“সঠিক অপরাধীর ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার”

লাগাতার নারী নির্যাতন নিয়ে হইচই হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন তথা লেখিকা-প্রযোজিকা-কাহিনীকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় অশোক সেনগুপ্ত।
***

আমাদের ভারত, ১৬ এপ্রিল: পশ্চিমবঙ্গে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিধানসভা ভবনে বৃহস্পতিবার রাজ্যপাল বলেছেন, “আমার কাছে রাজ্যের কোনও রিপোর্ট আসে না। অথচ মহিলাদের উপর অত্যাচার বাড়ছে“। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতির (এপিডিআর) সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত শূর রাজ্যপালের কাজের ধারার বিরোধিতা করলেও মনে করেন, “বাংলায় মহিলাদের উপর নির্যাতন বাড়ছে।“ সামাজিক মাধ্যমে রাজ্য মহিলা কমিশন সম্পর্কে নানা অভিযোগ উঠছে। এ রাজ্যের নারী নির্যাতন সম্পর্কে রাজ্য মহিলা কমিশন কী করছে? কী ভাবছে? কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

প্রশ্ন— কেন এত সমস্যা?

উত্তর— “কোথাও মনে হচ্ছে মানুষের ক্ষোভ বেড়ে গিয়েছে। পাল্লা দিয়ে ধৈর্য কমছে। এ ছাড়াও ক্ষমতা হাতে পাওয়া এবং ক্ষমতার লোভ হয়ত মানুষকে বল্গাহীন করে তুলেছে। এর সঙ্গে এ কথাও বলব যে এর জন্য কেবল প্রশাসন বা সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় তুলে লাভ নেই। বিশ্বায়নের গভীর প্রভাব,  সামাজিক মাধ্যমের খুল্লাম খুল্লা দুনিয়া— এগুলোও ছেলেমেয়েদের মাথা ঠিক রাখতে দিচ্ছে না। তার সঙ্গে সঠিক শিক্ষার অভাব।“

প্রশ্ন— সমাধানের পথ কী?

উত্তর— “এটা রাতারাতি বদল সম্ভব নয়। এমন নয় যে একদিনে পুরো ছবি বদলে যাবে। সঠিক অপরাধীর ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ হয়ত এরকম কাজ করার আগে দুবার ভাববে।“

কিন্তু রাজ্য মহিলা কমিশন কী করছে? তাদের তো একটা দায়িত্ব আছে?

উত্তর— “মহিলা কমিশন আত্মপ্রচার করে না। তাই সবার পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। কমিশনের প্রতিনিধিরা সম্ভাব্য প্রতিটা জায়গায় যায়। রাজ্যকে রিপোর্ট দেয়। নির্যাতিতার ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে সহায়তা করে। সারা বছর সচেতনতা-শিবির চালায়। নিজে থেকে (সুয়ো মোটো) পুলিশের কাছে রিপোর্ট জানতে চায়। সেই রিপোর্টে অভিযোগকারী সন্তুষ্ট না হলে কমিশন মধ্যস্থতা করে। অনেক সময় পুনরায় তদন্ত হয়।অভিযোগকারী আর পুলিশ অফিসারকে মুখোমুখি বসিয়ে এভাবে সুরাহা পাওয়ার ব্যবস্থা আগে কখনও হয়েছে বলে জানা নেই। এছাড়া শুধুমাত্র একটা ফোন কলে এই কমিশনকে যে কোনও সময়ে অভিযোগ জানানো যায়। এটাও নতুন।

প্রশ্ন— এগুলো তো শুনতে ভাল লাগে! বাস্তবে কি তাই হয়? শ্যামবাজার এলাকায় এক অসহায় বৃদ্ধার সম্পত্তি দখলের ব্যাপারে সম্প্রতি রাজনীতির অভিযোগ উঠেছে। আপনার দু’জন পরিচিত কমিশনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কোনও লাভ হয়নি। মানুষ কিভাবে ভরসা করবে কমিশনের ওপর?

উত্তর— “আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমরা বিষয়টা নিয়ে খোঁজ করে চেষ্টা করেছিলাম। প্রথম দুদিন আমরা অভিযোগকারীকে ফোনে পাইনি। ফোন ধরেন নি। তৃতীয়বার চেষ্টার পর ফোনে কথা বলে থানায় জানাই। থানা বলে কোনও এফআইআর আসেনি। তারপর আবার অভিযোগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে থানার হস্তক্ষেপ হয়। বিষয়টা আদালতে গিয়েছে। এক্ষেত্রে আমরা ঢুকতে পারিনা। তবে, আদালতের নির্দেশও মানছে না, সেটা পুলিশকে আবার বলছি। আমাদের পক্ষে যতটা সুযোগ ছিল করেছি।

প্রশ্ন— অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মহিলা কমিশনের কর্ত্রী হিসাবে কোথায় কোথায় গিয়েছেন?

উত্তর— “পাঁচ বছরে অনেক জায়গায় গিয়েছি। সম্প্রতি বালুরঘাট, মালদা, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, মাল, শিলিগুড়ি, নরেন্দ্রপুর, বগটুই, মেদিনীপুর ঘুরে এসেছি। মারাত্মক সব ঘটনা। তাই নিজেই যাওয়ার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন— এই সার্বিক পরিস্থিতির জন্য সামাজিক পরিকাঠামো বা চালচিত্রের বদলকে কতটা দায়ী করেন?

উত্তর— “ভীষণভাবে দায়ী। কিছু অযোগ্য লোক হঠাৎ করে ক্ষমতা পেয়ে গিয়েছে। অথবা ক্ষমতার সঙ্গে বাস করে এমন কিছু লোক ভাবছেন তাঁরা অপরাধ করলেও মাপ হয়ে যাবে। আগে পরিবার, এর পরে পাড়ার ছেলেমেয়েদের অভিভাবকের ভূমিকা নিতেন। এখন পরিবারগুলোর বাঁধন আলগা হয়ে গিয়েছে। যৌথ পরিবার প্রায় নেই। পাড়ার লোক কিছু বলতে গেলে পরিবার তা মেনে নেয়না। স্কুলেও শিক্ষক-শিক্ষিকারা অনেক সময় কিছু বলতে পারেন না।“

প্রশ্ন— বাম আমলের চেয়ে বা অন্য রাজ্যের কমিশনের তুলনায় কি এরাজ্যের বর্তমান কমিশন শ্রেয় বলে আদৌ মনে করেন? করলে কোন যুক্তিতে?

উত্তর— “আগে যাঁরা কমিশনের কাজ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই সততার সঙ্গে করেছেন। তবে, আগে মহিলা কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে এত সচেতনতা ছিল না। কারণ, তখন এত প্রচারমাধ্যম ছিল না। এখন মানুষ নিজের অধিকারের ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। সজাগ-সতর্ক হয়েছেন। এটাই বাঞ্ছনীয়। এখন অনেক বেশি অভিযোগ দায়ের হচ্ছে। মানে, মেয়েরা অনেক বেশি মুখ খুলছেন। সহযোগিতা পাচ্ছেন বলেই আসছেন!

প্রশ্ন— তাহলে যাঁরা মহিলা কমিশনের সমালোচনা করছেন, তাঁরা ভুল করছেন?

উত্তর— “আমরা ১৮ বছরের ওপরের মেয়েদের নিয়ে কাজ করি। এখানে আরও একটা কমিশন কাজ করে। শিশু অধিকার রক্ষা কমিশন। তারা ১৮ বছরের কম বয়সের মেয়েদের নিয়ে কাজ করে। তার মানে এই নয়, ১৮-অনূর্দ্ধ মেয়েদের কথা আমরা ভাবিনা। ভাবি এবং থাকি বলেই এত সফর করেছি। তবে, যেহেতু ১৮-অনূর্দ্ধদের জন্য পৃথক কমিশন আছে, তাদের কাজে আমাদের ঢোকা ঠিক নয়। অনেকে এটা সেভাবে জানেন না। তাই অভিযোগ করেন, মহিলা কমিশন মাথা ঘামাচ্ছে না। সবটা জেনে মন্তব্য করলে সুবিধা হয়। তাতে যাঁরা মহিলা কমিশনের সমালোচনা করছেন, তাঁদের অজ্ঞানতা প্রকাশ পায় না।“

প্রশ্ন— আপনি প্রসঙ্গক্রমে একাধিকবার মহিলা কমিশনের ওয়েবসাইট দেখার কথা বলছেন। কিন্তু এই ওয়েবসাইট আমজনতার কাছে কতটা পৌঁছোয় এবং কতটা আপডেটেড, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

উত্তর— আসলে আমি যখন পাঁচ বছর আগে কমিশনের দায়িত্ব নিই, ওয়েবসাইট অনেকটাই নিস্ক্রিয় ছিল। এখন কমিশনে কাজ বেড়ে মাসে প্রায় তিন হাজার অভিযোগ আসছে। সব তো নেওয়া যায়না। ওয়েবসাইট আপডেট করার কাজ চলছে।

প্রশ্ন—মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী তো নানা সময় রাজ্যে বাংলা ভাষায় সরকারি কাজ চালানোর কথা বলেছেন। কখনও কি মহিলা কমিশনের ওয়েবসাইট বাংলায় করার চেষ্টা আদৌ হয়েছে? মাতৃভাষার করার অসুবিধা কোথায়?

উত্তর— এই ওয়েবসাইট ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় করার পরিকল্পনা হয়েছিল। পাঁচটি অতিরিক্ত পদ তৈরি হয়েছিল। রূপায়ণে সময় লেগেছিল। তার পরেও বিশেষ কিছু কারণে বাংলা ওয়েবসাইট করা যায়নি। তবে বিষয়টা আমাদের মাথায় আছে।

প্রশ্ন— প্রায়শ অভিযোগ ওঠে রাজনৈতিক দলগুলো রাবার স্ট্যাম্প হিসাবে নিজের বশংবদ কাউকে কমিশন প্রধান করে। এ ব্যাপারে আপনার ধারণা কী?

উত্তর— “মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন হওয়ার জন্য কিন্তু কারও কাছে আমি ইচ্ছে প্রকাশ করিনি। ২০১৭-তে ছবি তৈরির কাজে গিয়েছিলাম বারাণসীতে। সেখানে একদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন— এইদায়িত্বটা নিতে হবে। আমি প্রথমে আমি রাজি হইনি। কারণ, আমার কাজের চাপ। কাজের জগৎও আলাদা। আমি মূলত যে কাজটা করি, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হাজার পাঁচ লোকের রুজি জড়িয়ে। যথেষ্ঠ নিষ্ঠা এবং সময় লাগে। এ ছাড়া, প্রশাসন-আইন-সংবিধানের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাও আমার নেই। কিন্তু উনি বললেন, তুমি না কোরোনা। খুব ভয় নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম।“

প্রশ্ন—সময়বিশেষে কমিশনের কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। আপনার প্রতিক্রিয়া?

উত্তর— গত পাঁচ বছরে এই দায়িত্বে আসার পর একটি ক্ষেত্রেও আমাকে সমঝোতা করতে হয়নি। কেউ আমাকে কখনও কিছু করার বা না করার নির্দেশও দেননি।

প্রশ্ন— আপনার দায়িত্বের চলতি পর্যায়ের প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। কী মনে হয়েছে?

উত্তর— “এই বাংলার নারীজগতের অন্য রূপ রয়েছে। কত চাপ সহ্য করে কত লড়াকু মহিলা মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, খুব কাছ থেকে তা অনুভব করার অবকাশ পেয়েছি। আজ আমি ভাবি, এই দায়িত্বটা না পেলে মেয়েদের জীবনের একটা অধ্যায় অনুভবের সুযোগ আমি পেতাম না।”

***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *