বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ, সরকারের ওপরেই দায় চাপাতে চান পরিবেশকর্মী

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৬ মে: ফের পূর্ব মেদিনীপুরে বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে অনেকে হতাহত হওয়ায় রাজ্য সরকারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন পরিবেশ ও সমাজকর্মী বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়।
মঙ্গলবার তিনি বলেন, নৈঃশব্দের অধিকার ও বাজি কারখানায় লাগাম রাখতে আমরা বারবার সরকারের বিভিন্ন স্তরে লিখিত আবেদন করেছি। কার্যকরী কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কয়েক মাসের ব্যবধানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মঙ্গলবার দুপুরে কেঁপে উঠল পূর্ব মেদিনীপুরের এগরার খাদিকুল গ্রাম। বিস্ফোরণের তীব্রতায় অনেকের হতাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ২০ মার্চ দক্ষিণ ২৪ পরগণার মহেশতলায় অবস্থিত একটি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ৩ জন মারা যান। এর পর ২৭ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবেশ দফতরের প্রাক্তন আধিকারিক এবং চন্দননগর পরিবেশ আকাদেমীর সভাপতি বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখিতভাবে জানান, “এই ধরনের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে নতুন কোনও ঘটনা নয়। ১৯৮০-র দশকে চন্দননগরের অন্তর্গত পাদ্রীপাড়া অঞ্চলে এমনই বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে একবার ১১ জন এবং দ্বিতীয়বার ৬ জন নিহত হন। হাওড়া জেলার বাগনানে অবস্থিত হাটুরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে বাজি কারখানার বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন মারা যান। ১৯৯৬ সালে কলকাতা হাইকোর্ট নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেবার আদেশ জারি করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ হতভাগ্য পরিবারগুলি টাকা পেয়েছিল বলে আমাদের জানা নেই।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আমাদের কাছে বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে যে মৃত্যুমিছিলের হিসাব রয়েছে তা অত্যন্ত আতঙ্কজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। মৃত্যুমিছিলের বিবরণ যথাক্রমে-
১) ২০০৯- কালনা – মৃত ৮ জন,
২) ২০১০ – ধনেখালি – মৃত ৬ জন,
৩) ২০১১ – কোলাঘাট – মৃত ৩ জন,
৪) ২০১৩- কালনা – মৃত ২ জন,
৫) ২০১৩- পাঁশকুড়া -মৃত ৩ জন,
৬) ২০১৩- বেগমপুর -মৃত ৪ জন,
৭) ২০১৪- ময়না- মৃত ৩ জন,
৮) ২০১৫- পিংলা- মৃত ১২ জন,
৯) ২০১৬- বজবজ- মৃত ২ জন,
১০) ২০১৬- নীলগঞ্জ- মৃত ১ জন,
১১) ২০১৭- চম্পাহাটি-মৃত ১ জন,
১২) ২০১৭- আমডাঙা- মৃত ৫ জন,
১৩) ২০১৮- হালিশহর- মৃত ৩,
১৪) ২০১৮- হালিশহর- মৃত ৩,
১৫) ২০১৯- কাঁথি- মৃত ২,
১৬) ২০১৯- মহেশতলা- মৃত ২,
১৭) ২০১৯- কেশপুর- মৃত ১,
১৮) ২০২০- নৈহাটি- মৃত ৫,
১৯) ২০২১- নোদাখালি- মৃত ৩,
২০) ২০২৩- মহেশতলা- মৃত ৩।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, এই সমস্ত ঘটনাতে আরও অসংখ্য মানুষ আহত হন।“

এই তালিকা দাখিল করে বিশ্বজিৎবাবু মুখ্যমন্ত্রীকে লেখেন, “যে তালিকা দেওয়া হলো তার থেকে অনেক বেশি লোক মারা গেছেন বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, কারণ বিস্ফোরণের পরেই বহু মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ।

পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল ১৬ অক্টোবর, ২০১৫ তারিখে রাজ্য সরকারকে বেআইনি বাজি কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ জারি করলেও তা কার্যকরী হয়নি। উপরিউক্ত ঘটনাপ্রবাহই তার প্রমাণ বহন করে। এমতাবস্থায় আমাদের বিনীত আবেদন,
(ক) অবিলম্বে সমস্ত বেআইনি বাজি কারখানা হোক,
(খ) আইন মেনে শ্রমিকদের সুরক্ষার বন্দোবস্ত করে বাজি কারখানার অনুমতি দেওয়া হোক,
(গ) ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন।“

এই প্রতিবেদককে মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্বজিৎবাবু জানান, “পশ্চিমবঙ্গের বুকে বহু বেআইনি বাজি কারখানা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। বারবার আবেদন নিবেদন করা সত্বেও এই বেআইনি কারখানাগুলি কাজ করে চলেছে। জানা গেছে, এই ধরনের কারখানায় বেআইনি বোমা ইত্যাদিও তৈরি করা হয়। এইসব কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে কেবলমাত্র এই রাজ্যেই প্রায় ৭৫ জনের মতো মানুষ মারা গেছেন। গত ১১ অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুরের এমনই একটি বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের ফলে একজনের মৃত্যু হয়। তাই মনে হয়, এই রাজ্যে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। রাজ্য সরকার যথাযথ, কঠোর ব্যবস্থা নিলে হয়ত এত প্রাণহানি এবং শব্দদূষণ এড়ানো যেত। যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও মূল্যে জারি রাখতে হবে নাগরিক আন্দোলন।

১৯৯৬ -র এপ্রিলে মাননীয় বিচারপতি ভগবতীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঐতিহাসিক তথা গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। সেটিকে কার্যকরী করা আজ অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সকল স্তরের মানুষের দৃঢ় মানসিকতায় আগামী দিনে এই রায়কে কার্যকরী করতে হবে। শব্দদূষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ন্যায়ালয়ের একের পর এক রায় কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করে বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে এবং তার ফলস্বরূপ ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয় শব্দদূষণ সংক্রান্ত নতুন আইন। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯৭ থেকে আজ পর্যন্ত ১৪ জন শব্দ শহীদ হয়েছেন, যদিও মাত্র একটি ক্ষেত্র ছাড়া আর কোনও ক্ষেত্রেই দোষীরা কোনওরকম শাস্তিও পায়নি। দোষীদের দ্রুত শাস্তি ও শব্দশহীদদের ক্ষতিপুরণের জন্য হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা বিচারাধীন।“

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *