কল্যাণ গৌতম
আমাদের ভারত, ৯ অক্টোবর: দুর্গাপূজাকে বারোয়ারি স্তরে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে যতটা প্রতিবাদের পরত ছিল, ততটা কি প্রণাম-প্রকৃষ্টতা ছিল? গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে, আম জনতার ধোঁয়া তুলে পূজাকে একদিন সর্বজনীন করেছিলেন যারা, তাদের সম্ভবত যথাযোগ্য ভক্তি ছিল না, ছিল যথাসাধ্য ভান অথবা ভাঁওতা। বারোয়ারি পূজাই হিন্দুদের মধ্যে দেবীকে পূজার ছলে অর্বাচীন ও অপ্রচল করেছে। দেবী দশ প্রহরণধারিণী থেকে হয়েছেন নিরস্ত্রা, পলায়নপর, ভীতু বাঙালি রমণী।
বিদ্বেষীরা প্রশ্ন তুলছেন, অসুর হত্যাকারী দেবীমূর্তি মানবতার চরম বিরোধী। তারাই দশমীর দিনে শাস্ত্রীয় শস্ত্র-পূজনে বাঁধা দেন। যারা কেবল দেশবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মানবতাবাদের ঠিকা নিয়েছেন, হিন্দু রমণীর ভাঙ্গা শাঁখা-নোয়া বেচে যাদের পদোন্নতি, তারাই প্রস্তুত ন্যারেটিভের জনক। থিম পূজাই এই হিন্দুত্বকে মেরেছে শক্ত পেরেক। সেই পেরেকের খোঁচায় বাঙালি-হিদুয়ানি রক্তাক্ত। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, বাঙালি হিদুই নীরব দর্শকের ভূমিকায় এসব নাটক দেখার যাবতীয় টিকিট কেটে বসে আছেন। এ পেরেক তোলার জন্য হাতুড়ির যে উল্টো-পিঠ দরকার, তা দখল করে বসে আছেন কমি-কুণ্ডলী।
অথচ গ্রাম-বাংলার লৌকিক পূজার যথার্থ আসর, গ্রাম দেবতার পবিত্র পূজার থান চিরকালই গণতান্ত্রিক বাতাসে সুবাসিত। কারণ সেখানে আয়োজকের ভক্তি ছিল, ভণ্ডামি ছিল না। বারোয়ারি-পরিচালক যদি ভক্তিমান না হন, তবে দেবীর থান রূপক-সংকেত হারিয়ে চটির মেলা হয়ে দাঁড়াবে, অজ্ঞান-হিঁদুরা টেরও পাবেন না।
থিমপূজার জন্ম হয়েছে কয়েক দশকের বামপন্থী পূজা কমিটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায়। বামেরা পূজা বিরোধী, কিন্তু পূজার প্যাণ্ডেল নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে। সংস্কৃতের বিরুদ্ধে, কিন্তু সংস্কৃতের শিক্ষক নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে। ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে, কিন্তু ব্রাহ্মণ পুরোহিত কারা পূজার বরাত পাবেন, তা নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে। এভাবেই দিনের পর দিন প্রকল্প-প্রয়াসে পাশ দিয়ে আজকের থিমপূজার রমরমা করিয়েছিলেন বামপন্থী বিদ্যাবিশারদরা। দেবী আজ তাই উদ্বাস্তু নারী; কিন্তু কে উদ্বাস্তু করলে, তার হদিশ নেই। বারোয়ারি মনোবাঞ্ছায় তাই মা গঙ্গা পাবেন না। এ পূজা একশো শতাংশ ধর্ম-বিচ্যুত করা হবে বলেই প্রকল্পের নাম “দুর্গাপূজা থেকে হয়েছে শারদোৎসব উৎসব”। কিছু গড়বড়ে হলেই মাথায় মস্ত চড় কষিয়ে বলবেন, “ধর্ম যার যার/উৎসব সবার।” আর তারপরেই মনে মনে কইবেন, “হরি হে/রাজা করো।”
(মতামত লেখকের নিজস্ব, এরজন্য আমাদের ভারত দায়ি নয়।)

