অবৈধ ভাবে বালি তোলার জেরে বদলে যাচ্ছে নদীর গতি পথ, কাঁকসা ও বুদবুদে দামোদরের গ্রাসের মুখে শশ্মান-চাষজমি ও ঘরবাড়ি, আতঙ্কে এলাকাবাসী

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৩১ জুলাই: গ্রিন ট্রাইবুনালের নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বর্ষাকালেও অবৈধ উপায়ে অজয়, দামোদরে চলছে অবাধে বালি উত্তোলন। বালির বাঁধ দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে জলস্রোতের গতিপথ। আর তার জেরে বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। তাতেই ভাঙ্গছে নদীর পাড়। দামোদর নদের গ্রাসের মুখে শশ্মান, চাষজমি, শিবমন্দির সহ ঘরবাড়ি। ভাঙ্গনের আতঙ্কে ঘুম ছুটেছে, দামোদর তীরবর্তী কাঁকসার সিলামপুর, বুদবুদের শালডাঙা, মুন্সিপুর, শাঁকুড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের। 

পশ্চিম বর্ধমান জেলার দামেদর নদ তীরবর্তী কাঁকসা ব্লকের সিলামপুর, আইমা, নস্করবাঁধ, গলসি-১ নং ব্লকের বুদবুদের শাকুড়ি, শালডাঙা, মুন্সিপুর, ভরতপুর গ্রাম। দামোদর তীরবর্তী সিলামপুর মৌজার ওপর ও বুদবুদের শালডাঙ্গায় রয়েছে শশ্মান। তৎসংলগ্ন রয়েছে প্রাচীন মন্দির। সিলামপুর শশ্মানঘাট এলাকায় রয়েছে প্রাচীন শিবমন্দির। তাই ওই এলাকাটি শিবতলা নামে পরিচিত। আশপাশের আনন্দপুর, গাংবিল, নস্কারবাঁধ, মির্জাপুর সহ ৫ টি গ্রামের ৫ হাজারেরও বেশি বাসিন্দার একমাত্র শবদাহ করার শশ্মান। এবং বহু প্রাচীন ওই শিবতলা এলাকায় মকর সংক্রান্তিতে ৬ দিন ব্যাপি মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। প্রচুর জনসমাগম হয়। তেমনই শিবরাত্রি চৈত্র সংক্রান্তি পুজো, জৈষ্ঠ মাসে গাজন ও শ্রাবণ মাসে পুন্যার্থীদের ঢল নামে। আশপাশের পুন্যার্থীরা আসে। এক কথায় ওই শশ্মানঘাট ও শিবতলার আশপাশের মানুষের ভাবাবেগ জড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে দামোদরের গ্রাসে ওই শশ্মানঘাট ও শিবতলা। বিগত কয়েক বছর ধরে দামোদরের জলস্রোতে নদীর পাড় ক্রমশ ভাঙ্গতে শুরু করেছে। বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। গত বছরও প্লাবনে প্লাবিত হয়েছিল গোটা এলাকা। তার দরুন বিপন্ন ওই শশ্মাঘাট ও শিবতলা। একই সঙ্গে দামোদরের গ্রাসের মুখে আশপাশের প্রায় আড়াইশো পরিবারের ঘরবাড়ি। আবার বুদবুদের শাঁকুড়ি, শালডাঙা, মুন্সিপুর এলাকায় নদী তীরে রয়েছে প্রায় এক হাজার একর দু’ ফসলি কৃষিজমি। যেভাবে দামোদরের গতিপথ বদলে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, তাতে আশঙ্কা আগামী এক-দু বছরে আস্ত শশ্মানঘাট, শিবতলা, চাষজমি ও আশপাশের বাসিন্দারা দামোদরের গ্রাসে তলিয়ে যাবে। আর তাতেই চরম আতঙ্কে গ্রামবাসীরা। আর নদী ভাঙ্গনের কারণ হিসাবে অবৈধ উপায়ে বালি উত্তোলনকে দুষছে এলাকাবাসী। আর তার জেরে বিপন্ন চাষজমি।

সিলামপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান,”মাঝ নদীর বালি তুলতে গিয়ে বালি কারবারীরা নদীর জলস্রোতের গতিপথ ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বালির বাঁধ তৈরী করে জলস্রোত নদীর পাড় দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে। ফলে জলস্রোতের কবলে ভাঙ্গছে নদীর পাড়। যেভাবে নদীপাড় ভাঙ্গছে, তাতে শশ্মান শিবমন্দির ছাড়াও বহু চাষজমি, ঘরবাড়ি অচিরেই তলিয়ে যাবে। বহুবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।”

বাসিন্দারা জানান, “শশ্মান ও শিবমন্দিরে এলাকাবাসীরা ভাবাবেগ জড়িয়ে। নদীর ভাঙ্গনে তলিয়ে গেলে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের মানুষের শবদাহ করা সমস্যা হবে। তাই নদীরপাড় বাঁধানোর আবেদন জানিয়েছি।” শালডাঙা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, “যেভাবে অবৈধ উপায়ে বালি উত্তোলন হচ্ছে, তাতে দামোদরের গ্রাসের মুখে এক হাজারেরও বেশী চাষ জমি। বছরখানেকের মধ্যে নদী ভাঙ্গনে তলিয়ে যাবে। পাশাপাশি রনডিহা জলাধারে প্রভাব পড়বে।”

গ্রিনট্রাইবুনালের কড়া নির্দেশিকা রয়েছে, বর্ষায় কোনো রকম নদীগর্ভের বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ। এছাড়াও মেশিন দ্বারা কোনো ভাবে বালি তোলা যাবে না। দামোদর নদ বাঁকুড়া জেলার আওতায়। বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বর্ষায় দামোদরে কোনো রকম বালি তোলার অনুমতি নেই। তারপরও আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দামোদর নদের ওপর সিলামপুর, আইমা, শাঁকুড়ি, শালডাঙা ও মন্সিপুর ঘাটে অবাধে চলছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন। বুদবুদের শাঁকুড়ি, শালডাঙা ও মন্সিপুর ঘাটে প্রকাশ্যে ২০-২৫ ট্রাক্টরে চলছে বালি পাচার। আবার সিলামপুর আইমাঘাটে রাতের অন্ধকার নামতে নির্বিচারে চলছে বালি তোলার কাজ। একইরকমভাবে অজয় নদের ওপর কাঁকসার সাতকাহানিয়া, বাঁশতলা শ্মশানঘাট, জঙ্গলঘাট, পেয়ারাবাগান ঘাটে চলছে অবাধে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন। দশ চাকা থেকে ১৬ চাকার লরি ডাম্পার, ট্রাক্টরে বালি বোঝাই হয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে অবাধে যাতায়াত করছে। আর তার ফলে গ্রামে কংক্রিটের রাস্তার অচিরেই ভেঙ্গে পড়ছে। যাতায়াতের সমস্যায় পড়ছে সাধারণ মানুষ থেকে স্কুল পড়ুয়ারা। দামোদরের সিলামপুর, আইমা ঘাটে রাত ১০ টার পর ওইসব বালি বাঝোাই লরি, ডাম্পার পানাগড়ের ওপর দিয়ে উঠছে জাতীয় সড়কে। তারপর সোজা চলে যাচ্ছে কলকাতায়। এছাড়াও দিনে দুপুরে ৩০-৪০টি ট্রাক্টর বিভিন্ন ঘাট থেকে বালি সরবরাহ করছে। আবার রাতে কমবেশি ২০০- ২৫০ বালি বোঝাই ডাম্পার, লরি যাতায়াত করছে। ট্রাক্টর বোঝাই ওইসব বালি পানাগড়- সিলামপুর রোডের পাশে ও পানাগড় ও শালডাঙা ক্যানেলপাড়ে মজুত করা হচ্ছে। আবার সাতকাহানিয়া এলাকায় দিনভর ৩৫ টি ট্রাক্টরে বালি পাচার হচ্ছে। সেখানের জঙ্গলে ও মিলের মাঠে মজুত করা হচ্ছে বালি। সুযোগ বুঝে সেখান থেকে মজুত বালি লরি, ডাম্পারে পাচার হচ্ছে অন্যত্র।

কয়েকদিন আগে মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসনকে কাঁকসা ও বুদবুদের ওপর নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশিকাই সার। দুই জেলার কাঁকসা ও বুদবুদ দুই থানা এলাকা মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য। দুই থানার ওপর দিয়ে অবাধে চলছে অবৈধ বালি পাচারের রমরমা কারবার। লোকসান হচ্ছে রাজ্যের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব। বেপরোয়া অবৈধ বালি বোঝাই গাড়ির যাতায়াতে ভেঙ্গে পড়ছে গ্রামের রাস্তা। অতিষ্ট সাধারণ পথচলতি মানুষ থেকে স্কুল পড়ুয়া। ক্ষোভ বাড়ছে এলাকায়। দিনভর গ্রামের রাস্তায় বেপরোয়া ট্রাক্টর যাতায়াতে ঘুম ছুটেছে এলাকাবাসীর। কয়েকদিন আগে বেপরোয়া বালি বোঝাই ট্রাক্টর যাতায়াতের প্রতিবাদ করে মুন্সিপুর, বাউরি পাড়া ও শালডাঙা গ্রামের বাসিন্দারা। আর ওই প্রতিবাদের জেরে পাল্টা বালি মাফিয়াদের রোষানলে পড়ে গ্রামবাসীরা।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, গ্রামের রাস্তায় যেভাবে বালির গাড়ি যাতায়াত করছে, তাতে বড় ধরনের যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাড়ার রাস্তায় অনেক সময় ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে, আর তাতে অসাবধানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। সবক’টি বালি ঘাটের রাস্তার ওপর প্রাইমারি ও হাইস্কুল রয়েছে। গ্রামের একমাত্র সদর রাস্তা। তাই স্কুল পড়ুয়া থেকে সাধারণ মানুষের সবসময় যাতায়াত। বেপরোয়া বালির লরি, ডাম্পার যাতায়াতে আতঙ্কিত এলাকাবাসী। প্রশ্ন, বর্ষায় বালি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কিভাবে চলছে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন? ভূমি রাজস্ব দফতরের নজরদারি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

পশ্চিম বর্ধমান জেলা পরিষদের সহ সভাধিপতি সমীর বিশ্বাস জানান, “অবৈধ বালি উত্তোলন কোনো ভাবেই বরদাস্ত করা যাবে না। অবৈধ বালি পাচারে সরকারের রাজস্ব লোকসান হয়। তাছাড়া বর্ষায় নদী গর্ভে বালি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই পুলিশ ও ভূমি রাজস্ব দফতরকে আরও সক্রিয় হতে বলা হবে।” 

বাঁকুড়ার জেলাশাসক এ রাধিকা জানান, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *