বাংলা চর্চা ৩৮। হ্রস্ব ই আর দীর্ঘ ই

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৭ জুন: ‘ই ঈ বসে খায় ক্ষীর খই’— সহজ পাঠের সেই সুন্দর ছন্দ আমাদের সবার মনে গেঁথে আছে। হ্রস্ব ই আর দীর্ঘ ই নিয়ে আমাদের প্রায়ই বিভ্রান্তি হয়। ফেসবুকে ‘অক্ষর শুদ্ধ বানান ও ভাষা চর্চা’ গ্রুপের অ্যাডমিন স্বপন ভট্টাচার্যের ‘বানানের টিপস্‘ পেশ করছি আপনাদের কাছে।

‘বাড়ি/বাড়ী, পাখি/পাখী, কুমির/কুমীর’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন, “অনেকেই প্রশ্ন করেন যে বাড়ী, পাখী এই সমস্ত শব্দের বানান হঠাৎ করে বাড়ি, পাখি এভাবে লেখা হচ্ছে কেন? এর উত্তরে বলা যায় যে এই পরিবর্তন হঠাৎ হয়নি। আমার যতদূর মনে হয় যে রবীন্দ্রনাথ‌ই বোধ হয় এই ধরনের বানান লেখা শুরু করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বভারতীর নির্দেশ‌ও ছিল তাই। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার সমিতি নির্দেশ দেয় শব্দ অতৎসম হলে সেগুলো ই-কার বা ঈ-কার দুইভাবেই লেখা চলবে। অর্থাৎ বাড়ি অথবা বাড়ী যে কোনও একটা লিখলেই চলবে। কিন্তু বছর কুড়ি আগে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং প্রায় একই সময়ে ঢাকা বাংলা একাডেমি নির্দেশ দিয়েছে যে বানানের সমতা রক্ষা করতে গেলে অতৎসম শব্দে শুধু হ্রস্বস্বর অর্থাৎ ই-কার দেওয়াই ঠিক হবে। যদিও দু-একটি শব্দে, যেমন: কাহিনি, চিন ইত্যাদি, আকাদেমি আবার বিকল্পের সন্ধান দিয়ে রেখেছে। আবার চাবি অর্থে ‘কি’ লেখার সময় ‘কী’ লেখার পরামর্শ দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় যে বিকল্পের সন্ধান দেওয়া মানেই বানানের সমতা রক্ষা না করার পরামর্শ। তাই বানানের সমতা যদি রক্ষা করতে বিকল্প বানান রাখা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নয়।

সে যাই হোক, এখন প্রশ্ন কোনটা তৎসম শব্দ আর কোনটা নয় তা আমরা বুঝব কীভাবে? এটা কিন্তু খুবই সমস্যার। “রানি’ শব্দটা নিয়েই আলোচনা করা যাক। এই শব্দটা কেউ যদি লেখেন ‘রাণী’ তাহলে আমার মনে হবে যে এটা তৎসম শব্দ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা তো নয়। ‘রাজ্ঞী’ তৎসম হলেও ‘রানি’ তৎসম শব্দ নয়। তার মানে আমাকে তৎসম শব্দ চিনতে লেখক বা কম্পোজিটার/প্রুফ রিডার এঁদের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।

অতৎসম শব্দে স্ত্রীবাচক ঈ ব্যবহার না করে সবগুলো‌ই ই-কার দিয়েই লিখতে হবে। যেমন: কাকি, খুড়ি, খান্ডারনি, চাকরানি, ঠাকুরানি, বামনি, মাসি, পিসি, মামি, সোহাগি ইত্যাদি।

জীবিকা, ভাষা, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জাতি এই সব শব্দে শুধু ই-কার থাকবে। যেমন: ওকালতি, জমিদারি, মোক্তারি, ডাক্তারি, আরবি, ইংরেজি, হিন্দি, মালয়ালি, কাশ্মীরি, মারাঠি, আকালি, কংগ্রেসি, ইরানি, ওড়িশি, বাঙালি ইত্যাদি। এ ছাড়াও দেশি, বিদেশি, মরমি, মরসুমি, বন্দি, দরদি, মুলতুবি, রাজি, বাজি এগুলো‌ও ই-কার দিয়েই লিখতে হবে।

তবে মনে রাখতে হবে ‘ঈয়’ প্রত্যয় থাকলে কিন্তু ঈ-কার দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর তাই আমরা লিখব ইরানীয়, অস্ট্রেলীয়, দেশীয়, এশীয়, ইউরোপীয় ইত্যাদি।“
***

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *