জয় লাহা, আমাদের ভারত, দুর্গাপুর, ১৫ আগস্ট: অখণ্ড ভারত। একই সঙ্গে নবপ্রজন্মের মধ্যে হিন্দুত্ববোধ জাগ্রত করা। আর সেই লক্ষ্যে পঞ্চ কেদার ও পঞ্চ প্রয়াগ পরিভ্রমন। তারপর স্বাধীনতা দিবসে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু শিব মন্দির তুঙ্গনাথে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন দুর্গাপুরের এক বিজেপি কর্মী।
সুব্রত ঘোষ। দুর্গাপুরের বিধাননগরের বাসিন্দা। নয়ের দশক থেকে সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। এবং সক্রিয় বিজেপি কর্মী। বিজেপি করায় একাধিকবার অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তিনি। দফায় দফায় তাঁর খ্যাতনামা পানের দোকান ভাঙ্গচুর করা হয়। এমনকি তার গাড়িতেও হামলা হয়েছে। তবুও তিনি দমেননি।
গত ২০১৭ সালে দুর্গাপুর পুরভোটে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস তৃতীয়বার জয়ী হয়। ওইবছর ফলাফলের দিন রাত থেকে রাজ্যজুড়ে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা ঘটে। দুর্গাপুর শহর ছাড়াও পান্ডবেশ্বর, জামুড়িয়া, লাউদোহা, কাঁকসা, আউশগ্রাম, ডায়মন্ডহারবার সহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত হয় বিজেপি কর্মীরা। ঘরবাড়ি ভাঙ্গচুর, জ্বালিয়ে দেওয়া-সহ মহিলাদের ওপর পাশবিক অত্যাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ হিংসায় বেশি আক্রান্তের শিকার হয় হিন্দুরা। আতঙ্কে গ্রামছাড়া হতে হয়েছিল বহু পরিবারকে। শেষ পর্যন্ত, হিংসার ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতির ওপর আদালতে মামলা দায়ের হয়। দুর্গাপুর ছাড়াও আশপাশের এলাকায় আক্রান্ত দলীয় কর্মীদের পাশে ছুটে গেছেন বিজেপি কর্মী সুব্রত ঘোষ।

গত বছর জুলাই মাসে রাজ্যের আক্রান্ত দলীয় কর্মী তথা হিন্দুদের মঙ্গল কামনায় দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ পরিভ্রমন করেন সুব্রতবাবু। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনের পাশাপাশি রূদ্রাভিষেক করেন তিনি। তবে এবারে তিনি পঞ্চ কেদার ও পঞ্চ প্রয়াগ পরিভ্রমন করেন। গত ৩ আগস্ট বাড়ি থেকে রওনা দেন সুব্রত ঘোষ। তার সঙ্গে ছিলেন বিজেপি যুব মোর্চার প্রাক্তন জেলা সভাপতি বীরবল রুইদাস। পঞ্চ প্রয়াগ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি অভিব্যক্তি যা বিশেষ করে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গাড়োয়াল হিমালয়ের পাঁচটি পবিত্র নদীর সঙ্গমকে বোঝানো হয়। সংস্কৃতে প্রয়াগ অর্থ “নদীর মোহনার স্থান”।
পাঁচটি প্রয়াগ হল উৎপত্তি ক্রমানুসারে বিষ্ণুপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ এবং দেবপ্রয়াগ। এছাড়াও পঞ্চকেদারগুলি হল কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, কল্পেশ্বর, রুদ্রনাথ আর তুঙ্গনাথ। প্রথমে তিনি পঞ্চ কেদারের উদ্দেশ্যে কেদারনাথ যান। সেখান থেকে বৈদ্যনাথ ধাম, কল্পেশ্বর, মদমহেশ্বর, রুদ্রনাথ যান। তারপর স্বাধীনতা দিবসের দিন তুঙ্গনাথ যান তিনি। তুঙ্গনাথ উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিব মন্দির। এবং পঞ্চ কেদারের অন্যতম। এর উচ্চতা ১২০৭৩ ফুট।
পঞ্চকেদার নিয়ে একটা জনশ্রুতি আছে। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধর পর পান্ডবরা যখন পাপের আগুনে পুড়ছেন তখন তারা ঠিক করেন যে ভ্রাতৃহত্যার পাপ মোচন করতে তারা শিবের পুজো করবেন। সেই ইচ্ছায় শিবের সন্ধানে তারা বারাণসীতে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু মহাদেব ধরা দিতে রাজি হননি। তাই মহাদেব একটি ষাঁড়ের রূপ ধারণ করে হিমালয় পর্বতমালার, উত্তরাখন্ডের গুপ্তকাশীতে চলে যান। পান্ডবরাও তাকে নানা জায়গায় খুঁজতে খুঁজতে উত্তরাখন্ডে এসে হাজির হয়। এদিকে শিবও এ পাহাড় ও পাহাড়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলেন। একইসঙ্গে পিছনে পিছনে ধাওয়া করলেন পান্ডবরা। যেখানে যেখানে পান্ডবরা ষাঁড় রূপী শিবকে ধরেও ধরতে পারেনি। অর্থাৎ, কোথাও লেজ ধরেছে, কোথাও শিং ধরেছে। কিন্তু শিব তবু পিছলে পালিয়ে গিয়েছেন। সেই স্থানগুলিই পঞ্চকেদার নামে পরিচিত হয়। তুঙ্গনাথকে তৃতীয় কেদার বলা হয়।
তুঙ্গনাথ বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু শিব মন্দিরগুলির মধ্যে একটি। এটি উত্তরাখণ্ড রাজ্যের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার পাঁচটি পঞ্চ কেদার মন্দিরের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু। এখানকার পর্বতমালা মন্দাকিনী ও অলকানন্দা নদী উপত্যকা তৈরি করেছে। এটি ৩৬৯০ মি: উত্তলোচন্দ্রশীলার চূড়ার একটু নিচে। এখানে মহাকাব্য মহাভারতে পাণ্ডবদের পটভূমি রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের দিন সকালে তুঙ্গনাথ মন্দির প্রাঙ্গনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তারপর সেখান থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
সুব্রতবাবু তাঁর অভিজ্ঞতা ও উদ্দেশ্যর কথা বলেন, “গোটা শ্রাবণমাস ১৫ দিনের সফর ছিল। উদ্দেশ্য অখন্ড ভারত ও নব প্রজন্মের মধ্যে হিন্দুত্ববোধ জাগ্রত করার বার্তা ছিল এই ভ্রমনে।” তিনি আরও বলেন,
“যেভাবে আমার উদ্দেশ্য শুনে সেখানের মানুষ সম্বর্ধনা দিয়েছে তাতে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে। এই পরিভ্রমনে সেখানে আগত পূন্যার্থীদের আতিথেয়তায় আপ্লুত।”

