অগ্নিমূল্য সব্জি বাজার অথচ ঝিঙে চাষ করে সরষেফুল দেখছে দামোদর তীরবর্তী মানাচরের চাষীরা

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৯ মে: ক্রমবর্ধমান নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শাক-সব্জির দাম। অগ্নিমূল্যের বাজারে পকেটে টান মধ্যবিত্তের অথচ মাথায় হাত চাষীদের। কারণ ফঁড়েরাজ। তাই ঝিঙে চাষ করে চোখে সরষেফুল দেখছে দামোদর তীরবর্তী মানাচরেরর চাষীরা। সরকারি মূল্যে কিষানমান্ডীতে সব্জি বিক্রির দাবিতে সরব চাষীরা।

করোনা আবহের জেরে টানা দুবছর লকডাউন। লকডাউনে বেড়েছে বেকারত্ব। স্বনির্ভরতার ফিরিস্তিতে উৎসাহ বাড়ছে গ্রামীন এলাকায়। ঝোঁক বাড়ছে কৃষিকাজে। কিন্তু সব্জি চাষ করে মাথায় হাত পড়েছে দামোদর তীরবর্তী বুদবুদ, কাঁকসা, সোনামুখী, বড়জোড়ার মানাচরের চাষীদের। বিস্তীর্ন ওই মানাচরে প্রায় ২ হাজার হেক্টরেরও বেশী জমিতে সব্জি চাষ হয়। গত কয়েকমাস ধরে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি। বাজার করতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা লাগছে আম জনতার। অগ্নিমূল্যবাজারে নাভিশ্বাস দশা মধ্যবিত্তের। শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর, পানাগড়, বুদবুদ, অন্ডাল বাজারে আকাশছোঁয়া শাক-সব্জি। ঝিঙে কেজি প্রতি ৪০-৪৫ টাকা, করলা কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা, টমেটো কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা, পটল কেজি প্রতি ৫০-৬০ টাকা, কুমড়ো-কেজি প্রতি-২৫–৩০ টাকা, লাউ ২৫- ৩০ টাকা পিস।

বাজারের দাম আগুন হলেও চাষীরা লোকসানে জর্জরিত। দাম পাচ্ছে না বলে অভিযোগ। মুনাফার আশায় ঝিঙে, পটল, করলা চাষ করেছিল সোনামুখির মানাচরের উত্তর বেশিয়া, নবাসন, লালবাবা মানা, কসবা মানা এলাকার চাষীরা। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু সব্জি বিক্রি করতে তাদের ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে পানাগড়, বুদবুদ কিম্বা ৪০ কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুরে যেতে হয়। সেটা চাষীদের কাছে ব্যায়বহুল। তাই বাধ্যে হয়ে স্থানীয় আড়তদার কিম্বা দালালদের দিতে হয়। তার ফলে মুনাফা দূর অস্ত চাষের খরচও উঠছে না।

কসবা, মানা এলাকায় ৮ টি আড়ত রয়েছে। আবার নদীর অপর প্রান্তে সোনামুখীর রাধামোহন পুরে ১০ টি, নিত্যানন্দপুর ২০ টি আড়ত রয়েছে। দিনভর চাষীরা ফসল তুলে বিকালে তাদের কাছে বিক্রি করতে যায়। সেখানে নিলাম হয়। তাতে যেরকম ডাক ওঠে সেইদামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় চাষীরা। গত একসপ্তাহ ধরে ওইসমস্ত আড়ত বা ফড়েদের কাছে চাষীদের ফসলের দাম তলানিতে। লোকসানে জর্জিরিত চাষীরা জানান, “এবছর ঝিঙে, করলার ভালো ফলন হয়েছে। লাভের আশা দেখেছিলাম। বিঘা প্রতি ২৫-২৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিঘা প্রতি ২-৩ দিন অন্তর ৫০-৬০ কেজি ঝিঙে উঠছে। বিঘা প্রতি করল উঠছে ৪০-৪৫ কেজি। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ, তাই শহর বিক্রি করতে যাওয়া কঠিন। ফলে আড়তে দিতে হয়। কিন্তু, সেখানে যে দাম, তাতে চোখে সরষে ফুল দেখছি। ১-২ টাকা কেজি ঝিঙে। করলা ৫-৬ টাকা কেজি। পটল ৭-৯ টাকা কেজি। কুমড়ো ৫-৬ টাকা কেজি।”

চাষীরা আরও জানান, ” ইতিমধ্যে ঝিঙে ৫০ পয়সা কেজি করার হুমকি দিয়েছে। এরকম দামে মুনাফা দূর অস্ত, উল্টে লোকসানের বহর বাড়ছে। পারিশ্রমিক উঠছে না।” 

আর প্রশ্ন এখানে, বাজার যখন অগ্নিমূল্য, ফঁড়েদের তখন স্বৈরাচারী রাজ। রাজ্য সরকার মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নির্ধারিত দাম বেঁধে দিয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে বেশ কিছু বাজারে অভিযানও হয়। কিন্তু, তাতেও সুরাহা হয়নি। মাঝপথে নিজেদের মত মুনাফা লুটছে ফঁড়েরা। এক কথায় বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ ফঁড়েদের হাতে। চাষীদের অভিযোগ, রাজ্যে পরিবর্তনের সরকার আসার পর ব্লকে ব্লকে কিষানমান্ডি হয়েছে। তাতে আশার আলো দেখেছিলাম। কিন্তু, বেশীরভাগ কিষানমান্ডীতে ধান কেনা ছাড়া আর কিছুই হয় না।”

প্রশ্ন উঠেছে রাজ্যের কিষানমান্ডিরগুলির ভুমিকায়। দামেদর তীরবর্তী কসবা মানাচরের চাষীদের দাবী, “কিষানমান্ডীতে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সব্জি ক্রয়-বিক্রিয়ের ব্যাবস্থা করুক সরকার। তার সঙ্গে স্থানীয় আড়তগুলোর বৈধতা নিয়ে অভিযান করুক সরকার। তাতে চাষীরা দাম যেমন পাবে, তেমনই বাজার নিয়ন্ত্রিত থাকবে।”

চাকতেঁতুল পঞ্চায়েত প্রধান অশোক ভট্টাচার্য জানান, “রনডিহা, চাকতেঁতুল দামোদর তীরবর্তী। নদীর ওপার থেকে বাঁকুড়ার চাষীরা নদী পেরিয়ে তাদের সদর বাজার বুদবুদ, পানাগড়ে সব্জি বিক্রি করতে আসে। তাই এই এলাকায় একটি হিমঘর করার চিন্তাভাবনা চলছে। তেমনই চাষীদের জন্য সরকারি মূল্যে পাইকারি বাজার করার বিষয়টি চিন্তাভাবনা চলছে।”  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *