বিশাল ভুঁড়ি থাকা সত্ত্বেও কুঁড়ি তোলার রগরগে চটুল গল্প নয়, এই পশ্চিমবঙ্গ আমার চেনা পশ্চিমবঙ্গ নয়

রজত ভরদ্বাজ মুখার্জী
আমাদের ভারত, ২৯ জুলাই:
নাহ, এই পশ্চিমবঙ্গ আমার চেনা পশ্চিমবঙ্গ নয়। শিক্ষা সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে একদা সমগ্র বিশ্বে সম্মানিত ও সমাদৃত আমার পশ্চিমবঙ্গ আজ বর্হিবঙ্গে ধিকৃত, নিন্দিত, সমালোচিত, হাস্যস্পদ। আমাদের কৌলিণ্যের আত্মশ্লাঘা আজ রীতিমত হীনমন্যতায় পর্যবসিত। নেপথ্যে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মত কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পার্থবাবুর অসংখ্য বান্ধবী বিলাসের মতই তাঁর দুর্দমনীয় অর্থপ্রীতিও আজ সর্বজনবিদিত।

হিমালয়ের দর্শন না মিললেও তাঁর ফ্ল্যাট খুললেই টাকার পাহাড়ের সন্ধান পূবের আকাশে সূর্যোদয়ের মতই শাশ্বত। পার্থবাবুর বান্ধবী বিলাস আমার আজকের এই আলেখ্যের প্রতিপাদ্য নয়, সে সব বিষয়ে সময়ের অপব্যায় করায় আমার বিশেষ একটা রুচিও নেই। অর্পিতা থেকে মোনালিসা, সুন্দরী পরিবেষ্টিত পার্থবাবুর বহুবল্লভ হয়ে ওঠা এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথের মাঝে অনেক গলি, উপগলি, বাঁক, খানাখন্দ, আল্পনা কল্পনা উপাসনা আরাধনা যুঁথিকা মল্লিকা থেকে থাকতে পারেন আমার জানা নেই, জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। তাই বিশালকায় ভুঁড়ি থাকা সত্ত্বেও কুঁড়ি তোলার রগরগে চটুল গল্পে আগ্রহী পাঠককূল এই প্রতিবেদনে রীতিমত হতাশ হতে পারেন।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শব্দবন্ধের সাথে আমরা সম্যক পরিচিত। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা তারাই, যারা মানুষ কে সঠিক দিশায় স্বপ্ন দেখান ও স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেন। তাই জাতি ধর্ম বর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে নবীন প্রজন্মকে উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখানো মানুষগুলো আজও নমস্য।

কিন্ত স্বপ্ন চোর? স্বপ্ন চোর তারা, যারা পুত্রকন্যাসম ছোট ছোট শিক্ষিত, মেধাবী, প্রাণপাত পড়াশোনা ও পরিশ্রম করে যোগ্যতার বলে অর্জিত চাকরি প্রাপকদের চাকরি চুরি করে কোটি কোটি টাকায় বিক্রী করেন। নিতান্তই নিম্ন মেধার অযোগ্যদের কাছে সেই চাকরি বিক্রী করে অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ পুরোটাই আত্মসাৎ করে বিত্তবান ও বহুবল্লভ হয়ে ওঠেন। উচ্চাকাঙ্খী এই নরকের কীটগুলো দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অসংখ্য বান্ধবী বিলাস, নারী সাহচর্য সহ চরম বিলাস বহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলস্বরূপ ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো হতোদ্যম হয়ে কেউ বা আত্মহননের পথ বেছে নেয়, কেউ বা নিরুপায় হয়ে সারা জীবনের মত তমসাচ্ছন্ন অভাব অনটনের জীবনকেই নিত্যদিনের সঙ্গী হিসেবে আলিঙ্গণ করে নেন। এ হেন আত্মকেন্দ্রিক সমাজের বুকে কোন মূল্য থাকে না তাদের চোখের জলের। উল্টে প্রশাসনিক অভিভাবকদের বেয়াদপি, মিথ্যাচার, নাটক মুখ বুজে সহ্য করে যেতে হয় প্রতিনিয়ত অনুক্ষণ। বাড়িতে অসুস্থ মা বাবার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ তাদের ব্যথিত করলেও সাধ্য থাকেনা যথাযথ চিকিৎসা করানোর বা ওষুধ কিনে দেওয়ার, তাই চোখের জল বুকের আগুনের জ্বালায় আপনে আপ শুকিয়ে যায়। নাহ, আমি কোন আদিম যুগের কথা বলছি না, বরঞ্চ আমার আজকের আলোচনার আবর্তে উপস্থিত আমার আপনার বড় ভালবাসার এই সোনার পশ্চিমবঙ্গ। তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে যে পশ্চিমবঙ্গ “সার্বিক অবক্ষয়” নামক মারণ কর্কট ব্যাধিতে আক্রান্ত।

