“বিপন্ন বাংলার পরিবেশ বদলাতে সক্রিয় হোন”, ডাক পরিবেশবিদদের

আমাদের ভারত, ৪ জুন: ‘পরিবেশ দিবস’-এর প্রাক্কালে “বিপন্ন বাংলার পরিবেশ বদলাতে সক্রিয় হোন”, এই আবেদন সামনে রেখে একটি কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ৯৪ টি পরিবেশ সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগের পক্ষ থেকে।

রবীন্দ্রসরোবরের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করছেন সমীর বসু। তিনি জানান, “বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন আজ সারা পৃথিবীর কাছে প্রধান বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। মুনাফা কেন্দ্রিক সভ্যতা আজ পৃথিবীর সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করতে চলেছে। জল-জঙ্গল-জমি- সমস্ত কিছুই আজ আক্রান্ত। কিছু মানুষের অতিরিক্ত ভোগবিলাসের জীবনযাপন আর মুনাফার পাহাড় বানাবার প্ৰচেষ্টায় কোটি কোটি বছর ধরে জমা খনিজ সম্পদ কয়েক বছরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্রমান্বয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কোনো ব্যতিক্রম নয়। তবে সাম্প্রতিক কালে সরকারি অবহেলা, নেতিবাচক কর্মকান্ড এবং কিছুটা জনসচেতনতার অভাবের ফলে রাজ্যের পরিবেশ চিত্র ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চলচ্চিত্রে পরিবেশের গুরুত্ব ক্রমশ কমে যাচ্ছে।পরিবেশ ধ্বংসকারী বহু কর্মকান্ডে প্রশাসনের ভূমিকা হয় প্রত্যক্ষ সমর্থনের বা উদাসীনতার। সাধারণ মানুষের কাছেও জীবনধারণের বিভিন্ন চাহিদার তুলনায় সুস্থ পরিবেশের গুরুত্ব কম।

এই অবস্থায় পরিবেশপ্রেমী বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তিদের উদ্যোগে গড়ে তোলা ‘সবুজ মঞ্চ’ ২০০৯ সাল থেকে রাজ্যের পরিবেশ সমস্যাগুলি নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি নিয়ে আসছে। ৫ জুন ২০২২ এ পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশ প্রেমী সংগঠন এবং ব্যক্তিদের সঙ্গে একযোগে ৩ জুন ২০২২ শুক্রবার এক কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছিল। এই কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে পরিবেশের সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে না গিয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার জন্যে।

একইভাবে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হয়েছে পরিবেশ সমস্যাগুলোকে অবহেলা না করার। নচেৎ শুধু পরিবেশ নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবন ও জীবিকা চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজ্যের পরিবেশ যে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সার্বিক মূল্যায়ন সহজে চিহ্নিত করা সহজ হলেও তা একটি কাগজের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবুও মূল দাবিগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে যথাক্রমে তুলে ধরা হয়েছে।

১) নদী, জলাভূমি, জলাশয়, উপকূল ও ভূ-গর্ভস্থ জল রক্ষা ও মুনাফালোভীদের দখলদারি বন্ধ করে পরিবেশ নির্ভর ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জীবন জীবিকার সুরক্ষা।
২) বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত জীবাষ্ম জ্বালানির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, শিল্প, কারখানা, নির্মাণ উদ্যোগগুলিকে আইন মানতে বাধ্য করা, পরিবেশ বান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা। ট্রাম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ও সাইকেল আরোহীদের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। দেউচা পাঁচামীর মত পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লাখনি প্রকল্প বন্ধ করা।
৩) শহরের ভিতরে ও বাইরে আবর্জনা জমিয়ে রাখা অথবা জলাভূমিতে নদীতে আবর্জনা ফেলা বা আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করা।
৪) আবর্জনার উৎসেই সেটিকে পচনশীল ও অপচনশীল ভাগে ভাগ করে জৈবসার এবং রিসাইকেল করার ব্যবস্থা প্রতিটি ব্লক এবং পঞ্চায়েত স্তরে চালু করা।
৫) মাটির উপরের স্তরে জমি কাটা যথেচ্ছ ইটভাঁটা তৈরি বন্ধ।
৬)একবার ব্যবহার করেই ফেলে দিতে হয় এমন প্লাস্টিকের প্যাকেজিং ও অন্যান্য জিনিস, থার্মোকল ইত্যাদি তৈরি, বিক্রি এবং ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং বায়োডিগ্রেডবল ব্যাগের ব্যবহারে উৎসাহিত করা।
৭) শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করে শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা এবং শব্দবাজি পোড়ানো, ডিজে বক্স বাজানো এবং গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৮) বিশ্বজোড়া জলবায়ু সঙ্কটের মধ্যে সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন নগরায়ন ও সৌন্দর্যায়নের প্রয়াস বন্ধ করা।
৯) বড় ও ছোট শহরগুলো ক্রমশ হিটসিঙ্ক বা তাপাধারে পরিণত হচ্ছে, তাই প্রতিষেধক হিসেবে শহরাঞ্চলে সবুজ এবং বড় পাতাওয়ালা গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।
১০) উন্নয়ণ আর কংক্রিটায়নকে এক করে দেখে গাছের গোড়া বাঁধানো এবং পার্কের মাটির অংশ কংক্রিট করে বাঁধানো বন্ধ করা।
১১) নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিচু ও জলাজমি রক্ষা করে সবুজের জন্য ৩০ শতাংশ এলাকা পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়মগুলো অনুসরণ করে নগর পরিকল্পনা করা।
১২) রাজ্যে বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের ভূ-গর্ভস্থ জলে আর্সেনিক ও উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে ফ্লোরাইড দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে রাজনৈতিক দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে আরোও ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১৩) মাটির নিচের ও উপরের জলে রাসায়নিক সার-বিষের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যের যে বিপুল বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে তার প্রতিকারে এই সারবিষ সম্পূর্ণ বন্ধ না করতে পারা গেলে সারবিষ ব্যবহারের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আনা।
১৪) নদীর চর দখল করে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ধ্বংস করে চাষের জমি নষ্ট করে নদীদূষন করে চিংড়ি চাষের ভেরি নির্মাণ করে অতি মুনাফার জন্য জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
১৫) জিএম বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড খাদ্য ও ফসল তৈরি করে সাধারণ মানুষকে প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে বঞ্চিত করে বিপদে ফেলার সমস্ত অপচেষ্টা বন্ধ করা।

মূলতঃ এই দাবিগুলো সামনে রেখে দিনভর কর্মসূচি শুরু হয় সকাল ন’টা থেকে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিতে যথাক্রমে যাদবপুর ৮বি মোড়, গরিয়াহাটার মোড়, লেক মার্কেট মোড়ে পথসভা করে সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যায়। বিকেলে কলকাতা প্রেস ক্লাবে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশিষ্টজনরা বক্তব্য রাখেন। এর মধ্যে যেমন মাননীয় বিচারক ছিলেন তেমনই ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং পরিবেশ প্রযুক্তিবিদেরা।

সোমেন্দ্র মোহন ঘোষ বায়ুদূষণের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। ‘পৃথিবীকে আমরা বাসযোগ্য করে রাখব’। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের জন্য এই শপথ নিয়ে এদিনের কর্মসূচি সমাপ্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *