আমাদের ভারত, ২৫ জানুয়ারি: রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য রাখেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মুখপাত্র আইনজীবী দেবজিত সরকার। এদিন বিজেপির সল্টলেক কার্যালয় থেকে তিনি রাজ্যের বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্যের শুরুতেই দেবজিত সরকার বলেন, বেলডাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতাকে উসকে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক মদতে দুষ্কৃতীদের উৎসাহিত করা হয়েছে। বেলডাঙার বাসিন্দা আলাউদ্দিন, যিনি এসআইআর-এর কারণে নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে, যখন বেলডাঙা থানার পুলিশ ঝাড়খণ্ডের পালামু জেলার বিশ্রামপুর থানায় যায়, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছিল—এবং উভয় রাজ্যের পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত করে। ইনকোয়েস্ট নথি পরীক্ষা করা হয় এবং অন-ক্যামেরা তদন্ত চালানো হয়। শুক্রবার যখন সহিংসতা শুরু হয়, তখন মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার (এসপি) সাংবাদিকদের রিপোর্ট কীভাবে করতে হবে তা শেখাতে ব্যস্ত ছিলেন। প্রথম দিন একজন মহিলা সাংবাদিককে শ্লীলতাহানি করা হয় এবং পরদিন একজন সাংবাদিক ও তাঁর চিত্র সাংবাদিককে মারধর করা হয় ও তাঁর ক্যামেরা ভাঙ্গচুর করা হয়।
এই প্রসঙ্গে দেবজিত সরকার বলেন, মুসলিম তোষণের জন্য তৃণমূল সরকার, প্রশাসনের একাংশ এবং একটি আন্তর্জাতিক চক্র পশ্চিমবঙ্গকে ‘ওয়েস্ট বাংলাদেশ’-এর একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ণের জন্য বহু মানুষ ইতিমধ্যেই রাজ্যে বসবাস করছে এবং এখন তাঁদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশের ১২টি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চললেও কোথাও বিডিও অফিসে আগুন লাগানো, পুলিশের ওপর আক্রমণ বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দমন-পীড়নের ঘটনা দেখা যায়নি। অন্য কোনও রাজ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ ও প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়।
বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে দেবজিত সরকার একটি ভিডিও দেখিয়ে বলেন, মুর্শিদাবাদের এসপি-র নির্দেশে বেলডাঙা থানার সাব-ইনস্পেক্টর তপস সরকার ঘটনাস্থলে যান এবং বিশ্রামপুর থানার সাব-ইনস্পেক্টর মোঃ আলম শেখের সঙ্গে কথা বলেন। ‘ঝাড়খণ্ডে একজন বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে’—এই গুজব ছড়িয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙ্গচুর করা হয় এবং প্রশাসন একটি বিশেষ মতাদর্শকে তোষণ করতে তা হতে দেয়। শুধু মুর্শিদাবাদের এসপি নন, মুখ্যমন্ত্রীও বলেন কেন তাঁরা শুক্রবার গিয়েছিলেন? কারণ সেদিন জুম্মার নমাজের দিন। এই সংক্রান্ত ঘটনা যে ঘটতে পারে এ বিষয়টি মুর্শিদাবাদ পুলিশের জানত, তবুও তারা নিষ্ক্রিয় থাকে। এটি একটি রাষ্ট্র-প্রযোজিত দাঙ্গা এবং একতরফা লুট ও অত্যাচার।
দেবজিত সরকার বলেন, দাড়িওয়ালা ওই ব্যক্তি কাসিম শেখ। ভিডিওটি তদন্তের স্বার্থে পুলিশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। কাসিম শেখের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা প্রায় ২৫ বছর আগে বেলডাঙা ছেড়ে চলে যান, কারণ সেখানে কোনও কাজ ছিল না এবং জীবিকার জন্য পরিযায়ী হতে হয়েছিল। কাসিম শেখ বলেন, “আমি এখানে ২৫ বছর আগে এসেছি, তখন এই অঞ্চলটি বিহারের অন্তর্গত ছিল। কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না এবং প্রশাসন মৃতদেহ নিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়; যে আঘাতের কথা বলা হচ্ছে, তা দু’বছর আগের। পশ্চিমবঙ্গে যে রিপোর্টগুলো চলছে, সেগুলো ভুল, স্যার।”
দেবজিত সরকার জানান, ঝাড়খণ্ড পুলিশ উল্লেখ করেছে যে ময়না তদন্তের পর প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যু কারণ ছিল আত্মহত্যা।
তিনি একটি রিপোর্টের উল্লেখ করে বলেন—মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারের নির্দেশে বেলডাঙা থানার সাব-ইনস্পেক্টর তপস সরকার ঝাড়খণ্ডের পালামু জেলার বিশ্রামপুর থানায় যান, বেলডাঙা- মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুর তদন্তে। তদন্তকালে স্থানীয় জেলা পুলিশের সহায়তায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয় এবং ওই এলাকায় বসবাসকারী ৮ থেকে ১০ জন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়। তাঁরা কেউই হত্যার কোনও ষড়যন্ত্রের কথা বলেননি। কাসিম শেখ—যিনি সিলিং ফ্যান থেকে আলাউদ্দিন শেখের দেহ নামিয়েছিলেন—তাঁর বক্তব্যও নথিভুক্ত করা হয় এবং তিনি কোনও হত্যাকাণ্ড বা সন্দেহজনক ঘটনার ইঙ্গিত দেননি। মৃতের চাচাতো ভাই এরশাদ শেখের বক্তব্যও নেওয়া হয়, এবং তাঁর বক্তব্যেও হত্যার কোনও ইঙ্গিত ছিল না। বেলডাঙা থানার আলাউদ্দিন শেখের পরিবারকে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত জানানো হয়েছে, ঠিক যেমন ঝাড়খণ্ডের তদন্ত দলের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। মৃতের পরিবার ও পালামু, ঝাড়খণ্ডে থাকা চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থাও করা হয়। পরিবার তদন্তের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট এবং তাদের আর কোনও অভিযোগ নেই। ময়না তদন্তের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে মৃত্যুর কারণ ছিল আত্মহত্যা। বিশ্রামপুর থানার এএসআই মো: আলম শেখ—যিনি ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট প্রস্তুত করেছিলেন—তাঁর বক্তব্যও নথিভুক্ত করা হয় এবং প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট সংগ্রহ করা হয়। বেলডাঙা থানার বিশেষ তদন্তকারী দল ও ঝাড়খণ্ডের পালামু জেলার যৌথ তদন্ত এবং ময়না তদন্তের রিপোর্ট থেকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে আলাউদ্দিন শেখের ওপর কেউ হামলা চালায়নি এবং তাঁর শরীরে কোনও শারীরিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুটিকে আত্মহত্যা বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেবজিত সরকার বলেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে মিথ্যা বয়ান ও গুজব ছড়িয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে বিভাজনের রাজনীতি করছে এবং বিজেপি এই ধরনের কার্যকলাপ ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার সহানুভূতির যোগ্য, কারণ বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই পশ্চিমবঙ্গে কাজের অভাব রয়েছে। এটি কোনও মিডিয়া ট্রায়াল নয়, বরং এমন একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে সহিংসতা ছড়ানো হয়েছে, যা আদৌ ঘটেনি— অর্থাৎ বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে কোনও পরিযায়ী শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে বলে মিথ্যা প্রচার। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী ও বিধায়করা দাবি করছেন যে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়া বা একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলার কারণে আলাউদ্দিন শেখ নিহত হয়েছেন—এ ধরনের বক্তব্য শুধু রাজ্যে বৈরী পরিবেশ তৈরি করছে না, রাজ্যকে গৃহযুদ্ধের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস জানে যে বাংলার মানুষ তাদের সঙ্গে নেই এবং ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় থাকবে না।

