পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ৬ জানুয়ারি: চাকরি না করেও সরকারি কলেজ থেকে দু’বছর ধরে বেতন তুলছেন এক মহিলা। অবাক করা এই ঘটনায় রীতিমতো হুলুস্থূল কান্ড দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুরে। যে ঘটনায় কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে টিচার ইনচার্জ। গঙ্গারামপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক দেবব্রত দাসের বিরুদ্ধেই উঠেছে টাকা নয়ছয় সহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ। যদিও ওই অধ্যাপকের দাবি, মিথ্যে অভিযোগে তাকে ফাঁসানোর চক্রান্ত হচ্ছে।
জানাগেছে, গঙ্গারামপুর কলেজের সরকারি তহবিল নয়ছয়, অবৈধ নিয়োগ সহ একগুচ্ছ দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় একমাস আগে ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক দেবব্রত দাসকে আচমকাই সরিয়ে দেয় কলেজের গভর্নিং বডি। যার পরিবর্তে ওই চেয়ারে বসানো হয় সজল সরকারকে। যিনি এর আগেও কয়েকবছর টিচার ইনচার্জের পদ সামলেছেন। তবে এবারে ওই চেয়ারের দায়িত্বভার কাঁধে নিতেই কার্যত চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক সজল সরকারের। যা প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো হইচই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাতে।
বৃহস্পতিবার কলেজের গভর্নিং বডির মিটিংয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক সজল সরকারের করা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্বতন টিচার ইনচার্জ দেবব্রত দাসের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি ও বেনিয়মের কথা। যার মধ্যে অন্যতম হিসাবে উল্লেখ রয়েছে, কলেজের তহবিল থেকে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা নয়ছয়ের কথা। উল্লেখ করা হয়েছে, অন্বেষা ঘোষ নামে এক কর্মীকে নিয়োগ করবার কথা। খাতায় কলমে তিনি নিয়োগ না হলেও দু’বছর ধরে তাকে কলেজ তহবিল থেকে নিয়মিত বেতন প্রদান করেছেন ততকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক দেবব্রত দাস। একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে অর্থাৎ গভর্নিং বডির অনুমতি না নিয়েই ১৩ জন ক্যাজুয়াল কর্মীকে কলেজে নিয়োগ করবার বিষয়ও। শুধু তাই নয়, কলেজের ভূগোল বিষয়ের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সুদেব সাহার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা ভুয়ো টিএ বিল দেখিয়েছেন অধ্যাপক দেবব্রত দাস বলে অভিযোগ। পদমর্যাদা অনুযায়ী যার টিএ বিল পাবার কথা না থাকলেও, কিভাবে তার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা টিএ বিল করা হল সে বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে। কলেজের ক্যান্টিন কর্মী গৌরী মণ্ডলের বেতন মাসের পর মাস পেমেন্ট দেখানো হলেও, বিল পাননি ওই মহিলা। যা নিয়ে অধ্যাপক দেবব্রত দাসকে গৌরী মন্ডল জানাতে গেলে তাকে অপমানিত করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে। দেবব্রত দাসের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, মধুসূদন শীল নামে এক কর্মীকে নিয়োগ করার জন্য ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, কলেজের যাবতীয় লেনদেন অসংগতিপূর্ণ রয়েছে তার আমলে, এমনটাও উল্লেখ করা হয়েছে সেই চিঠিতে। তার বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে, গভর্নিং বডির সদস্য তথা প্রফেসর ভবরঞ্জন রায়কে ভুয়ো বিলে সই করবার জন্য একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
টিচার ইনচার্জ সজল সরকারের করা এমন চিঠি সামনে আসতেই কার্যত প্রকাশ্যে এসেছে ওই কলেজের সরকারি টাকা হরির লুটের ঘটনা। যা নিয়েই কার্যত কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন পূর্বতন টিচার ইনচার্জ দেবব্রত দাস। কিন্তু পাহাড় প্রমাণ এই দুর্নীতির পরেও কেন তার বিরুদ্ধে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি গভর্নিং বডির সভাপতি তা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। তবে কি এই ঘটনার পেছনে শুধুমাত্র পূর্বতন টিচার ইনচার্জ দেবব্রত দাসই জড়িত? না আরো বড় কোনো চক্র রয়েছে? যা নিয়েই এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে গঙ্গারামপুর শহর সহ গোটা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাতে। যদিও এই দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যে বলে দাবি করেছেন পূর্বতন টিচার ইনচার্জ দেবব্রত দাস।
গঙ্গারামপুর কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি গৌতম দাস জানিয়েছেন, এসব কলেজের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যা নিয়ে তদন্ত চলছে। এখনই পুরোপুরিভাবে কারো বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলার জায়গা আসেনি।
পূর্বতন টিচার ইনচার্জ তথা অভিযুক্ত দেবব্রত দাস জানিয়েছেন, মায়ের অসুস্থতায় জিবির অনুমোদনের ঋণ নিয়েছিলাম। তা শোধ করতে একটু সময় লাগছিল ঠিকই, কিন্তু জিবির অনুমোদনেই আবার তা শোধ করা হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যে। ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে আমাকে।
জেলা তৃণমূলের সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল জানিয়েছেন, আমিও শুনেছিলাম ওই কলেজের দুর্নীতির বিষয়ে। যদিও পুরোপুরি খোঁজ নেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

