আমাদের ভারত, ব্যারাকপুর, ১৩ সেপ্টেম্বর: একমাত্র ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বৃদ্ধ বাবা মা রবিবার সকালে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। স্থানীয়দের তৎপরতায় জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হল দুজনকেই। রবিবার সকালে উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগরের ননা বাবার ঘাটে এই ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে বৃদ্ধ অসুস্থ ওই দম্পতির নাম বিশ্বনাথ দাস ও সবিত দাস। রবিবার সকালে তাঁরা গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে ছিলেন। বৃদ্ধ দম্পতিকে গঙ্গা থেকে উদ্ধারের পর তারা জানান, তাদের সংসারে বর্তমানে অবিবাহিত একমাত্র ছেলে বিপুল দাস তাদের উপর রোজই নির্মম অত্যাচার করে। রবিবার সেই অত্যাচার চরমে ওঠে। বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা বিশ্বনাথবাবু ও মা সবিতা দেবীকে রবিবার সকালে মেরে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেয় গুণধর বিপুল। নিজে কাঠের কাজ করলেও বৃদ্ধ দম্পতির থেকে টাকার চাহিদার শেষ নেই অত্যাচারী বিপুলের, তা নিয়েই নিত্যদিন বাবা, মা ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে অশান্তি চলছিল। বিশ্বনাথবাবু ও সবিতা দেবীর এক মেয়ে আছে। তাঁকে আগেই হুগলি জেলাতে বিয়ে দিয়েছেন তারা। মেয়েও খুব একটা বাপের বাড়ি আসে না অত্যাচারী দাদা বিপুলের ভয়ে। রবিবার যখন বিপুল তার মা বাবাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, তখন ওই বৃদ্ধ দম্পতি সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা নিজেদের শেষ করে দেবেন। তারপরই শ্যামনগর ননা বাবার ঘাটে গিয়ে তারা গঙ্গায় ঝাঁপ দেন।

ছবি: এই ঘাটেই ঝাঁপ দিয়েছিলেন অসহায় বাবা মা।
বেসরকারি জুট মিলের অবসর প্রাপ্ত শ্রমিক বিশ্বনাথবাবু। সামান্য পেনশন পান তিনি। বিশ্বনাথবাবুর ছেলে বিপুল দাস কাঠ মিস্ত্রির কাজ করেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ বিশ্বনাথবাবুর ছেলে বিপুল দাস প্রায়সই বাবা মাকে মারধর করে। রবিবার সকালেও তার অন্যথা হয়নি। এরপর বাবা মা ছেলের এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। গঙ্গার পারে থাকা লোকজন ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে গঙ্গায় নামতে দেখলে তাদের সন্দেহজনক মনে হয়। বৃদ্ধ দম্পতি গঙ্গায় ঝাঁপ দিলে গঙ্গার ঘাটে উপস্থিত স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ও গোটা বিষয়টি জানান। এরপর জগদ্দল থানায় খবর দেওয়া হয়।

ছবি: বৃদ্ধ বৃদ্ধার ডান পাশে তাঁদের ছেলে।
ওই দম্পতিকে পুলিশ শ্যামনগর পীরতলার বাড়িতে পৌঁছাতে গেলে পুলিশের কাছে ছেলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করতে মানা করেন অসহায় বাবা মা। এরপর পুলিশ বিশ্বনাথবাবুর বাড়িতে গিয়ে তার ছেলেকে বুঝিয়ে বাবা মাকে বাড়িতেই রেখে আসেন। পুলিশের তরফ থেকে বৃদ্ধ বাবা মা কে এবং প্রতিবেশীদেরকেও ফোন নম্বর দিয়ে আসেন তদন্তকারী পুলিশ অফিসার, যাতে ওই বৃদ্ধ দম্পতির কোনো সমস্যা হলে প্রতিবেশীরা সব ঘটনা পুলিশকে দ্রুত জানাতে পারেন।
জগদ্দল থানার পুলিশ বৃদ্ধ দম্পতিকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে আসলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ওই বৃদ্ধ দম্পতি। বৃদ্ধ বিশ্বনাথ বাবু বলেন, “আমার ছেলে আমাদের খুব মারধর করে, মারতে মারতে মাটিতে শুইয়ে দেয়। এই অত্যাচার কত সহ্য করা যায়? আজ সকালে ছেলে খেতে চাই ছিল। ওর মার খাবার দিতে একটু দেরি হচ্ছিল, ছেলে সেই অপরাধে আমাদের বেধড়ক মারধর করে। আর সহ্য না করতে পেরে আমরা গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে গেছিলাম। টাকার জন্য অত্যাচার তো করেই।”

ওই বৃদ্ধ দম্পতি তাদের এক মাত্র ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চাননি। জগদ্দল থানার পুলিশও বাবা মার এই আবেদন মেনে নিয়ে বিশ্বনাথবাবুর ছেলেকে গ্রেপ্তার করেনি। বাবা মাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কথা জগদ্দল থানার পুলিশের কাছে স্বীকার করে নেয় বিপুল দাস। সেই সঙ্গে বিপুল মুচলেকা দেয় যে আগামী দিনে সে আর তার বাবা মায়ের ওপর অত্যাচার করবে না।

