কার করেছিলেন কলেরা টক্সিন আর এই কলেজে চাকরি করার সময়ে ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গোপনে গবেষণার সুবাদে জন্ম হয় ভারতের প্রথম নলজাতক দুর্গার। এছাড়াও ইদানিং কালে সদ্যোজাতের চিকিৎসা, জোড়া নবজাতককে আলাদা করা বা হার্টের ভাল্ভ প্রতিস্থাপনের মতো যুগান্তকারী চিকিৎসায় এই শহরে এই মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক ও চিকিৎসকরাই প্রথম পথ দেখান। বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ডা: বিধানচন্দ্র রায় ১৯১২ থেকে ১৮ এই কলেজের শিক্ষক ছিলেন। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সুবীর চট্টোপাধ্যায়, ধাত্রী বিদ্যার অধ্যাপক ডিসি দাঁ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা: সমীর বিশ্বাস বা বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডা: বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর মতো বহু প্রবাদপ্রতীম চিকিৎসক বিভিন্ন সময়ে এই কলেজের অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেছেন।

বর্তমানে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের প্রায় সাঁইত্রিশটি বিভাগে এমবিবিএসে ২৫০ জন ও এমডিওএমএসে প্রায় ১২২ জন ছাত্র পড়াশোনা করতে পারে। ডিএম ও এমসিএইচ কোর্সে আসন রয়েছে যথাক্রমে ১৬ ও ১৫টি। ১৯২০ শয্যার এই হাসপাতালে শুধু বর্হিঃ বিভাগেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার হাজার সাতশো মানুষ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখাতে আসেন। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে দিন রাত চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীরা মানুষের সেবা করে চলেছেন।

সারা বছর ধরেই চলছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সার্ধশত বার্ষিকী উদযাপন। এরই মধ্যে আগামী ১০ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি এনআরএস মেডিক্যাল স্কুল ও কলেজের প্রাক্তনী পড়ুয়াদের সংগঠনের ১৫০ বছর উদযাপন কমিটির উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠান হতে চলেছে। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা। দশ তারিখের মূল অনুষ্ঠান ছাড়াও বিজ্ঞান-বিষয়ক তিনদিনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁরা যোগ দিয়ে অভিজ্ঞতা ও মত বিনিময় করবেন।

মঙ্গলবার এই উপলক্ষে কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সন্মেলন হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি ডা: অভিজিৎ ঘোষ, অর্গানাইজিং সেক্রেটারি ডা: সৌরভ দত্ত, সহ সভাপতি ডা: মানস গুমটা, ডা: দ্বৈপায়ন মুখার্জি, ডা: সৌরেন পাঁজা, ডা: অমিত দাস, ডা: সুজয় ঘোষ ও ডা: সত্যদিপ মুখার্জির মতো বিশিষ্ট চিকিৎসক ও কিছু প্রাক্তন ছাত্র। সন্মেলনে বিভিন্ন বক্তারা কলেজের অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন দিক এবং কলেজ সম্পর্কে ভবিষ্যত পরিকল্পনা সন্বন্ধে বক্তব্য রাখেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *