রঘুপতি সারেঙ্গী
আমাদের ভারত, ২০ মার্চ: “মহতঃ প্রিয়াং প্রাণং হি দেহিনাম।”
মানুষ বললে হয়তো একটু ভুলই বলা হবে, জীব মাত্রেই সে তার জীবনকেই ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। এটাই আপ্তবাক্য হলেও দূরদর্শনের পর্দায় চোখ পড়লেই একের পর এক মৃত্যু–কখনো তার শিকার কোনো বাম-কর্মী, কখনো তৃণমূলপন্থী কেউ বা ভারতীয় জনতা পার্টির কোনো তরতাজা সদস্য! ভোট আসবে, ভোট যাবে–আপ্তবাক্য কিন্তু চিরকালই সত্য থেকে যাবে।
আদৌ সমর্থনযোগ্য না হলেও বলতে দ্বিধা নেই, মহাভারতের যুগেও এরকম দুঃখজনক ঘটনার ভুরি-ভুরি নজির আছে।
স্বর্গ-রাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র ছলনার আশ্রয় নিয়ে বৃত্রাসূরকে বধ করলেন। আর তারপরে এই অনুতাপের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পাপমুক্ত হতে, পানা- ভর্তি পুকুরের নিরালা নিবেশে অখন্ড তপস্যা করতে শুরু করলেন। রাজ্যে তো আর রাজা’র আসন শূণ্য থাকবে না। তাই, যযাতি
বংশের নহুশকে রাজা নির্বাচন করা হল।
রাজা হলেই তো মুহূর্তে মতি-গতি, ধ্যান-ধারণা, কামনা-বাসনা, লোভ–লালসা সবই বদলে যায়। এখানেই বা ব্যাতিক্রম হবে কেন?
মহারাজের দৃষ্টি পড়লো ইন্দ্রজায়া শচী’র ওপর। শচী সবিনয়ে জানালেন, তিনি এক বছরের জন্য এক ব্রত শুরু করেছেন। তাই, নহুশ এর আহ্বানে সাড়া দেওয়া সম্ভব নয়–আর উচিৎ ও নয়। কিন্তু বর্ষশেষে রাজা’র আহ্বান আসার আগেই পতিব্রতা শচী শর্তসাপেক্ষে নহুশকেই আহ্বান করে বসলেন। কী সেই শর্ত? শর্ত এটাই,
প্রথম মিলনের দিনটিকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখতে তিনি যেন সপ্তর্ষিকে বাহক বানিয়ে পালকি চেপে আসেন। অহঙ্কারী নহুশ এর কাছে এটাকে অবলা এক নারী’র অতি তুচ্ছ এক আবদার বলেই মনে হল। রাণীর উষ্ণ আহ্বান পেয়ে উতলা রাজা কালমাত্র বিলম্ব না করে সপ্তর্ষি’র উদ্দেশ্যে ডাক পাড়লেন। পালকি সাজল। রাজা আসন গ্রহন করতেই অদক্ষ বাহকের কাঁধে পালকি চলতে শুরু করলো। গতি শ্লথ হওয়ায়, অধৈর্য রাজা অগস্ত্য মুনি’র মাথায় লাথি মেরে বিরক্তির সুরে বললেন, “সর্প- সর্প”। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের এতো বড় অপমান? ক্রুদ্ধ ঋষির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, ” যাও রাজা, সর্প যোনিতেই জন্ম নাও।”
সম্বিত ফিরলে, রাজা কাতর-কন্ঠে ঋষি’র কাছে জানতে চাইলেন, তাঁর সর্প-জন্ম থেকে মুক্তির পথ। “সন্ত-হৃদয় নবনীত সমানা।” কিছুটা শান্ত মনে এবার ঋষি জানালেন, মুক্তি পাবেন রাজা কিন্তু কিছু প্রশ্নের সদুত্তর দানের মাধ্যমে।
ঋষি-বাক্য ব্যর্থ হওয়ার যে নয়! তাই, বিশালাকার এক অজগর সাপ হয়ে দ্বৈতবনের এক গুহাতে আশ্রয় নিতে হল তাঁকে।
এদিকে, পঞ্চপান্ডব এর তখন বনবাসের আর মাত্র একটি বছর বাকি। বাড়ি ফেরার তাড়াতে ঘুরতে ঘুরতে গন্ধমাধন পর্বত। গন্ধমাধন হয়ে বদ্রীকাশ্রম…..সুবাহুনগর…..
হয়ে বিশাখযুগ। এরই পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরস্বতী নদী। তারই তীরে দ্বৈতবন। এখানেই ভ্রমণরত
“পঞ্চপান্ডব”।
মাসলম্যান ভীমসেন সদর্পে, নিছক শখের বসেই অহরহ বন্য-পশু হত্যা করেই চলেছেন। যুধিষ্ঠির অপ্রয়োজনে হত্যাকে বাধা দিলেও তিনি তা ভ্রুক্ষেপ করলেন না। শিকারের নেশায় গভীর বনপথে হাঁটতে হাঁটতে অজান্তেই সেই বিশাল অজগরের গুহামুখে পৌঁছানো মাত্রই রক্ত-চক্ষু, হলুদ বর্ণের রাজকীয় সেই বিশাল অজগর চোখের পলকেই ভীমের কোমর সজোরে জড়িয়ে ধরল। দিক-দিশা হারিয়ে ভীমসেন তখন ত্রাহি-ত্রাহি ডাক পাড়তে মৃত্যুর দোরগোড়ায়। বারবার হা-হুতাশের মধ্যে জোরে-জোরে বলেই চলেছেন, “দৈবমেবম্ পরমন্যে পুরুষার্থো নিরর্থকঃ” ( পুরুষার্থ বিফল হলে দৈবকৃপাই একমাত্র সম্বল)।
এদিকে, অনেক্ষণ দেখতে না পেয়ে দ্বিতীয়-পান্ডবের খোঁজে সারা বন জুড়ে তন্ন-তন্ন করে খোঁজ চলছে। শেষমেষ, যুধিষ্ঠির মহারাজের চোখে পড়লো, মৃত্যু-পথযাত্রী ভাইকে।
পূর্ব-প্রতিশ্রুতি মতোই যুধিষ্ঠির মহারাজ এর সাথে শুরু হল অজগর (নহুশ) এর প্রশ্নোত্তর পর্ব।
একসময়ে, যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেনঃ
“ব্রুহি কিম্ উত্তম কর্ম ভবেৎ গতিরুত্তমঃ “(মানুষের উত্তম গতির জন্য তার কেমন কর্ম করা উচিৎ)?
নহুশ উত্তরে জানালেন,
“পাত্রে দত্বা প্রেয়ান্ যুক্তা সত্যমুক্তা চ ভারতঃ।
অহিংসা নিরতঃ সত্য স্বর্গং গচ্ছেৎ ইতি মতির্মম।”
…. সৎপাত্রে দান, সত্য ও সুমিষ্ট ভাষণ এবং অহিংসা পূর্ণ জীবন-যাপন অমৃতময় স্বর্গ-পথ এর দিশা দেয়।
প্রশ্ন-উত্তর পর্ব এখানেই শেষ নয়।
কথা উঠলো, সত্য এবং দান এর মধ্যে কোনটি শ্রেয়? অহিংসা ও প্রিয়-ভাষণ এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতর কোনটি? এক বাক্যে এর উত্তর খোঁজা সত্যিই কঠিন।
সাধারন মানের সাহিত্যের সারবত্তা Ethics হলেও মহাভারত এর মতো উচ্চ-স্থিতির সাহিত্যে…Ethical dilema ই শেষ কথা।
আর আমাদের জীবনটাও চলে এই Ethical dilema এবং Ethical compromise এর মাধ্যমেই। একসময়ে ইহুদিরা নাজিদের মেরে-কেটে শেষ করে দিচ্ছিল। প্রাণভয়ে জনা ৫০-৬০ নাজি সৈন্য রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে পালানোর চেষ্টা করছিল। বাধ সাধলো, সঙ্গে থাকা এক যুবতী মেয়ের কোলে থাকা বাচ্চার কান্না! কী আর করা যাবে? শিশুটির ঘাড় মুচড়ে কান্না থামিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পালিয়ে যাওয়া তখনকার মতো সম্ভব হোল। কিন্তু, জানা যায়, পরবর্তীতে সবাই এঁরা একে একে পাগল হয়ে গেছিলেন।
প্রশ্ন হোল, তাহলে ঠিকটা কী ছিল?
জীবনে কখনো মনে হয়, এটাই ঠিক। কখনো মনে হবে, এটাও ঠিক, ওটাও ঠিক। আবার এমনও কোথাও মনে হতে পারে, এটা ঠিক নয়, কিন্তু জরুরী। আসলে, কাজের ফলটাই যে শেষ কথা, কিনা।
“কষ্মাচিৎ দান যোগাধি সত্যমেব বিশিষ্যতে “..… কোথাও সত্যের স্থান দানের ওপরে, কোথাও দানের স্থান সত্যের ওপরে। সিদ্ধান্ত নেবে শুধুই শান্ত-সমাহিত মন। জীবনমুখী এই জটিল প্রশ্নোত্তর পর্বের পরে দিব্য-শরীর পেয়ে স্বর্গের পথে পাড়ি দিলেন রাজা নহুশ আর জীবিত ভাইকে ফিরে পেয়ে খুশি মনে ফিরে গেলেন মহারাজ ঠিকই কিন্তু কোথাও যেন উত্তর এর রেশ একটু রয়েই গেল।

