যসের প্রভাবে উপকৃত কৃষককুল, পরম্পরা মেনে ‘রোহিণী’ পালন করে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন ধান চাষ শুরু পুরুলিয়ায়   

সাথী দাস, পুরুলিয়া, ২৮ মে: করোনা আবহের মধ্যেই পরম্পরা মেনে ‘রোহিণী’ পালন করে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন ধান চাষ শুরু হল পুরুলিয়ায়। যসের প্রভাব পূর্বাভাস অনুযায়ী পড়েনি এই জেলায়। বরং টানা ঝির ঝিরে বৃষ্টি যেন সাপে বর হয়েছে অন্তত ছোট নাগপুর মালভূমির অন্তর্গত এই জেলায়। আমন চাষের পক্ষে জমি তৈরিতে খুব উপযোগী হয়ে উঠল এই বৃষ্টি। তাই শুক্রবার সকাল থেকে কৃষকদের উৎসাহ দেখা গিয়েছে মাঠে।

কথায় আছে বাঙালিদের বারো মাসে তে’র পার্বণ। যে কোন শুভ কাজের সূচনা ঘটা করে উৎসবের আঙিনায় আনাই হচ্ছে বাঙালিদের রেওয়াজ। তাই, বিশেষ করে রাঢ় বাংলায় আমন চাষের বিজধান ফেলাকে ‘রোহিণী’ নাম দিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান করে শুরু হয়ে গেল ধান চাষের প্রাথমিক পর্ব। গ্রাম বাংলার অন্যতম এই জেলাতেও  ১৩ জৈষ্ঠ্য শুক্রবার, ‘রোহিণী’ দিনে বীজ ধান খেতে ছড়িয়ে আষাড়ি ফল মুখে দিয়ে কৃষকরা পরম্পরা মেনে চাষের কাজ শুরু করলেন।

পুরুলিয়া জেলার বৃষ্টি নির্ভর আমন ধানের চাষ শুরু হয়ে যায় জৈষ্ঠ্য মাসের মাঝা মাঝি থেকে। গ্রাম্য মানুষের বিশ্বাস রোহিন দিনে বীজ ধান ছড়ানো উচিত। তাহলে, ফলন ভাল হয়। এটা আজ রীতি বা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বংশ পরম্পরায় এই বিশেষ রোহিনীর দিনে চাষের কাজ শুরু করলেন তাঁরা। সাধারণত বৃষ্টি নির্ভর এবং বছরে একবার মাত্র চাষ হওয়ার দরুন প্রস্তুতি নিয়েই কৃষিজীবী মানুষ রোহিন উৎসবে মেতে উঠেন। এদিনই জমিতে লাঙল বেয়ে বীজধান ছড়ান তাঁরা।

পুরুলিয়ার দুই নম্বর ব্লকের কৃষক হলধর মাহাতো, কাশীপুরের বিবেক মাহাতো বললেন, “এটা আমাদের বিশ্বাস এই দিনে বীজ শোধন করে চারা তৈরি করলে রোগ পোকা মাকড়ের উপদ্রপ কম হয়। তাই, এই দিনে সব চাষীরাই নিয়ম রক্ষার বীজ ধান জমিতে ফেলেন।” জেলার বিভিন্ন গ্রামে একই চিত্র দেখা গেল। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে মহিলারাও চাষের এই শুভ কাজে যোগ দিতে। কৃষক পরিবারের প্রৌঢ়া রমলা মাহাতো বললেন, বাড়ির দেওয়ালের চারি দিকে গোবরের দাগ দেওয়া হয় যাতে বিষধর সরীসৃপ বাড়ির মধ্যে না প্রবেশ করতে পারে। এই রেখা বন্ধন আজও বিশ্বাসের সঙ্গে মেনে থাকি। আমন ধানের চাষ আজও প্রাচীন প্রথা মেনেই চলছে পুরুলিয়ায়। সংস্কার মেনে জৈব সারের মাধ্যমে জমির উৎকর্ষ বাড়িয়ে মাটি তৈরি করেন কৃষকরা। সারা বছর গোবর এক জায়গায় জড়ো করে তা চাষের কাজে ব্যবহার করেন তাঁরা। আর প্রাকৃতিক নিয়মে সেই জমিতে বীজ বপন করা হয় বর্ষা শুরুর আগে।

এই রোহিণীর দিনেই গ্রাম বাংলায় আমন চাষের সূচনা হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। সেই প্রথা আজও রয়ে গিয়েছে কৃষকদের মনে। আর তাই, তে’র পার্বনের অন্যতম এই রোহিণীর বা রোহণী। এবার যেন উৎসবের আনন্দের মাঝে খানিকটা নিরাশ করেছে করোনা পরিস্থিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *