অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ১৭ জুন: ফেসবুকে অক্ষর ‘শুদ্ধ বানান ও ভাষা চর্চা’ গ্রুপে ‘শব্দের উৎস সন্ধানে’ ‘বিশেষজ্ঞ’ তকমাপ্রাপ্ত স্বপন ভট্টাচার্য লিখেছেন, “সসেমিরা মানে কী? অভিধান খুললে পাওয়া যাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা হতবুদ্ধি অবস্থা। কিন্তু এই শব্দটির প্রকৃত অর্থ কি তাই? তার আগে বুঝে নিতে হবে যে এটা কি আদৌ কোনও শব্দ?
আসলে ‘সসেমিরা’ শব্দকে একটি শব্দসংক্ষেপ বলা চলে। যেমন, ইংরেজিতে কিলোগ্রাম না লিখে লেখা যায় kg. কিলোর k আর গ্রামের g। অথবা আর এক ধরনের সংক্ষেপণ হয় – feet না লিখে লেখা হল ft.। তবে ‘সসেমিরা’ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য এক ধরনের সংক্ষেপ। এখানে চারটে শ্লোকের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি হয়েছে এই শব্দ।
কী সেই শ্লোক তা বিস্তারিত বলার আগে ওই শ্লোকগুলির উৎস সম্পর্কে কিছু বলা যাক। মহাকবি কালিদাসের ‘দ্বাত্রিংশৎ পুত্তলিকা’য় আছে যে রাজা নন্দর ছেলে জয়পাল একবার গভীর জঙ্গলে গিয়ে বাঘের মুখে পড়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে অন্য কোনও উপায় না দেখে সে একটা গাছে আশ্রয় নিয়ে দেখে যে সেখানে এক বিশাল ভালুক বসে আছে। জয়পাল অত্যন্ত ভয় পেয়ে যায়। তখন ভালুকটি তাকে বলে যে তোমার কোনও ভয় নেই। তুমি আমার শরণাগত, তাই তোমাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। ক্লান্ত অবসন্ন রাজপুত্র জয়পাল বলে যে তার ঘুমের অত্যন্ত প্রয়োজন। ভালুকটি তাকে বলে যে এই গাছের উপর তুমি ঘুমিয়ে পড়লে নিচে পড়ে যেতে পার। তুমি বরং আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়। জয়পালের আর কোনও উপায় ছিল না। নিচে বাঘটি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। সে ভালুকটির কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। জয়পাল ঘুমিয়ে পড়লে বাঘ ভালুককে বলল, ‘তুমি ওকে ঠেলে ফেলে দাও। আমি ওকে খেয়ে এখান থেকে চলে যাব।’ ভালুকটি এই প্রস্তাবে রাজি হয় না। বলে যে রাজপুত্র আমার শরণাগত, তাই তাকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। এই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আমি মহাপাতক হতে চাই না।
কিছুক্ষণ পর জয়পালের ঘুম ভাঙলে ভালুক বলে এবার তুমি বসে পাহারা দাও। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। ভালুক ঘুমিয়ে পড়লে বাঘ জয়পালকে বলল যে তুমি যদি ভালুকটাকে ঠেলে গাছ থেকে ফেলে দাও তাহলে আমি ভালুকটাকে খেয়ে এখান থেকে চলে যাব। জয়পাল বাঘের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভালুকটিকে গাছ থেকে ঠেলে ফেলে দেবার চেষ্টা করে। কিন্তু ভালুক কোনও রকমে গাছের ডাল ধরে নিজেকে বাঁচিয়ে নেয়। জয়পালকে অভিশাপ দিয়ে সে বলে যে তুমি এখন থেকে ‘সসেমিরা’ ‘সসেমিরা’ বলতে বলতে পথে পথে ঘুরবে আর যখন তুমি ‘সসেমিরা’ শব্দের মানে বুঝতে পারবে তখনই হবে তোমার মুক্তি।
এবার সেই চারটে শ্লোকের কথা বলি। সেই সংস্কৃত চারটি শ্লোক বাংলা করলে দাঁড়ায়:
শ্লোক নং ১ – স- সদ্ভাবে সম্মিলিত সুহৃদ ব্যক্তিকে বঞ্চনা করে কী নৈপুণ্য প্রকাশ হয়েছে? যার কোলে বসে তুমি গভীর নিদ্রায় মগ্ন তাকে বধ করলে কি পৌরুষলাভ হতে পারে?
শ্লোক নং ২ – সে – সেতুবন্ধ রামেশ্বর ও গঙ্গাসাগর সঙ্গমে গেলে ব্রহ্মহত্যার পাপও দূর হয়, কিন্তু বন্ধুদ্রোহী ব্যক্তি কোথাও মুক্তি লাভ করতে পারে না।
শ্লোক নং ৩ – মি – মিত্রদ্রোহী, কৃতঘ্ন ও বিশ্বাসঘাতক এই তিনজন প্রলয়কাল পর্যন্ত নরক বাস করে।
শ্লোক নং ৪ – রা – রাজন! আপনি যদি নিজের ছেলের কল্যাণ কামনা করেন, তবে দ্বিজগণকে দান ও দেবতাদের আরাধনা করুন।
এরপর কীভাবে জয়পালের শাপমুক্তি হয়েছিল সেই বর্ণনা বিস্তারিত আছে। তবে শব্দের উৎসের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক না থাকায় সেগুলো আর এখানে বলছি না।
***

