পুরুলিয়ায় ভাদু পুজোর জৌলুস নেই, খাজা- গজা- মিঠাই- জিলিপির বাজার দারুণ

সাথী দাস, পুরুলিয়া, ১৬ সেপ্টেম্বর: কোভিড পরিস্থিতির পর পুরুলিয়ায় ভাদুপুজোর চিত্রটা ভীষণ ভাবে ম্লান। মানুষ জন যেন নমঃ নমঃ করেই স্মরণ করছেন দেবীকে। বিক্রি কম প্রতিমার। সেভাবে বসছে না ভাদু গানের আসরও। তবে, ভাদু পুজো উপলক্ষে তৈরি খাজা, গজা, মিঠাই, জিলিপির বাজার দারুণ।

জেলার প্রধান লোক উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম হল ভাদু পুজো। বহু শতাব্দী ধরে সাবেক মানভূম জেলায় ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে পূজিতা হন লৌকিক দেবী ভদ্রাবতী বা ভাদু। এই পুজো নিয়ে নানান কিম্বদন্তী শোনা যায়। তার মধ্যে সব থেকে বেশি যেটি প্রচলিত তা হল- অনেকে বলেন কাশিপুরের পঞ্চকোট রাজপরিবারের কন্যা ছিলেন ভদ্রাবতী। আদর করে তাকেই ভাদু বলে ডাকা হতো। ভাদু শৈশব থেকেই ছিল ভক্তি পরায়না। সেই ভাদুর মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যু হয় জলে ডুবে।

আবার কেউ কেউ বলেন, ভাদু যৌবন প্রাপ্তা হলে রাজা তাঁর বিয়ের ঠিক করেন। বিয়ে করতে আসার পথে ডাকাতদের হাতে মারা যান তার ভাবী স্বামী। একথা শুনে আত্মঘাতী হন ভদ্রাবতী। আদরের কন্যার এই মর্মান্তিক পরিনামে একেবারে ভেঙে পড়েন কাশিপুরের মহারাজ। মেয়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি প্রচলন করেন ভাদু পুজোর। যা পরবর্তীকালে সমগ্র পুরুলিয়া জেলা তথা রাঢ়বঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। প্রামাণ্য নথি পাওয়া না গেলেও অনেকের বিশ্বাস ভাদু ফসলের দেবী। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ধান রোয়ার কাজ শেষ হলে প্রায় গোটা ভাদ্র মাস ধরেই বাড়িতে ভাদু গানের চর্চা করেন মহিলারা। অতীতে কাশিপুরের রাজ বাড়িতে রাগাশ্রয়ী সংগীতের মাধ্যমে ভাদুর আরাধনা করা হতো। এখন তা লোকায়ত সংগীতের রূপ নিয়েছে। টুসুর মতই এই গানের মধ্যে ফুটে ওঠে মানুষের ছোটখাটো আশা আকাঙ্খা ও দৈনন্দিন দু:খ দুর্দশার কথা। বহু আগেই ভাদু পুরুলিয়ার সমাজ জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ হয়ে ওঠে।

সাবেক মানভূম জেলাই হল আজকের পুরুলিয়া। শারদোৎসবের আগে বলতে গেলে এই ভাদু পুজোর মধ্য দিয়ে উৎসবের মরসুম শুরু হয়ে যায় পুরুলিয়ায়। সারা জেলার মানুষ মেতে ওঠেন ভাদু গানে। ভাদুর জন্য জেলার সব মিষ্টির দোকানে প্রস্তুত করা হয় বিশেষ ধরনের খাজা, গজা ও লাড্ডু।

এবার কিন্তু চিত্রটা অন্যরকম। কোভিড পরিস্থিতির কারণে ভাটা পড়েছে মানুষের রোজগারে। স্বভাবতই প্রভাব পড়েছে স্থানীয় আবেগ জড়ানো পরবে। বলতে গেলে নমঃ নমঃ করেই এবার পার হচ্ছে ভাদু পরব। গ্রাম থেকে শহর যেখানে হাজার ভাদু প্রতিমা বিক্রি হয়, এবার শিল্পীরাই প্রতিমা বানিয়েছেন নাম মাত্র।

পুরুলিয়া শহরের প্রতিমা শিল্পী উত্তম সূত্রধর জানালেন সেই কথা। শিল্পী বলেন, গত চল্লিশ বছর ধরে মূর্তি গড়ার সঙ্গে যুক্ত তিনি। অনান্য বছর যে পরিমাণ ভাদু প্রতিমা গড়ে থাকেন এবার তার অর্ধেকেরও কম গড়েছেন তিনি। পুরুলিয়া জেলার মিষ্টান্ন শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাদু পুজোর অন্যতম বড় অঙ্গ হল দেবী মূর্তির সামনে নানান মিষ্টান্ন দিয়ে সাজানো থালা। এছাড়াও এদিন প্রত্যেক বাড়িতে বিশেষ ভাবে তৈরি করা খাজা, গলা এবং জিলিপি খাওয়া হয়। অতিকায় জিলিপি দেখার জন্য রীতিমত ভিড় জমে যায় সাধারণ মানুষের। এবার মিষ্টান্ন ব্যাবসায়ীরা অবশ্য আগের মতো মিষ্টি প্রস্তুত করেছেন। বিক্রিও ভালো হয়। আসলে, ভাদু পরবে মেতে ওঠার ধরন বদলে মিষ্টি খাওয়ায় দিকে ঝোঁক বেশি হয়ে গিয়েছে বলে জানান অভিজ্ঞ প্রবীণ মিষ্টি বিক্রেতা। নবীন প্রজন্মের কাছে যেন গুরুত্ব হারাচ্ছে ভাদু পুজো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *