কাঁকসার শিবপুরে দেখা মিলল বিলুপ্তপ্রায় পতঙ্গভুক ‘সূর্যশিশির’

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৭ ফেব্রুয়ারি:
প্রাণীরা উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উদ্ভিদও প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে! অনেকে এটাকে অস্বাভাবিক মনে করবে। প্রাণীখেকো উদ্ভিদ? এমন এক বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ সূর্যশিশিরের দেখা মিলল পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসায়। লুপ্তপ্রায় ওই উদ্ভিদের দেখা মিলতেই উৎসাহি উদ্ভিদবিদ্যার পড়ুয়াদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। সংরক্ষণের দাবি তুলেছেন তারা। 
কাঁকসা ব্লকের বিদবিহার অঞ্চলের শিবপুর। সেখানের কিছু ডাঙ্গাজমিতে লুপ্তপ্রায় পতঙ্গভুক উদ্ভিদ সূর্যশিশির অজস্র পরিমানে দেখা গেছে। সূর্যশিশির কি? কিভাবে পতঙ্গ খায়?

প্রসঙ্গত, ছোটোবেলায় জীবনবিজ্ঞান বইয়ে বহু উদ্ভিদের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি। তার মধ্যে পতঙ্গভুক উদ্ভিদের প্রতি বেশ কৌতুহল থাকত। সূর্যশিশির উদ্ভিদ এক প্রকার মাংসাশী উদ্ভিদ। ইংরাজিতে Sundews বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Drosera Rotundifolia যাকে বাংলায় বলা হয় ‘সূর্য শিশির’। মাংসাশী উদ্ভিদের মধ্যে এটি অনেক প্রজাতির হয়। শিবপুরে পাওয়া সূর্যশিশির গুলি ১ থেকে ৩ ইঞ্চি চওড়া। ঘাসের সঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে। কর্দমাক্ত ও স্যাঁতস্যাতে মাটিতে হয়। এই উদ্ভিদের গোলাকার ফুলের পাপড়িগুলি লাল বর্ণের৷ পাপড়ির মধ্যে অসংখ্য সরু সরু শুঁড় রয়েছে। ৪-৫ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট গোলাকার লাল বর্ণের। চারদিকে পিন আকৃতির কাঁটা রয়েছে। পাতাগুলো থেকে এক প্রকার এনজাইম (আঠা) নিঃসৃত হয়। সুগন্ধ আর উজ্বলতায় আকৃষ্ট হয়ে পোকা বা পতঙ্গ উদ্ভিদটিতে পড়লে এনজাইমে বা আঠার মাঝে আটকে যায় এবং পতঙ্গ নড়াচড়া করলে মাংসল পাতার চারদিকে পিনগুলো বেঁকে পোকার শরীরে ফুঁড়ে যায়। এভাবেই এই উদ্ভিদটি পোকা বা পতঙ্গকে খায়।

মূলত, এই উদ্ভিদ থেকে স্বচ্ছ আঠালো তরল পদার্থ নিঃসরন হয়ে পাতায় মজুত থাকে শিকার করার জন্য। পাতার ওপরে থাকা তরল সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ও সুগন্ধি ছড়ায়। ছোটো ছোটো কীটপতঙ্গ তরল পদার্থ খাবার জন্য আকৃষ্ট হতেই ওই উদ্ভিদের ফাঁদে পড়ে। পাতার ওপরে থাকা পিন বা শুঁড়গুলি কীটপতঙ্গ’কে  আঁকড়ে ধরে। আঠালো তরলে আটকে যায় কীটপতঙ্গ। ওই কীটপতঙ্গের শরীরের রস শোষণ করে সূর্যশিশির।

শিবপুরের বাসিন্দা গঙ্গা লোহার বলেন, “গ্রামের চাষের জমির পাশে একটি পরিত্যক্ত প্রায় ১ বিঘা ডাঙ্গা জমিতে নজরে পড়ে কয়েক লক্ষ লাল রঙের উজ্জ্বল ফুল ছড়িয়ে রয়েছে। কি ফুল কোথা থেকে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে কৌতুহল সৃষ্টি হয় গ্রামবাসীর মধ্যে। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, সেগুলি সূর্যশিশির পতঙ্গভুক উদ্ভিদ।”

পতঙ্গভুক উদ্ভিদের খবর চাউর হতেই গ্রামে কৌতুহলী মানুষ ভিড় করতে শুরু করেছে। গ্রামবাসীরা পড়ুয়াদের স্বার্থে সংরক্ষণের দাবি তুলেছে। গ্রামবাসীরা জানান, “ছোটো, ছোটো পড়ুয়ারা এই উদ্ভিদটি সম্পর্কে জানতে ও দেখতে ব্যাপক কৌতুহলী। এই এলাকায় এসে হাতেকলমে ক্লাস করানো যেতে পারে।”

বিদবিহার পঞ্চায়েতের সদস্য গিরীধারি সিনহা বলেন, “বিষয়টি জানতে পেরে ওই পতঙ্গভুক উদ্ভিদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশে প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথে এই পতঙ্গভুক উদ্ভিদ সূর্যশিশির। এই বছর আমাদের এলাকায় একটি পরিত্যাক্ত জমিতে লক্ষ লক্ষ সূর্যশিশিরের দেখা মিলেছে। এই উদ্ভিদ বিগত দিনেও হয়তো ছিল। সংখ্যায় কম থাকায় সেটা হয়তো নজরে পড়েনি। চাষের জমিতে রাসায়নিক সার ব্যাবহার করায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও কীটনাশক ব্যবহারে কীটপতঙ্গও কমে গিয়েছে। কীটপতঙ্গ খেয়ে ওই উদ্ভিদ বেঁচে থাকে। অনুকুল পরিবেশের অভাবে আজ লুপ্তপ্রায়। আবহাওয়ার পরিবর্তনে আবারও হয়তো নতুন করে এধরনের উদ্ভিদ বেরিয়ে আসছে।”

বুদবুদ কেন্দ্রীয় কৃষি বিজ্ঞান ও গবেষণাগারের সাবজেক্ট মেটার স্পেশালিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ সুব্রত সরকার বলেন, “ওই উদ্ভিদের কতটা গুণগত উপকারিতা আছে বা না আছে সেটা গবেষণার বিষয়। তবে পড়ুয়ারা হাতে কলমে এটি দেখতে পারবে।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *