আশিস মণ্ডল, রামপুরহাট, ২৪ মার্চ: নৃশংস হত্যাকাণ্ড বললেও মনে হয় ঠিক বলা হবে না। কারণ ছোট ছোট দুই ভাই বোনের সামনেই তাদের নানীকে দুষ্কৃতীরা কুপিয়ে কুপিয়ে মেরেছে। তারপর জীবন্ত অবস্থায় তার গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর এই দুই শিশুকেও খুন করার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করে দুষ্কৃতীরা। প্রাণ ভয়ে দুই ভাইবোন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে পালায়। সেদিনের সেই লোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী এই দুই শিশু।
গত মঙ্গলবার রামপুরহাটের বকটুই গ্রামে ঘটে গেছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে আটজনকে, এখনো বেশ কয়েকজন হাসপাতলে ভর্তি রয়েছে। কিন্তু সঠিক ভাবে জানাযায়নি কতজন ভর্তি আছে। শুধু পুড়িয়ে মারা হয়নি আগুনে পোড়ানোর আগে তাদের প্রত্যেককে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে অথবা কেউ আধমরা হয়েছিলেন। তারপর তাদের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সেদিন রাতেই সন্ধ্যারাতে খুন হয়েছিলেন তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভাদু সেখ। তারপরেই বাগটুই গ্রামে নেমে আসে দুষ্কৃতীদের ধ্বংসলীলা। পরপর বোমাবাজিতে কেঁপে ওঠে এলাকা। এরপর বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এক এক ঘরে ঢুকে বাড়ির লোকজনকে কোপাতে থাকে। এই ঘটনার সাক্ষী ছোট্ট দুই শিশু, একজনের বয়স ৯ বছর আরএক জনের বয়স ৭ বছর। ৯ বছরের রাজ সেখ এবং ৭ বছরের রাজিয়া খাতুন মায়ের কোলে বসে শোনাল কীভাবে তাদের নানীকে (দিদিমা) কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে। দুই শিশু তখন ঘরের ভেতরে ছিল। দুষ্কৃতীরা এসে প্রথমে তার নানা অর্থাৎ দাদুর খোঁজ করে। দাদুকে না পেয়ে এবার তার নানী’কে কুড়ুল দিয়ে কোপাতে শুরু করে। ছোট্ট রাজিয়া জানায়, তার নানীকে মাথায়, ঘাড়ে পায়ে কুড়ুল দিয়ে কোপাতে থাকে। সেইসময় রাজিয়া আর তার দাদা রাজ দুজনেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কিন্তু দুষ্কৃতীরা তাদের কথা শোনেনি।
রাজিয়া জানায়, তাদের ঘরে ঢুকেছিল ৩ জন দুষ্কৃতী। কুড়ুলের পর পর কোপে তাদের নানী মাটিতে পড়ে যায়। দুষ্কৃতীরা ভাবে মরে গেছেন। এরপর দুষ্কৃতিরা চলে যায়। সেই সময় দুই ভাইবোন ঘর থেকে বেরিয়ে তার নানীর কাছে যায়। রাজিয়ার দাদা ৯ বছরের রাজা জল নিয়ে তার নানীর মুখে দেয়, তখন তিনি চোখ খোলেন। ঠিক তখনই গেটের কাছ থেকে আবার রাজিয়া ছুটে এসে জানায় ওরা আবার আসছে। দুই ভাইবোন তাদের নানীকে বলে, চলো আমরা পালিয়ে যাই। কিন্তু নানী ওঠার চেষ্টা করেও দাঁড়াতে পারেননি। তখন নানী বলেন, তোরা পালা, না হলে তোদেরও মেরে ফেলবে। দুই ভাইবোন তখন অন্ধকারে লুকিয়ে পড়ে। দুষ্কৃতীরা যখন ঘরে ঢুকছিল তখন তাদের নানী কোনওরকমে সিঁড়িতে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুষ্কৃতীরা এসে তাঁকে ফেলে দেয়। তারপর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন লাগানোর পর দুষ্কৃতীদের মনে পড়ে যে দুটো শিশু আছে। তখনই তারা খোঁজ করে। বলে ওই সাক্ষীদের মেরে ফেলতে হবে।

এই কথা শুনে অন্ধকারের মধ্যে দুই ভাইবোন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু পালাবে কোথায় রাজ এবং রাজিয়া যেদিকেই যায় সেদিকেই দেখি দেখে দুষ্কৃতিরা রয়েছে। গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছিল তারা। দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে দুই ভাইবোন একটা নির্মীয়মান বাড়ির বাড়ির একপাশে অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল। আতঙ্কে সারারাত তারা সেখানেই ছিল।
রাজা এবং রাজিয়ার মা মাফুজা বিবি এবং তার স্বামী দুজনেই কর্মসূত্রে মুম্বই থাকেন। ঘটনার খবর পেয়ে গতকাল রাতেই বাড়ি ফিরেছেন। দুই ছেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাদের মুখ থেকেই শুনেছেন তাঁর মাকে কিভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে তারপর পেট্রোল ঢেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তিনি জেনেছেন দুষ্কৃতীরা প্রথমে তারদের বাড়ি ঢুকে তার মাকে কুপিয়ে পাশেই তার চাচার বাড়িতে যায়। সেখানে তার চাচা চাচিকে কুপিয়ে আধমরা করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাঁর চাচি(কাকীমা) সেই অবস্থায় সাঁইথিয়ায় তার এক মেয়েকে ফোন করে বলেন, আমাদের আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেললো, বাঁচাও। তারপর তিনি তাঁর বাবাকেও ফোন করে বলেন, আব্বা বাঁচাও। কিন্তু কেউ আসেনি। এইভাবে আটটি মানুষ ধীরে ধীরে আগুনে পুড়ে মারা যান। ঝলসে যায় তাদের দেহগুলো। সেই সেই ঝলসানো মানুষগুলোর মধ্যে দুটি শিশুও ছিল।
মাফুজা বিবির জানিয়েছেন, আরো কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা প্রমাণ লোপাটের জন্য তাদেরও খুন করতে পারে। সাংবাদিকদের কাছে তাঁর অনুরোধ, আপনারা কিছু করুন। তাঁর অভিযোগ এই মূল ঘটনার জন্য দায়ী তৃণমূল নেতা লালন সেখ। তারই নেতৃত্বে এই হত্যালীলা চলেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, এলাকার ব্লক সভাপতি আনারুল হোসেনের বিরুদ্ধেও। কারণ তাকে আশঙ্কার কথা বারবার জানিয়ে কোনো ফল হয়নি। এমনকি তৃণমূলের জেলা নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জানিয়েছিলেন। মাঝে মাঝেই তাদের হুমকি দেওয়া হতো। এলাকায় পুলিশ পাহার ছিল। সেই অবস্থাতেও তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে আত্মীয়-স্বজনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তিনি বিচার চাইছেন। কিন্তু পুলিশের ওপর তাঁর ভরসা নেই। বলেন, পুলিশ কিচ্ছু করেনি, তাদের সামনেই তো আমার মাকে খুন করেছে, আমার চাচা চাচিকে খুন করেছে। এই পুলিশের কাছ থেকে আমরা বিচার পাব না।