ছবি: মানসী গুছাইত। এনার নামেই ঝাড়্গ্রামে ৪৫ একরের রিসর্ট।

এ বঙ্গে ধর্ষণ ছোট্ট ঘটনা, নারীর শ্লীলতাহানি মোটামুটি আইনসিদ্ধ অধিকার। সিন্ডিকেট রাজ, সন্ত্রাসবাদ ছোট ছেলেদের দুষ্টুমি। খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যদি না তা ছোট্ট ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। সরকার প্রদত্ত কুড়ি টাকা মূল্যের পাউচ বা চোলাইয়ে মৃত্যুর দাম ধার্য করা হয়েছে পরিবার পিছু দু লাখ টাকা। একমাত্র তৃণমূল করলেই মিলবে যোগ্যতার চরম পুরস্কার, বরাতজোরে মিলে যেতে পারে অসদুপায়ে যথেচ্ছ অর্থ উপার্জনের অধিকার সহ বঙ্গবিভীষণ অভিধা। কিন্ত কী হবে সে সকল স্কুল পড়ুয়াদের ভবিষ্যত, যাদের শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে চরম অশিক্ষিত দের হাতে? SSC CSC সহ সর্বক্ষেত্রে চুড়ান্ত বেনিয়ম অথচ প্রশ্ন তোলা যাবে না।

প্রশ্ন তুললেই অধিকারের সীমারেখা লঙ্ঘন, তাই লেলিয়ে দেওয়া হয় সরকারের দলদাসে পরিণত কতিপয় পুলিশ বাহিনীকে। চলতে থাকে অকথ‍্য গালাগাল সহ লাঠ্যৌষধি বর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের জীবদ্দশায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুবরণে বাধ্য করার জন্য কী মূল্য ধার্য করেছেন মাননীয়া? কী জবাব দেবেন সরকার বাহাদুর? এমন অজস্র প্রশ্ন আজ রাজ্যবাসীর দৈনন্দিন আলোচনার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে অথচ নির্মমতার মূর্ত প্রতীক মমতা দেবীর মুখে কুলুপ। আশ্রয় নিয়েছেন অদ্ভুত এক হিরণ্ময় নীরবতার।

তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশ্যে বলি, রাজনীতি করতে গেলে কি সত্যিই মানবতা, মানবিকতা, বিবেক, নীতি নৈতিকতা, সততা, আদর্শ সবকিছুই চিরতরে গঙ্গাবক্ষে বিসর্জন দিতে হয়? এত এত চোখের জল, হাহাকার, বুকফাটা আর্তনাদ কি আপনাদের হৃদয়ে সামান্যতম রক্তক্ষরণ ঘটায় না? কী জবাব দেবেন আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম কে? আপনাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কী কখনো এক মুহূর্তের তরেও একবুক প্রশান্তি এনে দেয় আপনাদের? এভাবে রোজগার করা কী আদৌ শ্লাঘনীয়, গর্ববোধ করেন? ন্যূনতম অপরাধবোধ লজ্জাবোধ কুড়ে কুড়ে খায় না আপনাদের হৃদয় কে? কী মনে করেন, এত মানুষের অভিশাপ, এত মানুষের হাহুতাশ, চোখের জল সবই কি বিফলে যাবে? যায় কখনো?

উপসংহারে বলি, আমি নিজেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ একজন অত্যন্ত তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক কর্মী। সাধারণ মানুষের রায়ে সম্ভবত আমরাও একদিন ক্ষমতাসীন হব। সরকার আসে, সরকারের পতন হয়, কালের আপন নিয়মেই আবারও প্রত্যাবর্তন হয়, এ সবই গনতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখানে নতুনত্ব কিছুই নেই, কিন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির একজন সক্রিয় ভূমিসংলগ্ন কার্যকর্তা হিসেবে আমার কায়মনোবাক্যে একটাই প্রার্থনা, “শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে, জয়লোভে যশোলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি, বীরের সদ্‌গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *