পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ১১ আগস্ট: মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিশ্বাসভঙ্গ তৃণমূলের। পঞ্চায়েতের প্রধান নির্বাচনের পর তৃণমূলের বিরুদ্ধে এমনই মারাত্মক অভিযোগ তুলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন দন্ডি কান্ডের নির্যাতিতা শিউলি মার্ডি।
তার অভিযোগ, তৃণমূল শুধু বিশ্বাসভঙ্গই করেনি, আশা-ভরসা সব ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। একই অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন অনান্য নির্যাতিতা মহিলারাও। ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছেন নির্যাতিতাদের পরিবার সহ গোটা চকবলরাম গ্রামের বাসিন্দারাও। তাদের অভিযোগ, আদিবাসী সমাজের ভরসা ও বিশ্বাস নিয়ে ছেলেখেলা করেছে তৃণমূল। শুক্রবার শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দন্ডি কান্ডের নির্যাতিতাদের এমন মারাত্মক মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো আলোড়ন ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাজুড়ে। যা নিয়েই ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে এসেছে বলে তৃণমূলকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার পাশাপাশি তপন ব্লকের গোফানগর অঞ্চলেও প্রধান নির্বাচিত করে তৃণমূল কংগ্রেস। প্রায় ৭০ শতাংশ আদিবাসী অধ্যুষিত ওই অঞ্চলে এবারে প্রধান নির্বাচিত হন আর্জিনা বিবি। যে নাম ঘোষণার পর থেকেই কার্যত ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে আদিবাসী অধ্যুষিত চকবলরাম গ্রাম। যে গ্রামের আদিবাসী মহিলা তথা দণ্ডি কান্ডের অন্যতম নির্যাতিতা শিউলি মার্ডিকে ঘিরেই প্রধানের স্বপ্ন দেখেছিল গোটা আদিবাসী সমাজ। যে স্বপ্ন ভেঙে যেতেই ক্ষোভে ফুঁসতে শুরু করেছে গোটা চকবলরাম গ্রাম।
তাদের অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন নিয়ে শিউলি ও তার পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছিল শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। যা নিয়ে আশা ও ভরসায় বুক বেঁধেছিল গোটা আদিবাসী গ্রাম। তারা ভেবেছিলেন, দণ্ডি কান্ডের নির্যাতিতা শিউলি মার্ডিকে পঞ্চায়েত প্রধান করে হয়তো ওই ঘটনার প্রায়শ্চিত্ত করবে তৃণমূল। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন শিউলি। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে শাসক দল এমন মারাত্মক অভিযোগও তুলেছেন নির্যাতিতা ওই মহিলা ও তার পরিবারের লোকেরা। একই অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন চকবলরাম গ্রামের অনান্য নির্যাতিতা আদিবাসী মহিলারাও। তাদের অভিযোগ, তৃণমূলের প্রতি আদিবাসীদের আশা-ভরসা ও বিশ্বাস সব ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে এই ঘটনা।

প্রসঙ্গত, বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় তপনের চকবলরাম গ্রামের তিন আদিবাসী মহিলাকে প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা দণ্ডি কাটাবার অভিযোগ উঠেছিল প্রাক্তন মন্ত্রী শঙ্কর চক্রবর্তীর পুত্রবধূ তথা তৃণমূলের মহিলা নেত্রী প্রদীপ্তা চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। যে ছবি ভাইরাল হতেই শুধুমাত্র রাজ্য রাজনীতি নয়, গোটা দেশ তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। আদিবাসী মহিলাদের সাথে এমন নিকৃষ্টতম আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে একাধিকবার ধর্মঘটের ডাক দিয়ে কার্যত রাজ্যকে অচল করেও দিয়েছিল আদিবাসীরা। যে সবের চাপে পড়ে দলীয় পদ ও ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রদীপ্তা চক্রবর্তীকে।
শুধু তাই নয়, একাধিক হেভিওয়েট নেতৃত্বরা চকবলরাম গ্রামে ছুটে গিয়ে নির্যাতিতাদের সাথে কথা বলে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টাও করেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, নব জোয়ার কর্মসূচি নিয়ে খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সে এলাকায় গিয়ে চা খাইয়ে নির্যাতিতা আদিবাসী মহিলাদের সাথে কথা বলে আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু এসবের পরে এদিন নির্যাতিতা মহিলাদের এমন প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগড়ানোর ঘটনা কার্যত অস্বস্তিতে ফেলেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে। যা নিয়ে তৃণমূলকে কটাক্ষ করতে পিছপা হননি বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। তিনি এই ঘটনাকে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে বলেই ব্যাখা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আদিবাসী সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন যে তৃণমূল কোনভাবেই চায় না এই ঘটনা তাকেই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যদিও এসব যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূলের দাবি, প্রধান গঠন কারো একক সিদ্ধান্ত নয়। দলের সিদ্ধান্তেই ওই পঞ্চায়েতের প্রধান হয়েছেন আর্জিনা বিবি।

নির্যাতিতা শিউলি মার্ডি বলেন, প্রধান করবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু তারপরেও তাকে প্রধান করা হয়নি। তৃণমূলের উপর তারা আশা, ভরসা ও বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু সব ভেঙে দিয়েছে।
অপর নির্যাতিতা মার্টিনা কিস্কু বলেন, শিউলির প্রধান হওয়া নিয়েই তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন তাদের সাথে যে অন্যায় হয়েছে এই ঘটনা হয়তো কিছুটা শান্তি দেবে। কিন্তু এই বিশ্বাসভঙ্গ তাদের যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্যাতিতার স্বামী রাজেন মুর্মু বলেন, তাদের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করা হয়েছে।
গ্রামবাসী জয়নাল মার্ডি বলেন, তারা ভেবেছিলেন শিউলিকে প্রধান করে হয়তো দণ্ডিকান্ডের প্রায়শ্চিত্ত করবে তৃণমূল। কিন্তু তা হয়নি।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, দেশের রাষ্ট্রপতির পদে একজন আদিবাসী মহিলাকে বসিয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছে আদিবাসীদের প্রতি তাদের মনোভাব। উলটো দিকে দণ্ডি কান্ডের নির্যাতিতাদের সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করে তৃণমূল বুঝিয়ে দিয়েছে আদিবাসীদের প্রতি তাদের মনোভাব।
তৃণমূলের রাজ্য নেত্রী অর্পিতা ঘোষ বলেন, দলকে মান্যতা দিতেই হবে। প্রধান গঠন কারো একক সিদ্ধান্ত নয়, এটি দলগত সিদ্ধান্ত। শিউলিকে দলে আরো সময় দিতে হবে, আরো অপেক্ষা করতে হবে এর জন্য।

