বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৫ জানুয়ারি: “বাংলাদেশ আজ দুভাগে বিভক্ত“। ক’দিন আগে প্রকাশ্যেই কথাটা বলেছেন বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মণি। তিনি জানান, এদিকে মুক্তিযুদ্ধের সমমনা ও আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে রয়েছে আওয়ামী লীগ বিরোধীরা। তাদের কোনো আদর্শ নেই। গত ২৭ আগস্ট পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা 
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।

আসলে এত বাস্তব এই কথা, ভাগ হতে হতে মহাদেশ, দেশ, রাজ্য, সমাজ, দল এমনকি ব্যক্তি— যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে। কিছুটা ব্যতিক্রম খণ্ড হয়েও অখণ্ড হয়ে নজীর তৈরি করেছে জার্মানি। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ওসেটিয়া, ভিয়েতনাম, সামোয়া ও আমেরিকান সামোয়া, রোমানিয়া মলডোভা, সাইপ্রাস ও উত্তর সাইপ্রাস, আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ড— কেবল ভৌগলিক দ্বিখণ্ডিত স্থানই যথেষ্ঠ। প্রতিটির নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু দুই বাংলার দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ইতিহাস, পরবর্তী ঘটনাবলী এক কথায় অনন্য। এত হিংসা, এত ভালবাসা, এত আবেগ, এত প্রাণ আর কোনও বিভক্তিতে নেই।

আর সেকারণেই বাংলাদেশ বললেই এপার বাংলার মানুষের মনে ভেসে ওঠে অজস্র কবিতা। অবচেতনে গেয়ে ওঠে ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা‘, ‘আকাশে বাতাসে ওঠে রণি। বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ‘— এরকম অজস্র গান। বাংলাদেশ বললে অনেকের মনে প্রথমেই অনেক কিছু ভেসে ওঠে। কারও নিজের বা পূর্বপুরুষের স্মৃতি, কারও মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আমার আগ্রহের কারণে অবাক হয়ে দেখি, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে কী বিপুল প্রাণ উৎসারিত হয়েছিল! চট্টগ্রাম নিজেই তো একটা অধ্যায়। আর একটা অদ্ভুত বিষয়, ঋত্বিক ঘটক থেকে উপেন্দ্রকিশোর, মেঘনাদ সাহা থেকে সত্যেন বোস— কেবল ভারতে নয়, গোটা উপমহাদেশে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা বা তাঁদের পূর্বপুরুষদের আঁতুরঘর ছিল পূর্ববঙ্গ। এ রকম বৌদ্ধিক ভৌগলিক বৈচিত্র গোটা বিশ্ব আর কোথাও আছে কি?

রাত পোহালে, শুক্রবার সকালে সেই বাংলাদেশে যাচ্ছি আমরা একদল সাংবাদিক। রাষ্ট্রীয় সফরে। প্রেস ক্লাব কলকাতার প্রতিনিধি হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেদেশের উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় অনুধাবন করা এবং অবশ্যই, সৌজন্য বিনিময়।

মাননীয়া দীপু মণির ‘দুভাগে বিভক্ত’ দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। শেষ করি অন্নদাশঙ্কর রায়ের অভিমান দিয়ে। ১৯৪৯-এ লিখেছিলেন,
‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে/ 
ভাগ হয়নিকো নজরুল।’

সেই নজরুলের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে হয়ত ক্ষণিকের জন্য আমাদের কেউ বলবেন— “কাণ্ডারি! বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *