জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৮ ডিসেম্বর: ডিসিআরসি দূর অস্ত। না আছে চালান, না আছে পরিমানের পরিমাপ করা স্লিপ। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে শিকেয় উঠেছে নাকা চেকিং। জাতীয় সড়ক নির্মানের নামে অবাধে চলছে অবৈধ পাথর বোঝাই ডাম্পার, লরি। রাজ্যের কোষাগার যখন অর্থসঙ্কটে ভুগছে তখন দৈনিক কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে পাঁচামীর পাথর পাচার। অভিযোগ, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদতে চলছে অবৈধভাবে পাথর পাচারের রমরমা কারবার। প্রশ্ন উঠেছে, ভূমি রাজস্ব, পরিবহন দফতর ও পুলিশের নজরদারিতে। নজির বিহীন ছবি ধরা পড়ল পানাগড়-মোরগ্রাম সড়কের ওপর।
প্রসঙ্গত, পানাগড় সম্প্রতি ধরলা মোড় থেকে পালশিট পর্যন্ত জাতীয় সড়ক সম্প্রসারনের কাজের অনুমোদন হয়। সেই মতো একটি বেসরকারি সংস্থা বরাত পেয়ে নির্মান কাজ শুরু করে। কাঁকসায় ও গলসীর সিমনোড় মোড় এলাকায় সড়ক নির্মানের স্টক ইয়ার্ড তৈরী করেছে নির্মানকারী সংস্থা। সেখানে পাঁচামী থেকে পাথর মজুতের কাজ চলছে জোরকদমে। দিনরাত চলছে পাথরের জোগান। পাঁচামী থেকে পানাগড় মোরগ্রাম সড়ক দিয়ে ডাম্পারে পাথর জোগানের কাজটি করছে এক পাথর ব্যাবসায়ী। ডাম্পারের সামনে ‘অন ডিউটি এনএইচ’ স্টিকার। পিছনে বেআইনিভাবে ওভারলোডিং পাথর।
পরিবহন দফতর সুত্রে জানা গেছে, ৬ চাকার লরি- ডাম্পার ১০ টন, ১০ চাকার লরি -ডাম্পার ১৫ টন ও ১২ চাকার লরি ২০ টন পর্যন্ত পন্য বোঝাই করতে পারে। কিন্তু মুনাফার লোভে তার থেকে কয়েকগুন বেশি পাথার বোঝাই করে লরি ও ডাম্পার। প্রায় ৪৪-৫০ টন পর্যন্ত পাথর বোঝাই করে অবাধে যাতায়াত করছে। পাথরের ওপর কোনো ঢাকা দেওয়ার ব্যাবস্থা নেই। ডাম্পারের অতিরিক্ত পাথর পড়ছে সড়কের ওপর। আর ওই পাথর থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। তেমনই বেহাল হয়ে পড়ছে সড়ক। খানাখন্দে ভর্তি হচ্ছে যেমন, তেমনই আবার রাস্তা বসে গিয়ে উঁচু ঢিপি হয়েছে মাঝে মধ্যে। বিপদজ্জনক দশায় পরিণত হচ্ছে সড়ক। আর প্রশ্ন এখানেই। সড়কের টেকসইয়ের জন্য ওভারলোডিং যানের ওপর নিষেধাজ্ঞা করা হয়। উল্টে ওই সড়কের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মানের নাম নিয়ে অবাধে ওভারলোডিং পাথর বোঝাই ডাম্পারের আনাগোনা।
শুধু তাই নয়। ওইসব পাথর বোঝাই ডাম্পারের চালকদের প্রশ্ন করা হলে, তারা স্পষ্ট জানান, “কোনো ডিসিআরসি নেই। চালানও নেই।” এমনকি পন্যের পরিমান পরিমাপ করা স্লিপও দেখাতে পারেনি ওইসব পাথর বোঝাই ডাম্পারের চালকরা। অথচ বীরভূমের পাঁচামী থেকে পশ্চিম বর্ধমানে ২-৩ জেলার পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তা বেমালুম পেরিয়ে আসছে। জানা গেছে, পাঁচামীর পাথর বেশিরভাগই আসে সেখানের বেতাজবাদশা টুলু মন্ডলের ক্রেসার থেকে। তার সঙ্গে আরও কয়েকটি ক্রেসার থেকে পাথার আসে। ডাম্পারের সামনে বড় বড় স্টিকার সাঁটানো ‘অন ডিউটি এনএইচ’। গাড়ি সহজে জানান দেওয়ার জন্য স্টিকার বসানো রয়েছে, ‘বি’ – বোম্বে রোড ও ‘ডি’- দিল্লি রোড। আর তাতেই যেন সব দোষ মুক্তি। মূলত পাথর বোঝাই গাড়ির বৈধ কাগজ না থাকলে জরিমানা করা হয়। দেওয়া হয় ডিসিআরসি। তার জন্য ১০০ সিএফটি পিছু ৮০০ টাকা ধার্য হয়। ১০০ সিএফটি অর্থাৎ ৪.২ টন। তবে এসমস্ত ১২-১৬ চাকার ডাম্পার বেশিরভাগই প্রায় ৪৪-৫০ টনের ওপর লোডিং বলে অভিযোগ। দৈনিক ৬৫০-৭০০ লরি -ডাম্পার পাথর বোঝাই করে বেরিয়ে আসছে। হিসাব অনুযায়ী প্রায় ডাম্পার পিছু ৯-১০ হাজার টাকার রাজস্ব লোকসান। অভিযোগ, দৈনিক প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে পাঁচামীর পাথার পাচার। পরিবহন আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অবাধে চলছে ওভারলোডিং পাথর বোঝাই ডাম্পার। প্রশ্ন, পাথর জোগানকারী ব্যাবসায়ী কিভাবে সরকারি সংস্থার নাম নিয়ে বেআইনী ওভারলোডিং পাথরের গাড়ি চালাতে পারে? সরকারি সংস্থার নাম নিয়ে কিভাবে চলছে বেআইনীভাবে পরিবহন? আরও প্রশ্ন, কিভাবে পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে প্রায় ৭০-৮০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে অবৈধ পাথর বোঝাই লরি ডাম্পার অনায়াসে চলে আসছে? তাও আবার পানাগড় -মোরগ্রাম রাজ্য সড়কের মত গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দিয়ে।
রাজ্যে তৃতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ বালি পাথর বোঝাই যান চলাচল বন্ধে উদ্যোগী হয় রাজ্য সরকার। সড়কের ওপর বিভিন্ন জায়গায় কড়া নাকা চেকিং শুরু হয়। ২ নং জাতীয় সড়কের ওপর বুদবুদের জেকে নগর এলাকায় রয়েছে নাকা চেকপোষ্ট। যদিও পানাগড়-মোরগ্রাম সড়কের ওপর কাঁকসা থানা এলাকায় কোনো নাকা চেক পোস্ট নেই। তবে বীরভূমের ইলামবাজারে রয়েছে সড়কের ওপর টোলপ্লাজা। নজরদারির জন্য সেখানে সিসিটিভিও বসানো আছে। বীরভূম ও পশ্চিম বর্ধমান শুধু নয় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের অন্যতম সড়ক পানাগড়- মোরগ্রাম সড়কটি। প্রশ্ন, ওইরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাকা চেকিং নেই কেন? আরও প্রশ্ন, মোটরভেহিক্যাল ও পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে কিভাবে বৈধ চালান ছাড়া বেরিয়ে আসছে ওভারলোডিং পাথর বোঝাই ডাম্পার? মোটর ভেহিক্যাল ও পুলিশ প্রশাসনের কড়া নজরদারির নেই কেন?
বিষ্ণুপুরের সাংসদ সৌমিত্র খাঁ বলেন, “রাজ্যের কোষাগারে টান পড়ছে। আর পাঁচামী থেকে কোনোরকম রয়েলটি ছাড়া অবাধে পাথর লরি-ডাম্পারে পাচার হচ্ছে। তাতে দৈনিক পাঁচামী থেকে দৈনিক ৬৫০-৭০০ পাথর বোঝাই ডাম্পার লরি বেরোচ্ছে। কোনোরকম রয়েলটি ছাড়া ওইসব পাথর বোঝাই গাড়ি রাস্তার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাতে রাজস্ব লোকসান হচ্ছে দৈনিক প্রায় কোটি টাকা। সবটাই ভাইপোর ট্যাক্সে চলে যাচ্ছে। আর ভাইপোর পিসি টাকা নেই বলে নাটক করছে।”
যদিও এবিষয়ে জেলা ভূমি রাজস্ব দফতরের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার আরটিও মৃন্ময় মজুমদার জানান, “চলতি অর্থ বছরে এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত জেলায় পরিবহন বিভাগে কর, জরিমানা সহ বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। নভেম্বর মাসে এনফোর্সমেন্টে সংগ্রহ হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা। সড়কে নিয়মিত ওভারলোডিং গাড়ি ধরপাকড় হয়। ওভারলোডিং ধরাও পড়েছে। ওই রুটে ওভারলেডিংয়ের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”

