মিলন খামারিয়া
আমাদের ভারত, কলকাতা, ২৩ শে জানুয়ারি: কথায় আছে ‘বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি’। নিজেকে ভুলে থাকার দিক দিয়ে বাঙালির জুরি মেলা ভার। হাতে গোনা কিছু বিশেষ নাম ছাড়া বাঙালি তার সুসন্তানদের মনে রাখেনি। যেমন মনে রাখেনি প্যারীচরণ সরকারকে অথচ জন্ম দ্বিশতবর্ষে পদার্পণকারী, বাঙালির ইংরেজি শিক্ষার গুরু ছিলেন প্যারীচরণ সরকার। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা বই পড়ে ইংরেজি শিখেছিলেন।
শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, স্ত্রীশিক্ষার ও কৃষিশিক্ষার প্রসারণে অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ এ’হেন মনীষী আজ থেকে দু’শো বছর আগে ২৩ শে জানুয়ারি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই বাংলার বুকে, উত্তর কলকাতায়। তাঁকে স্মরণ করতেই আজ ‘দেশের মাটি’ গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি ওয়েবিনার আয়োজন করা হয়েছিল। আলোচনায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপিকা সঙ্গীতা সান্যাল, ড.ভক্তিপদ দলুই ও ড. সুমন চন্দ্র দাস।
ড. সঙ্গীতা সান্যাল জানান, প্যারীচরণ সরকার বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসে ইংরেজির অধ্যাপক হিসাবে প্রথম বাঙালির রচিত ইংরেজি প্রাইমার পড়েই আপামর বাঙালি একসময় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিল। বারাসতে প্রধানশিক্ষক থাকাকালীন ১৮৫০-এ তিনি লিখেছেন ‘ফার্স্ট বুক অফ ইংলিশ ফর নেটিভ চিলড্রেন’। ১৮৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলায় সাধারণ বাড়ির মেয়েদের জন্য বারাসাতে প্রথম প্রকাশ্য স্কুলের অন্যতম স্থপতি তিনি (যে স্কুল দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে বেথুন সাহেব পরবর্তীকালে কলকাতায় তৈরি করেন বেথুন স্কুল।) এমন একজন মনীষীকে স্মরণ করার জন্য ড. সান্যাল ‘দেশের মাটি’র উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
ড. ভক্তিপদ দলুই বলেন, “বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা যেভাবে সংবাদকে বিকৃত করে পরিবেশন করছে, তাতে সংবাদপত্রের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাচ্ছে। কীভাবে সত্য সংবাদ পরিবেশন করে সমাজের উপকার করা যায়, তা প্যারীচরণ সরকারের সম্পাদনা করা ‘এডুকেশন গেজেট’, ‘হিত সাধক’ এবং ‘Well Wisher’ পত্রিকাগুলো দেখে বর্তমানের সাংবাদিকদের শেখা উচিত।”

ড. সুমন চন্দ্র দাস বলেন যে, “আজ আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মদ বিক্রিতে প্রথম স্থান অধিকার করতে চলেছে। প্রায় ষোলো হাজার কোটি টাকা মদ বিক্রি করে আয় হবে সরকারের এই অর্থবর্ষে। সেখানে উনবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে প্যারীচরণ ‘সুরপান নিবারণী সভা’ স্থাপন করেছিলেন। আজ আমাদের ভাবতে হবে,আমাদের রাজ্য কোন দিকে চলেছে।”
প্যারীচরণ’কে শ্রদ্ধা জানাতে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শীর্ষ আচার্য একটি অসাধারণ চিত্র অঙ্কন করেন খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে। বটবৃক্ষরূপী শিক্ষাবিদ ও সনাতনী সমাজ সংস্কারক হিসাবে তাঁকে উপস্থাপন করা হয় চিত্রের মাধ্যমে।
ইডেন হিন্দু হোস্টেলের প্রতিষ্ঠাতা প্যারীচরণের জন্মের দু’শো বছর পূর্তিকে স্মরণ করে ‘দেশের মাটি’ দেশের অন্যতম সুসন্তানকে নতুন করে স্মরণ করল। এবছর ২৩ শে জানুয়ারি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিনের আবহে বাঙালি বিস্মৃত হয়েছিল ঊনিশ শতকীয় বঙ্গ-নবজাগরণকালীন এই শিক্ষাবিদ ও নারীশিক্ষার অগ্রদূতকে। মনে রাখতে হবে প্যারীচরণ যখন ১৮৪৭ সালে বারাসাতে কালীকৃষ্ণ মিত্র এবং তার অগ্রজ ডা. নবীনকৃষ্ণ মিত্রের সহযোগিতায় অ-মিশনারীদের দ্বারা তৈরি আধুনিক ভারতের প্রথম বিদ্যালয়টি স্থাপন করছেন, তখনও জন্মগ্রহণ করেননি স্বামী বিবেকানন্দ। যিনি নারীর উন্নতির কথা ভেবেছেন; স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন; এমনকি নারীর আদর্শের কথাও শুনিয়েছেন “হে ভারত, ভুলিয়ো না তোমার নারী জাতির আদর্শ।” নবজাগরণের পর্বে অন্যতম প্রয়োজন ছিল নারীমুক্তি। স্বামীজিও সেই কর্তব্যবোধ দ্বারা চালিত হয়েছিলেন। ভগিনী নিবেদিতাকে বালিকা বিদ্যালয় গঠনের উপদেশ দিয়েছেন। ১৮৯৮ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার বাগবাজারে যে বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। কলকাতার বাইরে এক মফস্বল শহরে তারও ৫১ বছর আগে প্যারীচরণ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রমাণ করে, তিনি সময়ের নিরিখে কতটা আধুনিক ছিলেন। আধুনিক ভারতবর্ষে কৃষিশিক্ষার বিদ্যালয় ও মডেল কৃষিফার্ম বারাসাতে গড়ে তুলে তিনি আর একটি অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। তাঁর এই কাজ দেখেই মসীজীবী-প্লাবিত বঙ্গদেশের বিদ্বজ্জনেরা অনুভব করলো কৃষিবৃত্তিকে ‘চাষার কর্ম’ বলে ঘৃণার চোখে দেখা উচিত নয়। ২৩ শে জানুয়ারি এমনই এক মনীষীর জন্মদিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী সংঘমিত্রা মিশ্র।

