শ্রীরূপা চক্রবর্তী, আমাদের ভারত, ৮ জুলাই: পঞ্চায়েত ভোটের প্রথম থেকেই বিরোধীরা ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা যেমন দিয়েছে দলের কর্মীদের তেমনি জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার। বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম সবাই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট লুট মোকাবিলায় প্রতিরোধ গড়ার ডাক দিয়েছিল। শনিবারের পঞ্চায়েত ভোটে সেই ছবি কিন্তু বেশ কিছু জায়গায় প্রতিফলিত হতে দেখা গেছে। আর এই গণ প্রতিরোধকেই তৃণমূলের জন্য বিপদ সংকেত বলে মনে করছেন অনেকে।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেছিলেন, তৃণমূলের কেউ মারতে এলে তারা যেন তাদের পিঠে লাঠির ছাপ নিয়ে ফিরে যায়। ঝান্ডার সঙ্গে ডান্ডা রাখার নিদান দিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছিলেন, বাধা দিলে লড়াই বাধবে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম নিজের ফেসবুক পেজেও বার বার প্রতিরোধ গড়ার ডাক দিয়েছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন এবারেও শুধুই শাসক দলের দাদাগিরি দেখা যাবে এই পঞ্চায়েত ভোটে। কিন্তু ময়দানে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন ছবি। এবার বহু জায়গায় পাল্টা মার খেয়ে পিছু হতে বাধ্য হয়েছে নিজেকে দাদা মনে করা শাসক দল তৃণমূলের বাহিনী। পঞ্চায়েত ভোটে শনিবার বিকেল পর্যন্ত যে মৃত্যুর সংখ্যার তালিকা মিলেছে তাতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শাসক দলের কর্মীরাই। দুপুরের মধ্যেই শাসক দলের আট জনের মৃত্যু হয়েছিল। রাজ্যের অন্তত দুটো এলাকায় তৃণমূলের লোককে ল্যাম্পপোস্টের বেঁধে প্রকাশ্যে পেটানো হয়েছে। এই ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে কল্পনার অতীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তাদের কর্মী খুনের ঘটনাকে সামনে রেখে তৃণমূল অবশ্য বলার চেষ্টা করেছে তাদের দলের লোককে টার্গেট করে খুন করা হচ্ছে। কিন্তু পাল্টা তাদের দিকেই প্রশ্ন উঠেছে তারা তো শাসক দল অথচ তারা কেন নিজেদের কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না?
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, বিরোধীরা যে পাল্টা মারের রাস্তা বেছে নিয়েছিল এদিন আগামী বছর লোকসভা ভোটেও কি তার প্রভাব পড়বে? বিরোধীরা যে সব জায়গায় পাল্টা মার দিতে পেরেছে তা নয়। তবে তারা যেখানে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী সেখানে তারা পাল্টা মেরেছে। সিপিএম সহ বিরোধীরা দাবি করেছে, তৃণমূল বুথ লুট করতে এলে তারা গণ প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। ভোট লুটেরেরা পাল্টা মার খেয়েছেন। বহু জায়গায় দেখা গেছে দলমত নির্বিশেষে মানুষ শাসক দলের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ছেন। কোথাও বাইক কেড়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন, কোথাও লাথি মেরে ব্যালট বাক্স নর্দমায় ফেলেছেন। কারণ একটাই, তাদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই প্রতিরোধ প্রতিবাদী জনতার না কি বিজেপির? নাকি কংগ্রেসের? নাকি সিপিএমের? বেশিরভাগ জায়গাতেই এই ভেদাভেদ করা যায়নি।
