বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার হয়েও চাকরি পাননি বড়দি

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী

আমাদের ভারত, ৮ মার্চ: আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে বামজামানার ঘটনা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরে পরিচিত সাবজেক্টে টপার হয়েও স্কুলশিক্ষকের চাকরি জোটাতে পারেননি আমার বড়দি। বর্তমানে ফিজিক্সে পিএইচডি হয়েও চাকরি নেই তাঁর সন্তানের। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

বাম আমলে রাজনীতি না করলে স্কুলে চাকরি হত না। বাম আমলের প্রথমদিকে আজকের মতো এত বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। তারই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ডিগ্রিতে প্রথম স্থানাধিকারীর অন্তত একটি স্কুলে চাকরি পাওয়াটা আপাত কঠিন কাজ ছিল না। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সময় শাসক দলের কর্মী, পার্টি দরদীদের স্কুলে আকছার চাকরি জুটলেও আমার দিদি পাননি। তিনি কেবল মাস্টার ডিগ্রিধারী ছিলেন তাই নয়, বিএড-এও অত্যন্ত ভালো নম্বর ধরে রেখেছিলেন।

আমি তখন খুবই ছোটো, স্কুলে পড়ি, অনাথ আশ্রমে থাকি, বাবাকে অকালে হারিয়েছি। দিদি অনেক চেষ্টার পর আশা ছেড়ে দিলেন। আমি স্কুলের আশ্রমের গ্রন্থাগারে গিয়ে রোজ কাগজের ‘সিচুয়েশন ভ্যাকেন্ট’ কলামে স্কুলের চাকরির উপযুক্ত বিজ্ঞাপন খাতায় লিখে এনে, অনেক আনুষঙ্গিক কাজ নিজের হাতে সেরে কারও মাধ্যমে বাড়িতে দিদির কাছে পাঠাতাম, যাতে দিদি নিজে স্বাক্ষর করে উপযুক্ত জায়গায় আবেদন পাঠাতে পারেন। কারণ বহু চেষ্টার পর একটা সহজাত অনীহা ছিল। “কে হায়! হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।” অধিকাংশ সময় দিদি ইন্টারভিউ কল পেতেন না, কখনও ইন্টারভিউ হয়ে যাওয়ার পর চিঠি আসতো, আর ইন্টারভিউয়ে ডাক পেলেও চাকরি হত না। দিদিকে ছাপিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিরাই স্কুলে নিয়োগপত্র হাতে পেতেন। আমি বাচ্চা ছেলে, বহুবছর চেষ্টা করে আমিও শেষমেশ ব্যর্থ চেষ্টায় খামতি দিলাম।

কিন্তু কী আশ্চর্য, তাঁর সন্তান একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি হয়েও উপযুক্ত চাকরি পান না। ইদানীং দেখছি আমার বহু আত্মীয়স্বজন আমার পরিচিতিতে পরিচিত হলে, বিচার পাওয়ার সুযোগ কম। এই অভিজ্ঞতা হওয়ায় ইদানীং কাউকে আত্মীয় বলে আর পরিচয় দিই না, তাদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখি না। তাদের অনেকেই কিন্তু মেধায়, যোগ্যতায় অনেকের থেকে অনেক অনেক উপরে। অবিচারের সমাজে যতটুকু তারা টিকে রয়েছেন, আমার পরিচয়ে পরিচিত হলে, তাও পেতেন না। বেনোজলে আগামীদিনে কী হবে জানি না। বাংলায় এমন হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হন বছরের পর বছর, তার লেখাজোকা নেই, এসব নিয়ে কেউ কখনও গবেষণা করতে আসবেন না। তাদের সকলের জন্য আমার মন সর্বদা ব্যথিত থাকে। আর এরা কাঁদতেও ভুলে গেছেন। যোগ্যদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। তাই তো ভালো ছেলেমেয়েরা বাইরে চলে যাচ্ছেন। শ্রমিকেরাও পরিযায়ী হচ্ছেন। আহা বঙ্গদেশ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *