আশিস মণ্ডল, সিউড়ি, ১২ আগস্ট: দেবর্ষি নারদের পরামর্শে রত্নাকর দস্যু রাম নাম জপ করে বাল্মীকি হয়েছিলেন। তেমনি একইভাবে এক সময়ের ত্রাস বীরভূমের ভগীরথ বাদ্যকর নিজের ভুল বুঝতে পেরে মূল স্রোতে ফিরেছেন। এখন নিজেই গান গেয়ে মানুষকে দস্যুবৃত্তি থেকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছেন। কারণ বাস্তব জীবনে তিনি উপলব্ধি করেছেন, তাঁর পাপের ভাগীদার হয়নি কেউ। এমনকি যে রাজনৈতিক দলের হয়ে বোমাবাজি করতে গিয়েছিলেন তারাও সরে গিয়েছিল ভগীরথের পাশ থেকে। যেমনটা ঘটেছিল রত্নাকরের ক্ষেত্রে।
কাঁকরতলা থানার সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ ভগীরথ বাদ্যকর। এক সময় ছিলেন এলাকার ত্রাস। তার অত্যাচারে সিঁটিয়ে থাকত এলাকার মানুষ। এলাকায় তোলাবাজি, খুন, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের মাধ্যমে এলাকায় নিজের পতিপত্তি বিস্তার করেছিলেন। কোনও এক দিন বোমাবাজি করতে গিয়ে তার হাতেই ফেটে গিয়েছিল বোমা। কিন্তু এ সময় পাশে পাননি কাউকে। যে রাজনৈতিক দলের হয়ে বোমাবাজি করছিলেন তারাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেই থেকেই জীবনের মানে পাল্টে গিয়েছিল ভগীরথের। বুঝতে পেরেছিলেন যেমন রত্নাকর দস্যুর পরিবার তাঁর পাপের ভাগীদার হয়নি, তেমনি তার পাশে দাঁড়ায়নি কেউই। সেই অভিজ্ঞতা তাকে বিপথ থেকে সরিয়ে মূল স্রোতে ফিরিয়ে এনেছে।
এখন নিজের গলায় গান বেঁধেছেন, ‘বোমা বাঁধা কেউ শিখবি না জগতে, মস্তানগিরি করলে বাবা, ঠাঁই হবে জেলেতে’। এমনই গান গেয়ে দু’পয়সা আয় করে সংসার চালাচ্ছেন ভগীরথ বাদ্যকর। তাঁর সঙ্গে কথা বলে অনেক উত্থানপতনের গল্প শোনা গেল।
সালটা ১৯৭৮। বয়স তখন মেরে কেটে ১৬ বছর। সামাজিক পরিস্থিতি এবং চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট তাকে মস্তান বানিয়েছিল। সে সময় বোমা বেঁধে সন্ত্রাস করে এলাকাকে অশান্ত রেখে নিজের জীবনে সুখ শান্তি খুঁজছিলেন তিনি। অর্থ উপার্জন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু শান্তি পাননি। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলের হয়ে ভাড়াটে সন্ত্রাস করেছি। ঘন ঘন বোমার শব্দে সন্ত্রস্ত করে রেখেছিলাম এলাকাকে। কিন্তু কোনও দিন শান্তিতে বাড়িতে থাকতে পারিনি। পুলিশের ভয়ে ছিলাম বাড়ি ছাড়া। এক সময় বোমা ছুঁড়তে গিয়ে হাতেই বোমা ফেটে যায়। দু-তিন বছর ধরে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে একটি হাত খোয়াতে হয়। সে সময় পাশে পাইনি যাদের হয়ে বোমাবাজি করতে গিয়েছিলাম তাদেরও।”

সেই উপলব্ধি থেকেই মূল স্রোতে ফিরেছেন ভগীরথ। বলেন, “দস্যুবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা খুব সহজ কাজ ছিল না। কারণ দুর্ঘটনা থেকে কিছুটা স্বভাবিক ছন্দে ফেরার পর ফের অন্ধকার জগতের হাতছানি ছিল। ছিল মোটা টাকার অফার। কিন্তু রত্নাকর দস্যু থেকে বাল্মীকির গল্প শোনার পর আর মস্তানিতে ফেরার ইচ্ছে হয়নি। এখন যাতে কেউ মস্তানি না করেন সেই গান বেঁধে বাসে ট্রেনে গেয়ে দু’পয়সা আয় করে সংসার চলছে। তাতে কিছুটা আর্থিক সমস্যা রয়েছে ঠিকই, তবে শান্তিও রয়েছে। পরিবার নিয়ে রাতে বাড়িতেই ঘুমোতে পাচ্ছি। যে পুলিশ এক সময় ধরতে আমার বাড়িতে আসত এখন তাঁরাই আমার গান শুনতে আসছে বাড়িতে। আশ্বাস দিয়েছেন সাহায্যের।”
বর্তমানে তথ্য সংস্কৃতি দফতর থেকে লোকশিল্পীর পরিচয়পত্র পেয়েছেন। পাচ্ছেন ভাতা। ইতিমধ্যে কাঁকরতলা থানার ওসি জাইদুল ইসলাম যোগাযোগ করেছেন ভগীরথের সঙ্গে। জাইদুল ইসলাম বলেন, “কাঁকরতলা থানা এলাকায় কিছু বোমা উদ্ধার করেছিলাম। সেই বোমা নিষ্ক্রিয় করার জন্য খবর দেওয়া হয়েছিল দুর্গাপুরের বোমা বিশেষজ্ঞ দলকে। সেই বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় গ্রামের অনেক মানুষ এসেছিলে। তাদের সঙ্গে এসেছিলেন ভগীরথও। সেইদিনই তাকে দেখে আমি বিষয়টি অনুভব করেছিলাম। এরপর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত ঘটনা জানতে পারি। বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে আপনার থানা আপনার পাড়ায় অনুষ্ঠানে তাকে গান গাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি। প্রতি রবিবার তাকে বিভিন্ন পঞ্চায়েতে নিয়ে গিয়ে বোমা নিয়ে খেলা না করার উপর সচেতনতা মূলক গান গাওয়াচ্ছি।”