ইতিহাস বলছে শাসক দলের কর্মীরা যখন বিরোধীদের হাতে মার খাওয়া শুরু করে তখন বুঝতে হবে রাজনীতির চাকা ঘুরতে চলেছে। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের কথা অনেকেই মনে করেছেন। পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা পরিষদ তৃণমূল সেবার জিতে তাদের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। পঞ্চায়েত ভোটের পর লোকসভা ভোটেও বামেদের ধ্বস নেমেছিল। এরপরেই তার রেশ ধরে পরিবর্তন এসেছিল ২০১১তে। অর্থাৎ ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটেই বোঝা গিয়েছিল বাম দুর্গে ভাঙ্গন ধরেছে।
কিন্তু তখনকার আর এখনকার পরিস্থিতি কি এক? সেই সময় বিরোধীদের নেতৃত্বে ছিলেন জঙ্গি নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যার নেতৃত্বে তার দলগত আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ পেয়েছিল। তৃণমূল সেই সময় কংগ্রেসকেও পাশে পেয়েছিল। কিন্তু এখনকার বিরোধীরা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। কারণ বিজেপি ও সিপিএম কংগ্রেসের মধ্যে নীতির আকাশ পাতাল ফারাক। আর এই নৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্যই এরা কখনো তৃণমূলের বিরুদ্ধে এক হতে পারবে না। তাহলে কি লোকসভা বা বিধানসভা ভোটে পঞ্চায়েত ভোটের এই প্রতিরোধের ছবি আরও স্পষ্ট হবার সুযোগ কি থাকবে না?
বিরোধীদের শক্তি যদি বৃদ্ধি হয় তবে তা তৃণমূলের জন্য অবশ্যই হবে বিপদ সংকেত। মালদা, মুর্শিদাবাদে মার খেয়েছে তৃণমূল। এই দুই জেলা বরাবরই কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে নদীয়ায় বিজেপির উত্থান হয়েছে। সেখানে দাপট দেখিয়েছে বিজেপি। গ্রামীণ বর্ধমানেও দাপট দেখিয়েছে সিপিএম। কেষ্টের অনুপস্থিতিতে বীরভূমেও তৃণমূলকে রোখার চেষ্টা করেছে বিজেপি। উত্তরবঙ্গে কোচবিহারে পদ্ম শিবিরের কর্মীরা মারমুখী হয়েছে।
এদিকে ভোটের দিন একের পর এক তৃণমূল কর্মী খুন হওয়ার ঘটনায় কুনাল ঘোষ বলেছেন, বিরোধীরা যে হিংসার অভিযোগ তুলছে সেটা নাটক। কারণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তৃণমূলের। আমাদের কর্মীদের খুন করা হয়েছে। আমরা সরকারে আছি তাই দায়িত্বশীল দল হিসেবে বলছি প্ররোচনায় পা দেবেন না। কুনালের এই কথার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে, একেবারে মন পড়ে যাচ্ছে বাম জামানার শেষ পর্বে বিমান বসুর কথার। জঙ্গলমহলে যখন একের পর এক সিপিএম কর্মী খুন হচ্ছিল তখন তৃণমূল মাওবাদী আঁতাতের তত্ত্ব খাঁড়া করে বিমান বসু বলতেন প্ররোচনায় পা দেবেন না। দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুন। প্রশ্ন উঠতো বুদ্ধ ভট্টাচার্য কেন নিজের দলের কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না?
গত দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল বিরোধী পক্ষের লোকদেরই প্রাণ গেছে। কিন্তু এবার সে ছবি উল্টে গেছে। কোথাও কুপিয়ে, কোথাও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তৃণমূল কর্মীদের। অনেকে মনে করছেন যাদের ঘিরে ধরে মারা হয়েছে, সেই মার মুখে বিরোধীদের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস জোগাতে পারেনি শাসক দল। বিরোধীদের জোট বদ্ধ প্রতিরোধের সামনে শাসক দলের কর্মীরা হার মেনেছে। তাই আজকের এই রক্তস্নাত পঞ্চায়েত ভোট কিন্তু তৃণমূলের জন্য এলার্ম। আদৌ কি আগামী এক বছরে তৃণমূল নিজের ঘর গুছিয়ে উঠতে পারবে? আবার বিরোধীরাও কি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ততটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে?

