বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরে এসে উচ্ছ্বসিত কৃষকরা

মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কল্যাণী, ১৫ অক্টোবর:
খনার বচনে আছে – ‘আম লাগাই জাম লাগাই কাঁঠাল সারি সারি/বারো মাসে বারো ফল নাচে জড়াজড়ি।’ আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, লিচু, কলা’র পাশাপাশি ড্রাগন, সবেদা, মুসম্বি প্রভৃতির মিশ্রবাগান বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলের উত্তরোত্তর চাহিদার কথায় মাথায় রেখে অনেক মানুষ ফল চাষে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু নার্সারি থেকে উন্নত প্রজাতির চারা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। উন্নত মানের চারা না দিয়ে দোকানীরা চাষীদের অনেক সময় ঠকাচ্ছেন। বহুবছর পর তা বুঝতে পেরে তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, কারণ তখন আর বাগিচা সংশোধন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক বছর গড়িয়ে গেছে। এর বিপরীতে ফলচাষীদের আস্থার জায়গা হয়েছে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

সঠিক ও উন্নত প্রজাতির চারাগাছ কৃষকরা নিজেরাই যাতে তৈরি করে নিতে পারেন এবং ফলন বৃদ্ধি করে আয় বাড়াতে পারেন, তার জন্য বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সর্ব ভারতীয় সমন্বিত ফল গবেষণা কেন্দ্র’ (ICAR-AICRP on Fruits)-এর পক্ষ থেকে দু’দিনের (১৪ ও ১৫ই নভেম্বর,২২) একটি প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। এই শিবিরে উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, নদিয়া প্রভৃতি জেলা থেকে ৩৯ জন কৃষক এসেছিলেন। শিবিরে প্রশিক্ষণ দেন প্রফেসর দিলীপ কুমার মিশ্র, প্রফেসর কল্যাণ চক্রবর্তী ও ড. অনামিকা কর।

দু’দিনের এই শিবিরে প্রথমদিন বিভিন্ন প্রকারের ফলের চারা থেকে কীভাবে গাছ তৈরি করা যায় সে বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। কীভাবে ফলের নার্সারী পরিচর্যা করতে হবে, কীভাবে গাছের কায়াদান ও ডালপালা ছাঁটাই করতে হবে, মাশরুম চাষই বা কীভাবে করা যায় ইত্যাদি। আম, পেয়ারা, লিচু, কাঁঠাল, সবেদা প্রভৃতি ফলের গাছ থেকে কীভাবে কলমের সাহায্যে চারাগাছ তৈরি করা যায় তা হাতে-কলমে শেখান প্রফেসর মিশ্রের নেতৃত্বে গবেষক ও ছাত্ররা। যোগ্য সঙ্গত ছিল মাঠের কর্মীদেরও। কাটা-কলম, জোর-কলম, গুটি-কলম দেওয়া শেখান তারা। কলম করলে সাধারণত ২৫-৩৫ দিনের মধ্যে নতুন শেকড় বেরিয়ে আসে বা জোড়বাঁধে। তখন তা আলাদা করে নতুন চারাগাছ তৈরি করা যায়।

কৃষি কীটতত্ত্ববিদ ড. অনামিকা কর ফল গাছের বিভিন্ন পোকার আক্রমণ ও তা থেকে প্রতিকারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। পোকাগুলি চিনিয়ে দেন, আক্রমণ কীভাবে শুরু হয়, তাও বিস্তারিত জানান। আলোচনায় বহু প্রশ্নের উত্তর দেন ড. কর।

দ্বিতীয় দিন কৃষকদের সঙ্গে কার্যকরী আলোচনায় নেতৃত্ব দেন ড. কল্যাণ চক্রবর্তী। কৃষকদের আশা প্রত্যাশা, তাদের নানান সমস্যা বিজ্ঞানীদের কাছে তুলে ধরবার আবহ তৈরি করে দেন তিনি। বিজ্ঞানীরা তারই উপর ভিত্তি করে সমাধানের পথ বাতলে দেবার চেষ্টা করেন। এইভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজকের ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যায় অধ্যাপক চক্রবর্তীকে। গোটা কার্যক্রমের রূপ নির্মাণ করতে দেখা যায় তাঁকে।

দ্বিতীয় দিনে উপস্থিত ছিলেন গবেষণা অধিকর্তা অধ্যাপক গোরাচাঁদ হাজরা। তিনি ফল চাষের গুরুত্ব ও তার শ্রীবৃদ্ধি কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন। পাশাপাশি ফল চাষ করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক হাজরার আলোচনা খুবই মর্মস্পশী হয়ে ওঠে। সারাদিন তিনি কৃষকদের সঙ্গেই ছিলেন।

দু’দিনের এই শিবিরের গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প আধিকারিক ড. দিলীপ কুমার মিশ্র জানান, “দেশের যুব সমাজ আজ চাকরির পেছনে ছুটছে। কিন্তু সবাই চাকরি পাবে না। সেক্ষেত্রে ফল চাষ বা নার্সারি তৈরি করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। যুবক-যুবতীরা উন্নত প্রজাতির চারাগাছ লাগিয়ে ফল বাগান করে যাতে প্রচুর মুনাফা করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এই প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। কৃষককে স্বাবলম্বী করাই আত্মনির্ভরশীল ভারত গঠনের অন্যতম বড় পদক্ষেপ।”

দু’দিনের এই শিবির শেষে প্রত্যেক কৃষকের হাতে আম, কলা, পেয়ারা, লিচু, সবেদা, মৌসম্বী লেবু, ড্রাগন,আঁশফল প্রভৃতি ৬-৭ প্রকারের চারাগাছ তুলে দেওয়া হয়। সেইসাথে প্রত্যককে একটি করে কোদাল, কৃষি পুস্তিকা, ব্যাগ ও ব্যাগের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের জৈব সার দেওয়া হয়। এছাড়া আগত চাষিদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

এই শিবিরে প্রশিক্ষণ নিতে আসা চাষিদের বিভিন্ন প্রকারের Minor fruits (আঁশফল, হরিতকী, বহেড়া, গোলাপ জামুন, কৎবেল, কামরাঙা, চেড়ী) সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেন এই ফল গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক-গবেষিকারা। এরা হলেন কুণাল সাহা, মৌমিতা পান্ডা, তৃষিতা ভুঁইয়া, রোহন দাস, রুকসার পারভিন, তন্ময় মন্ডল । এছাড়াও শিবিরে বিশেষভাবে উপস্থিত ছিলেন ড. ফটিক কুমার বাউরি, ড. সঞ্জিত দেবনাথ, কুনাল সাহা, তরুন বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *