জে মাহাতো, আমাদের ভারত, মেদিনীপুর, ২২ অক্টোবর: বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হয় পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড় থানার অন্তর্গত এক প্রত্যন্ত গ্রাম মুসাচকের চক্রবর্তী পরিবারে। বর্তমানে এই পূজার প্রধান ব্যক্তি শ্রীকুমার চক্রবর্তীর সতেরো পুরুষ আগে দক্ষিণেশ্বর সংলগ্ন আড়িয়াদহ গ্রাম থেকে চক্রবর্তীরা নারায়ণগড়ে আসেন। এদের পূর্ব পদবি ছিল মুখোপাধ্যায়। তাই এদের গোত্র ভরদ্বাজ। নারায়ণগড়ের রাজারা এদের চক্রবর্তী উপাধি দেন।
চক্রবর্তী পরিবারের পূজার বয়স প্রায় চারশ বছর। এত প্রাচীন পূজা হওয়া সত্ত্বেও এই পূজায় কোনি সন্ধিপূজা নেই এবং কোনও পশুবলিও হয় না। অনেক আগে পশুবলির প্রচলন থাকলেও শ্রীকুমার বাবুর প্রপিতামহ পণ্ডিত প্রবর মধুসূদন বাচস্পতির সময়ে পূজায় পশুবলি বন্ধ হয়। এবং মহাভারতের প্রখ্যাত অনুবাদক পন্ডিত হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের পরামর্শে তখন থেকে পশু বলির পরিবর্তে কুষ্মাণ্ডবলির প্রচলন হয়। সপ্তমী ও নবমী পূজায় এই কুষ্মাণ্ডবলির প্রথা আজও প্রচলিত আছে।
চক্রবর্তী পরিবারের পূজার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল দশমীর দিন বিসর্জনের আগে দেবীকে পান্তা ভাতের নৈবেদ্য দেওয়া। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় শুষনি শাক ভাজা। এই বৈশিষ্ট্যটি সুপ্রাচীন লোকসংস্কৃতির সঙ্গে এই পূজার যোগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এদের পূজার ঠিক এরকম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল শোলার তৈরি পটের ব্যবহার। সুন্দর কারুকার্যময় এক বৃহৎশোলার পটের মধ্যে বসানো হয় দুর্গা প্রতিমা, নবপত্রিকা ও গণেশ ঘট। এই শোলার পট কে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় “মন্দির”। এই পটের উপরে বিচিত্র রঙে আঁকা থাকে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের ছবি। এসব ছবির কন্টুর বা রেখার ধরন প্রাচীন গুহা চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। চক্রবর্তীদের পরিবারের একটি প্রাচীন প্রথা হল সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধ্যায় পূজা ও আরতির পর দেবীর বিশ্রামের জন্য বিছানা পেতে দেওয়া। নতুন মাদুরের উপর নতুন কোনও বস্ত্র পেতে তৈরি করা হয় বিছানা। এছাড়া অষ্টমীতে বসে চন্ডীমঙ্গল গানের আসর। এই গান গ্রামের সবাই আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন।
এই পূজায় সবচেয়ে বেশি জাঁকজমক হত মধুসূদন বাচস্পতি পুত্র শ্রী প্রতিসরণ চক্রবর্তীর সময় আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজনকে আমন্ত্রণ জানানো হতো মায়ের দর্শন ও প্রসাদ ভক্ষণের জন্য অজস্র দরিদ্র নারায়ণ সেবা হত সপ্তমী অষ্টমী নবমীজুড়ে শ্রীপতি চরণের তিন পুত্র রমাপতি প্রমথনাথ ওরা মাঙ্গ নাথ পূজার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থেকে সাহায্য করতেন পিতাকে।
নানা কারণে এই প্রাচীন পূজা একসময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অসহায় রমাপতি বাবু ও তাঁর পুত্রেরা পাঁচ দিনের পূজাকে একদিনে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তারা এ ব্যাপারে শাস্ত্রীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারেননি। পূজা অন্তপ্রাণ রমাপতি বাবু ও তাঁর পত্নী বীণাপাণি দেবী শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব ঝুঁকি নিয়েও পূজা প্রচলিত রাখেন। কেননা এ পূজা তাদের কাছে শুধু কুলপ্রথা ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার সমর্থক। বারো বছর বয়স থেকে ৭৬ বছর বয়স পর্যন্ত যে রমাপতিবাবু নিজের হাতে দেবীর পূজা করেছিলেন তার পক্ষে পূজা বন্ধ করা ছিল মৃত্যুর সামিল।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত জয়েন্ট সেক্রেটারি শ্রীকুমার বাবু বর্তমানে পূজার প্রধান পুরুষ। বৈশাখ মাস থেকেই তিনি উদ্যোগ নেন পূজার ব্যাপারে।পূজা সুসম্পন্ন করার কাজে তাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন তার ভাই বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সতীনাথ বাবু, উচ্চপদস্থ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী সতীনাথ বাবু ও শিক্ষক সৌমিত্র বাবু (খুড়তুতো ভাই) তৃপ্তি ব্যানার্জি সংগীতা রায়, ও স্বপ্না ভট্টাচার্য প্রমূখ পরিবারের বিবাহিত কন্যারা এবং পরিবারের বধূরাও পূজার নানা কাজে সাহায্য করেন। গ্রামবাসীরাও এই পূজায় আনন্দের সঙ্গে যোগ দেন এবং গ্রামের এই প্রাচীন পূজার জন্য গর্ববোধ করেন।

