সাথী দাস, পুরুলিয়া, ২৯ মার্চ: আগুনে জ্বলছে অযোধ্যা-পাঞ্চেত-জয়চন্ডী পাহাড়ের বনভূমি। আর এতে নাভিশ্বাস উঠছে ওই বনভূমিতে থাকা বন্যদের। বিক্ষিপ্তভাবে পুরুলিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে চলেছে। যদিও বন দফতর এই আগুন লাগার আশঙ্কায় আগেই প্রচার অভিযান শুরু করে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।
গত এক সপ্তাহ ধরে পুরুলিয়ার বিভিন্ন পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেই চলেছে। গড় পঞ্চকোট থেকে অযোধ্যা পাহাড়। বাদ যায়নি জয়চন্ডী পাহাড়ও। বন দফতরের দাবি, আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। মূলত এই সময় শীতের শেষে জঙ্গলের শুকনো পাতা ঝড়তে শুরু করে। শুকনো পাতা গোটা এলাকায় পড়ে থাকায় মহুল ফুল তুলতে অসুবিধা হয় স্থানীয়দের। তাই বিভিন্ন গাছের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতা পরিষ্কার না করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে বনদফতর সূত্রের খবর। পাশাপাশি কেন্দু পাতা সংগ্রহ করে স্থানীয়রা। আর এই আগুন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগে না। এই আশঙ্কা করেই পুরুলিয়া বনদফতরের পক্ষ থেকে গত ২১ তারিখ সচেতনতা প্রচার শুরু করেন। মাইকে প্রচার করার পাশাপাশি বিলি হয় প্রচারপত্র। বাংলা ভাষার পাশাপাশি অলচিকি ভাষাতেও এই প্রচারপত্র ছাপিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিলি করে বনদফতরের কর্মীরা। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

গত ২৩ তারিখ প্রথম আগুন লাগে গড় পঞ্চকোট পাহাড়ের জঙ্গলে। এই পাহাড়ের আয়তন প্রায় ২৭.৯২ বর্গ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৪৯০ মিটার। এই পাহাড়ে ওঠার কোনও রাস্তা না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সমস্যায় পড়তে হয় বনকর্মীদের। পাশাপাশি তার পরেই বান্দোয়ান বনাঞ্চলেও আগুন লাগে। বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
গত ২৭ তারিখ রঘুনাথপুর থানার জয়চন্ডী পাহাড়ে আগুন লাগে। এই পাহাড় বন দপ্তরের অধীনে না হওয়ায় সেখানে বনদপ্তর এর কর্মীরা যেতে পারেননি। জয়চন্ডী পাহাড় ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের হওয়ায় সেখানে দমকল বাহিনী পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এই পাহাড়ে কোনও শাল বা মহুলের জঙ্গল নেই। কিন্তু এই পাহাড়েও কেন আগুন লাগল বা কারা আগুন লাগালো সেই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জয়চন্ডী পাহাড়কে ঘিরে বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। পর্যটকরা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে কোনওভাবে বিড়ি বা সিগারেট খেয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। যদিও পরিষ্কার করে কেউ কিছু বলতে চাননি।

অন্যদিকে অযোধ্যা পাহাড় ও খামার বিট এলাকায় আগুন লাগে। বনদফতরের কর্মীরা গিয়ে সেই আগুন নিভিয়ে ফেলে। তবে পুরুলিয়ার গড় পঞ্চকোট থেকে অযোধ্যা পাহাড়। এই পাহাড়ে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বাস করে। আগুন লাগার ফলে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসতে পারে। সেই কারণে চোরাশিকারিরা বন্য প্রাণীকে শিকার করার জন্য আগুন লাগানোর সাথে যুক্ত থাকতে পারে। যদিও বনদফতর এই ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে বলে জানান, কংসাবতী উত্তর বনবিভাগের অন্তর্গত রঘুনাথপুর রেঞ্জের আধিকারিক বিবেক কুমার ওঝা।
অন্যদিকে, ঝালদা বনাঞ্চলের খামার আশর পাহাড়ের জঙ্গলে আগুন নেভাতে ব্যস্ত ঝালদা বনদফতরের কর্মীরা।
ঝালদা বনদফতর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৮ শে মার্চ বিকেল নাগাদ ঝালদা বনাঞ্চলের খামার বিটের আশরা জঙ্গলে আগুন দেখতে পান স্থানীয়রা। তাঁদের থেকে খবর পেয়ে ঝালদা বনদফতর এবং খামার–পান্দ্রি যৌথ বন কমিটির সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে রাত ১১ টা নাগাদ।
আবার আজ ২৯ শে মার্চ ঐ এলাকায় আগুন লেগেছে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ঝালদা বন কর্মীরা ও বন কমিটি। ঝালদা বনদফতর ও বন কমিটির যৌথ উদ্যোগে ফায়ার ব্লুয়ার মেশিনের সাহায্যে আগুন নেভানো চেষ্টা চলে।

তবে কী কারণে আগুন লাগছে তা জানা যায়নি। বনদফতরের আশা সন্ধ্যে নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। সেই ভাবেই জোরকদমে আগুন নেভানোর কাজ চলছে।
২৮ মার্চ বাঘমুন্ডি বনাঞ্চলের হেলিপ্যাড পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আগুন লাগে। গ্রামবাসী ও বনদফতরের কয়েকঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন লাগার কারণ জানা না গেলেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান পুরুলিয়া বনবিভাগের ডি এফ ও দেবাশীষ শর্মা। তিনি বলেন, “আজ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামবাসীদের সচেতন করতে চলছে মাইকিং। বলা হচ্ছে জঙ্গলে বন্য জন্তু ও হাতি রয়েছে। জঙ্গলে প্রবেশ করবেন না বন্য পশুদের উত্যক্ত করবেন না। জঙ্গলে আগুন লাগাবেন না। আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।”

