অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১০ ডিসেম্বর: দক্ষিণ কলকাতার ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে পুরভোটের লড়াইয়ে কংগ্রেস প্রার্থী মৌমিতা মুখোপাধ্যায় (৩৮) প্রচারে মনীষীদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। যেদিন বাংলার যে মনীষীর জন্ম বা মৃত্যুদিবস সেইদিন সেই মনীষীর ছবি গলায় ঝুলিয়ে। মৌমিতা বলছেন, “এভাবেই বাংলার মনীষীদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। এটাই আমার প্রচারের অভিনবত্ব।”
ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এই ধরণের প্রচারে কেউ খুশি, কেউ অখুশি। স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা এই উদ্যোগ কীভাবে দেখছেন? ‘সুখবর’-এর সম্পাদক শমীকস্বপন ঘোষ এই প্রতিবেদককে জানান, “৪৮ নং বালীগঞ্জ প্লেসে বিপ্লবী জ্যোতিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের পারিবারিক বাড়ি, যা আজও রয়েছে। ড. পৃথ্বীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ভাইয়ের ছেলেরা থাকেন। তাই ভোট টানতে এই প্রচার কিনা জানি না। তবে ইতিহাস নতুনভাবে সাজানোর আজ সময় এসেছে। সশস্ত্র ও নিরস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আজ নতুন করে মূল্যায়ন দরকার। যাঁদের ত্যাগে আজ আমরা স্বাধীনতার বড়াই করি, তাঁদের অধিকাংশই উপেক্ষিত হয়ে মারা গেছেন। কেউ তাঁদের সম্বন্ধে জানার ন্যূনতম আগ্রহ দেখান না। এই পরিস্থিতি বদলানো তো ভালোই। ভারতীয়রা আসল ইতিহাস জানুন। পুরভোটের প্রচারে ঘরে-ঘরে এই চিন্তা চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারা শুভ লক্ষণ।“
বিপ্লবী-লেখক কালীচরণ ঘোষের পুত্র, অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার, স্বাধীনতা সংগ্রামের বর্ষীয়ান ইতিহাসবিদ শিবশঙ্কর ঘোষের কথায়, “বর্তমান যুগের ভোটারগণ অনেক পরিণত। প্রচারকারীর অভিনবত্ব ভোটারদের আকর্ষণ করতে পারে, প্রচুর হাততালি পড়তে পারে কিন্তু ভোটের দিন নিজের পছন্দমত পার্টির প্রার্থীই ভোটটি পাবেন। আমরা সবাই সুযোগ সন্ধানী বা বলা যেতে পারে স্বার্থপর। এছাড়াও দেখা গেছে, স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের লোক মন্ত্রী হলেও তাঁরা চুপচাপ থাকতেই ভালবাসেন বা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিষয়ে আলোচনা করতে লজ্জা পান। মোট কথা, জনসাধারণের সহানুভূতি পেলেও ভোট আদায় করার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।“
বারাকপুরের গান্ধী সংগ্রহশালার অধিকর্তা-সচিব প্রতীক ঘোষ জানান, “এটা ভোটের ময়দানে কতটা সঠিক জানি না। আমি যেহেতু একটা সংগ্রহশালা পরিচালনার দায়িত্বে আছি, কোনও মতামত জানানো অসুবিধাজনক।“

অধ্যাপক-গবেষক, স্বাধীনতা সংগ্রাম বিষয়ক চারটি গ্রন্থের প্রণেতা শুভেন্দু মজুমদারের মতে, “নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়ে যে কোনও প্রার্থী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক রকম পন্থা পদ্ধতি নেন। কেউ রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খান, কেউ বস্তির ঘরে ঢুকে মানুষের অভাব অভিযোগের কথা শোনেন। মানুষ তথা ভোটাররা অভিভূত হন প্রার্থীর আচরণে। স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের নিয়েও এমন অনেক কিছু করা হয় যার থেকে মনে হতে পারে , রাজনৈতিক নেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল। তবু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ও প্রেসিডেন্সি জেল সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, বারুইপুরে স্থানান্তরিত। অথচ এই জেলদুটিকে নিয়ে সেলুলার জেলের মতো জাতীয় স্মারক গড়ার যে গণদাবি উঠেছে তার সাথে কোনও রাজনৈতিক দলই এখনও পর্যন্ত সহমত পোষণ করেনি। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতির আবশ্যিক অঙ্গ হল গিমিক। এটা ছিল, আছে ও থাকবে।“
ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা প্রয়াত সুনীতি চৌধুরীর (ঘোষ) কন্যা, বরিষ্ঠ অধ্যাপিকা ডঃ ভারতী সেনের মতে, “খবরটা খারাপ লাগল। আমার মা-সহ কয়েকজনের স্মৃতিতে একটি পার্ক তৈরি করতে গিয়ে যা অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে এই সব কাউন্সিলারদের নিয়ে গল্প লেখা যায়। ছবি নিয়ে ঘুরে ভোট ভিক্ষা, বিপ্লবীদের নাম ভাঙানো— এ সব নিজের সুবিধার জন্য। মহিলা ইতিহাস কতটা জানেন জানি না।“
চন্দননগরের সরকারী বি. এড. কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক, লেখক ড. বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে বলেন, “এটা ভালো। কারণ এর মাধ্যমে ঐতিহ্যের স্মরণ হয়। নাগরিকদের অতীত ঐতিহ্য স্মরণ করানো প্রয়োজন যে ঐতিহ্যে আত্মদান আছে, কাটমানি খাবার প্রবনতা নেই।“

