কৃষ্ণনগরে মৈত্র বাড়ির দুর্গা পুজো ১৭৩ বছরের প্রাচীন

স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ২৮ সেপ্টেম্বর: অবিভক্ত নদিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা মহকুমা ও চুয়াডাঙ্গা থানার গ্রাম নীলমণিগঞ্জ। এলাকার জমিদার নীলমণি মৈত্রের নাম অনুসারে এই গ্রামের নাম নীলমণিগঞ্জ। ১৭৩ বছর আগে জমিদার নীলমণি মৈত্রের আমলেই শুরু হয় এই পরিবারের দুর্গাপুজো।

ভারত সীমান্ত গেদে থেকে দূরত্ব মাত্র ১২ মাইল। তৎকালীন সময়ে গ্রামটিতে ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরই বাস। ব্রাহ্মণ পাড়া, ঘোষপাড়া, কুমোর পাড়া, কামারপাড়া, কলুপাড়া, কায়স্থপাড়া প্রভৃতি নানা পাড়াতে বিভক্ত ছিল। আশপাশের গ্রামগুলো মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা হলেও নীলমণিগঞ্জে মুসলিম ধর্মের মানুষ ছিল না বললেই চলে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা হওয়ার পর এই রেল স্টেশনের নাম মোমিনপুর রাখা হয়েছে। মৈত্র পরিবারের সদস্যরা দেশভাগের আগে থেকেই নানা কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করত। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের নদীয়া জেলার এই চুয়াডাঙ্গা মহকুমা পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান দুই অংশে অনেকে থেকে যায়। দেশভাগের সময় পর্যন্ত জমিদার অমূল্য মন্ত্র এই পুজোর দায়িত্ব পালন করেছেন। নীলমণিগঞ্জের সময় পর্যন্ত এখানে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়া হতো মাথাভাঙ্গা নদীতে। জোড়া নৌকায় দেবীকে ঘোরানো হতো নদীর পাড়ের নানা গ্রামে। বসত মেলা। এই মেলাকে বলা হত আড়ং। আগে নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া হতো বিসর্জনের সময়। এখন তা আর হয় না। ৬ এর দশকে এই পরিবারের শেষ অংশটুকু নীলমণিগঞ্জ ছেড়ে চলে আসে নদিয়া জেলার চাপড়া থানার ডাংনা গ্রামে। এখানে আসার পরও একই নিয়মে পূজা চলতে থাকে। তবে কমে যায় পাঁঠা বলির সংখ্যা।

প্রথমদিকে মৈত্র বাড়ির দেবী মূর্তি মাটির সাথে সজ্জিত হতো। বর্তমানে প্রতিমার সাজ হয় শাড়ি পরিহিতা শোলার। প্রতিমার দশ হাতের অস্ত্র পেতলের। এই পরিবারে দেবী দুর্গার নাম ‘উমা’। কৃষ্ণনগর থেকে মৃৎশিল্পীরা ডাংনায় গিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করে আসতো। পুজোর শেষে দেবী দুর্গাকে কাঁধে চাপিয়ে বাড়ির পেছন দিকে বয়ে যাওয়া পলদা বিলে নৌকায় তোলা হতো। তারপর বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরিয়ে বাড়ির পেছনের ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হতো। চলতো বাইচ নাচ। ডাংনা মুসলিম প্রধান গ্রাম হলেও এখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষই পুজোতে অংশগ্রহণ করত। ২০০০ সালে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ। জলের তলায় চলে যায় ডাংনা গ্রাম। অসম্ভব হয়ে ওঠে পুজো করা। সেই সময় কৃষ্ণনগর স্টেশন এপ্রোচ রোডের বাড়িতে স্বপন মৈত্র এই বাড়ির পুজো চাপড়ার ডাংনা গ্রাম থেকে সরিয়ে কৃষ্ণনগরের বাড়িতে নিয়ে আসেন। একই নিয়ম মেনে শুরু হয় এই পারিবারিক পুজো। প্রতিমা শিল্পীরা বাড়িতে এসে রথের দিন প্রতিমা তৈরি আরম্ভ করে। পঞ্চমীতে বোধন তলে বোধনের ঘট বসে। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে এই পুজো এখনো চলে আসছে। অষ্টমী ও নবমীতে এখানে বেশ কিছু পাঁঠাবলি হত এখন আর হয় না। এখন আঁখ, চাল কুমড়ো, সন্দেশ প্রভৃতি বলি দেওয়া হয়। অষ্টমীর দিন সন্ধিপূজার পর ১০৮ টি প্রদীপ জ্বালিয়ে নিজেদের পুকুরে কলার ভেলাতে সাজিয়ে তা জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। বেজে উঠতো ঢাক। নবমীর দিন মন্ডপের সামনে বড় গর্ত করে কাদা খেলা হত। দুর্গা মন্ডপের চাতালে বাড়ির ছেলেমেয়েরা লাল চন্দন দিয়ে বেল পাতায় ১০৮ বার শ্রী শ্রী দুর্গা সহায় লিখতো। নীলমণিগঞ্জ ও ডাঙ্গার পুজোর সঙ্গে একটু পরিবর্তন হয়েছে কয়েক বছর বন্ধ হয়ে গেছে পাঁঠা বলি এবং কাদা খেলার রীতি।

