অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২৯ জানুয়ারি: একবার নয়, চারবার দিল্লি থেকে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের নাম-তালিকা জানতে চাওয়া হয়েছিল নবান্নের কাছে। উত্তর যায়নি। এবার কড়া ব্যবস্থা নিল নির্বাচন কমিশন। ‘ওঁদের চাই’ বলে একগুচ্ছ আমলার নাম পাঠিয়েছে রাজ্যকে। এ নিয়ে পাল্টা তোপ দেগেছে রাজ্যের শাসক দল। সব মিলিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া মিলেছে সমাজের বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে।
সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী রাজ্যগুলোর কর্তব্য কেন্দ্রকে নির্বাচনী বাধ্যবাধকতায় সহায়তা করা। তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। বিষয়টিতে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ কলকাতার একটি সুপরিচিত কলেজের অধ্যক্ষ, অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি (প্রান্তপ্রমুখ) ডঃ পঙ্কজ রায়। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কমিশনের এক্তিয়ার এবং সংশ্লিষ্ট নানা কথা সংবিধানের ৩২৪ থেকে ৩২৯ ধারায় সবিস্তারে লেখা আছে। সেই সংবিধানের নামেই শপথ নিয়ে, কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্য বিষয়গুলো রাজ্য একের পর এক উপেক্ষা করছে। এটা লজ্জার, গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকারক।”
প্রায় দেড় দশক আগে অবসরপ্রাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যসচিব অশোকমোহন চক্রবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “কমিশনের এক্তিয়ার আছে রাজ্যগুলোর কাছে পর্যবেক্ষক চাওয়ার। কেন্দ্র যদি নিজে থেকে পর্যবেক্ষক চেয়ে নির্দিষ্ট আমলাদের নাম রাজ্যকে পাঠায়, রাজ্য বিশেষ কারণ দেখিয়ে সেই তালিকার কোনও নাম পরিমার্জনের অনুরোধ করতে পারে। ৩-৪বার কেন্দ্রের চিঠি দেওয়ার এবং তার জবাব না দেওয়ার প্রমাণ তো আমার নেই! তবে, চিঠি দিলে তার জবাব দেওয়াটা আবশ্যিক। আমি তো স্বরাষ্ট্রসচিব হওয়ার আগে পর্যন্ত ভোটের আগে কেন্দ্রের নির্দেশে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসাবে গিয়েছি। বিহারে কাটিয়েছি দু’মাস।”
নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক কেন্দ্রের পাঠানো চিঠিগুলো এই প্রতিবেদককে পাঠিয়েছেন। তাতে, তার আগে ১৬ ডিসেম্বর রাজ্যের মুখ্যসচিবকে পাঠানো কমিশনের প্রধান সচিব অজয় কুমারের চিঠিতে (ডিও 464/OBS/2025/0PS) ২রা এবং ৯ ডিসেম্বর কমিশন থেকে পাঠানো সংশ্লিষ্ট চিঠির উল্লেখ আছে। কেন্দ্র চিঠিগুলোর উত্তর পায়নি, সেই কথা লেখা হয়েছে ঘন হরফে। এর আগে নির্বাচন কমিশনের ডেপুটি কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী গত বছর ২৪ নভেম্বর রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যসচিব ডঃ মনোজ পন্থকে ২৯ নভেম্বরের মধ্যে পর্যবেক্ষকদের তালিকা পাঠাতে বলেছিলেন। সেই চিঠিতে ভারতের সংবিধানের ৩২৪ (১) এবং ৩২৪ (৬) ধারার পাশাপাশি ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২০ (খ) ধারার উল্লেখ রয়েছে।
লেখিকা, শিক্ষাবিদ, সমাজতাত্বিক ডঃ মীরাতুন নাহার এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমরা চাই নির্বাচন স্বচ্ছ হোক। ঠিকঠাক হোক। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংপৃক্ত সকলে সুস্থ থাকুন। গণতন্ত্রকে চিতায় তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই গণতন্ত্রকে যেন বাঁচিয়ে, সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কেন্দ্র-রাজ্যর মধ্যে পর্যবেক্ষকের নাম-তালিকা পাঠানোর চিঠি নিয়ে এই আকচা-আকচি অনেকটাই যেন ‘নকল যুদ্ধ’। গণতন্ত্রর পক্ষে এটা ভয়ঙ্কর বিপদ।”
প্রবীন সিপিএম নেতা, দলের পরামর্শদাতা রবীন দেব বলেন, কেন্দ্রের পাঠানো চিঠির জবাব দেওয়া রাজ্যের উচিত। তবে, এটা তো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়! একের পর এক আইনি সিদ্ধান্ত রাজ্য উপেক্ষা করছে। রাজ্যের এই বেপরোয়া মনোভাবের জন্য দায়ী আরএসএস। ২০০২-এ আরএসএস এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিল ‘মা দুর্গা’। আবার মোহন ভাগবৎকে বলেছিলেন ‘দেশপ্রেমিক’। সুতারাং, ওদের গোপন বোঝাপড়াই সর্বনাশের মূল কারণ।
প্রসঙ্গত, ১৫ জন আইএএস এবং ১০ জন আইপিএস-কে সরাসরি আসন্ন পাঁচ বিধানসভা ভোটের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক (সেন্ট্রাল অবজার্ভার) হিসাবে নিয়োগের মিটিংয়ে ডেকেছে নির্বাচন কমিশন। এর আগে বার বার নাম চাওয়া হয়েছিল। নবান্ন নাম না দেওয়ায় সরাসরি পদক্ষেপ করা হয়েছে। ১৫ জনের তালিকায় নাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশ প্রসাদ মীনার নামও। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে চিঠি পাঠিয়ে কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি এমএল মীনা জানিয়েছেন, আগামী ৫ এবং ৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উপস্থিতিতে ওই বৈঠক হবে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনকে না-জানিয়ে বা অনুমতি না নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজে পর্যবেক্ষক তিন আধিকারিককে বদলি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে সেই বিষয়ে চিঠি দিয়েছ কমিশন। চিঠিতে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সরকারের এই আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

