আমাদের ভারত, ২৮ এপ্রিল: রাজ্যে প্রতিদিন ঘটে চলা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার মৌলালী যুব কেন্দ্রে এক ধিক্কার সভার আয়োজন করা হয়। নারী নিগ্রহ বিরোধী নাগরিক কমিটির আহ্বানে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের বক্তব্য রাখেন।
উদ্যোক্তা সংগঠনের সম্পাদিকা কল্পনা দত্ত বলেন, “নারীকে ‘হয় দেবী না হয় দাসী’ এভাবে না দেখে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে সমাজে গণ্য করতে হবে। এরপর যখনই এমন নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে এবং মুখ্যমন্ত্রী তাকে আড়াল করার চেষ্টা করবেন আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের সামনেই ধর্না দিতে চলে যাব এবং যেজেলায় ঘটবে সেই জেলার প্রশাসনিক প্রধান ডিএম-দফতরে হাজির হব।”
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার বলেন, অপরাধী কেউ থাকেনা, অপরাধী হিসাবে গড়ে তোলা হয়। পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসার পর একজন মহিলা নেত্রীকে আমরা দেখলাম যিনি একটা ধারণার পরিবর্তন করলেন যে ক্ষমতায় পুরুষ মহিলা যিনিই আসুন না কেন ক্ষমতা ভোগ করার জন্য নারীদের উপর নির্যাতনের কোন অভাব নেই। নাগরিক সমাজের বেশিরভাগ মাথাকে তিনি তাঁর পদতলে মাথা নত করিয়েছেন। এটাও একটা পরিবর্তন। তিনি ‘আমি’ ব্যাধিতে ভুগছেন। তিনি যা করেন, যা বলেন তা সঠিক। একজন নারী হয়েও নারীদেহ নিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া তিনি বন্ধ করতে পারলেন না। আমাদের ভয় মুক্ত হতে হবে, তার জন্য আজ যারা ‘ভয়’ দেখাচ্ছে তাদেরকেও ভয় দেখাতে হবে। আমাদের সেই ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
বাস্কেটবলের জাতীয় কোচ অনীতা রায় বলেন, “আজকের যেকোন নিউজ চ্যানেলের প্রাইম নিউজ হচ্ছে কতজন ধর্ষণ হয়েছে, আবার তারও প্রকারভেদ আছে। একজন ধর্ষণ করেছে, না গণধর্ষণ। সমস্ত পাশবিক অত্যাচারের যদি রেকর্ড নেওয়া হত তাহলে একটা এনসাইক্লোপিডিয়া হত। আমার মেয়েও ধর্ষিত হতে পারে, আপনার মেয়েও হতে পারে। আজ এই রাজ্য যেখানে পৌঁছেছে। হাজরা থেকে যখন আসছিলাম, দেখছিলাম। একদিকে দুর্গোৎসবের জন্য এখন থেকে কলকাতাকে ঝাঁ চকচকে করে সাজানো হচ্ছে। অথচ নারী ধর্ষণের উৎসব চলছে পাশাপাশি। মদ, মহিলা ও মানি – এই তিনটেই আজ এরাজ্যে দুয়ারে। আমাদের আজ জয় করতেই হবে। এই প্রতিজ্ঞা আমাদের নিতে হবে।
মহিলা ফুটবলের জাতীয় কোচ কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার বলেন, “পরিবারের মধ্যেই মেয়েদের ধর্ষিতা হতে হয়, অন্তঃসত্ত্বা হতে হয়, এমনকি সন্তানের জন্মও দিতে হয় – এমনই দেশে আমরা বাস করি। আমাদের ভয় পেলে চলবে না। মেয়েদের আমাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে করে তারা বিপদে পড়লে রুখে দাঁড়াতে পারে। প্রত্যেক মেয়েকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকেও সেই দায়িত্ব নিতে হয়।”
মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা সুজাত ভদ্র বলেন, “নারীকে সমাজে কীভাবে দেখব সেটা গুরুত্বপূর্ণ। নারীকে দেখে পুরুষরা মনে করে ‘চল মজা করি’। নারীরা কি মজার জিনিষ? আবার ব্যক্তি পুরুষ নয়, রাষ্ট্রের দ্বারা সংগঠিত ধর্ষণ হয়, তা আরও ভয়ঙ্কর। তার বিরুদ্ধেও আমাদের দাঁড়াতে হবে। জাপান-কোরিয়া যুদ্ধে জাপানী মহিলাদের কমফোর্ট গার্ল হিসাবে ব্যবহার করেছিল। রাষ্ট্র ও নারীকে এইভাবে দেখতে শেখায়, সম্পদ হিসাবে দেখতে শেখায়। আদালতে যখন মামলা ওঠে তখন ক্ষতিগ্রস্তকে যে ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় অভিযুক্তের উকিলের দ্বারা তা অমানবিক। শাসক রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বৃত্তদের সহযোগিতা করতে হয়, দুর্বৃত্ত পুষতে হয়, লালন পালন করতে হয়, তাকে ব্যবহার করতে হয়। আমাদের লড়াই অনেক গভীর।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রাক্তন ফুটবলার সূর্যবিকাশ চক্রবর্তী বলেন, মেয়েদের লড়াই করার মত শক্তি ও তেজ দিতে হবে। এই অপরাধীদের পিছনে অর্থবল থাকে। অপরাধীরা নেতা মন্ত্রীর কাছে যায়, টাকার বিনিময়ে তাদের আশ্রয় কিনে নেয় শাস্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য।
বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী বলেন, নারী নির্যাতন তো আজ ঘটছে না, স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্র তাঁর স্ত্রীর প্রতি কী আচরণ করেছেন, আর মানুষ রামমোহন নারীদের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়েছেন। নারী নিগ্রহের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল নারীরা করলে হবে না, গোটা সমাজকে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নূপুর ব্যানার্জী বলেন, ছোটবেলা থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তুমি নারী। পুত্র সন্তানকে বোঝাতে হবে বড় হয়ে নারীদের প্রতি কী আচরণ করতে হবে। কন্যা সন্তানকে বোঝাতে হবে বড় হয়ে আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে হবে। বাবা-মাকে পরিবারের মধ্যে এই দায়িত্ব নিতে হবে। নারীকেও বুঝতে হবে সে কবে মানুষ হবে।
ধিক্কার সভার সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সুদীপ্ত দাশগুপ্ত। উপস্থিত ছিলেন হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী পার্থসারথি সেনগুপ্ত।