বর্তমানে মৈত্র বাড়িতে দুর্গা পুজোতে দেবীর গলায় পড়ানো হয় ১৩৮ টি পদ্মের তৈরি মালা। এই পদ্মফুল আগে বাংলাদেশে মৈত্র পরিবারের পদ্ম পুকুরে ফুটতো সেই পদ্মেই মায়ের পুজো হতো। দশমীতে শাপলা (নাল) ফুটতো পদ্মের সঙ্গে। তা তুলে এনে রান্না করে দশমীতে ভোগের সঙ্গে দেওয়া হতো। বর্তমানে যা বাজার থেকে কিনতে হয়। পুজো মন্ডপে কাঠের বড় বারকোস, তাম্র পাত্র এবং বিরাট বিরাট কলাপাতা থাকতো। পাড়ার মেয়ে বউয়েরা গাঁদা, দোপাটি, শিউলি, জবা, কলাবতী ফুল সাজি ভরে এনে ঢেলে দিয়ে যেত। অতীতে ৫০ জন ঢাকি ঢাক বাজতো। এখন আর তা হয় না। বোধনের দিন থেকে চণ্ডীপাঠ শুরু হয়। এই ব্রাহ্মণ পরিবারের দীক্ষিত ব্রাহ্মণ এবং দীক্ষিত ব্রাহ্মণী ছাড়া কেউ পুজোর ভোগ রান্না করতে পারে না। বংশের জীবিত বয়োজ্যেষ্ঠের নামে পুজো সংকল্প করা হয়। দশমীতে বেদী থেকে নামাবার পর বাড়ির বউ মেয়েরা সাত পাক প্রদক্ষিণ করে মাকে বরণ করে। তারপর হয় কনকাঞ্জলি। বরণের কুলোতে এক আরি ধান বসিয়ে তা মাথায় নিয়ে আর পিছন দিকে না তাকিয়ে তা গৃহ দেবতার আসনের পাশে রাখা হয়। এই নিয়ম একইভাবে আজও চলে আসছে।

মৈত্র বাড়ির পুজোতে সকলেই দেবী দুর্গার অঞ্জলি দিতে পারেন। এখানে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ হয় না। ফলে এই পুজো এখানে সম্প্রীতির পুজোতে পরিণত হয়েছে। মৈত্র পরিবারের সেই জমিদারি নীলমণিগঞ্জের বুকেই শেষ হয়ে গেছিল। আগের মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও পরিবারের সকলের মৃত চেষ্টায় এই পুজো সর্বজনীন পুজোর রূপ নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *