Ballygunge Government, Memories, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট ও আমার স্মৃতি— নানা রঙের দিনগুলি

ছবিঃ- স্কুলের শতবর্ষের স্মারক
অশোক সেনগুপ্ত, আমাদের ভারত, ২৩ জানুয়ারি: ১০০ বছরে পা দিল ঐতিহ্যের এই বিদ্যালয়। এই সেদিন হয়ে গেল প্রভাতী পদযাত্রা, প্রাক্তনীদের পুনর্মিলন। বছরভর চলবে আয়োজন, স্মরণ-অনুষ্ঠান। সেই উপলক্ষে ফিরে দেখলাম বিদ্যালয়জীবনকে।

১৯৬৩ সাল। থাকতাম পূর্ব যাদবপুরের সন্তোষপুরে। অনেকটা মফস্বল। রাস্তার পাশে স্তম্ভে টিমটিমে বাতি জ্বলত। খোয়ার আচ্ছাদনের রাস্তা দিয়ে বাস চলত না। এলাকার ছেলেমেয়েরা পড়ত মূলত কাছাকাছির স্কুলে। একদম শৈশবে আমিও পড়তাম স্থানীয় স্কুলে।

ক্লাস থ্রিতে ওঠার পর বাবা যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, সেন্ট লরেন্স এবং বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট— এই তিন স্কুলে ভর্তির পরীক্ষায় বসালেন। তিনটিতেই উত্তীর্ণ হলাম। সে সময় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের রমরমা। বাবা ওখানেই ভর্তি করলেন। সকালে আমাদের নিতে স্কুলবাস আসত ঢাকুরিয়া লেকে। বাসের অপেক্ষা করতে করতে শুনতাম সংলগ্ন বুদ্ধমন্দিরের ভিক্ষু পরিক্রমা করছেন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে। চারদিকে পাখির কলতান। কী সুন্দর পরিবেশ।

স্কুলবাস আসত দক্ষিণে গোলপার্ক পর্যন্ত। পরে স্কুল থেকে ওই বাসেই ফিরতাম। গোলপার্ক থেকে মা নিয়ে আসতেন বাড়িতে। ঢাকুরিয়া ব্রিজ তৈরির কাজ চলছে তখন। রেলগেটে খুব যানজট হত। দক্ষিণাপণ এবং তার পিছনের বহুতল ছিল না। সেখানে তখন মস্ত জলা। শৈশবে মা মারা গেলেন। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খেয়েছিলেন বাবা। তিন ভাইবোনের পড়ার অসুবিধে যাতে না হয়, গৃহশিক্ষক/শিক্ষিকা রেখে দিলেন।

যতটা মনে আছে, সকালে বাবাই দিয়ে আসতেন। স্কুলের এক বয়স্ক কর্মী করুণাদার ওপর দায়িত্ব দিলেন আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার। পরে একাই যাতায়াত করতাম যাদবপুর থেকে ৮বি বাসে। একপিঠের ভাড়া ছিল ১০ পয়সা।

স্কুলের উঁচু দেওয়ালের ওপারে ছিল মোটর ভেহিক্যালস। বহু লোক আসত সেখানে। ডাবের জল পান করে খোলাটা ছুঁড়ে ফেলে দিত এপাশে। মাঠে তাই পড়ে থাকত প্রচুর শুকনো খোলা। সেগুলোই ছিল আমাদের ফুটবল। খেলতে গিয়ে পড়ে কমবেশি ব্যাথা পেতাম। তাতেও কমত না উদ্দীপনা। “জানে না কে কোথা যাবে, জোটে হেথা তাই ভাবে পাঠশালা,— যেন পান্থশালা, দু-দিন একত্রে মাতে, মেলে-মেশে, বসে গাঁথে নীতি-হার আর কথা-মালা।” (ঋণ— ‘ছাত্রধারা’, কালিদাস রায়)।

ঊষা দিদিমণি, ইন্দিরা দিদিমণি, সুধীরবাবু,বিশ্বপ্রিয়বাবু, রীতেনবাবু, শৈলেশবাবু, দেবব্রতবাবু, অমরবাবু, প্রভাতবাবু— ওঁরা ক্লাশ নিতেন। চিরকালের মত ওঁরা সকলে চলে গেছেন। কিন্তু চোখ বুঁজলে এখনও মনে ভেসে ওঠে ওঁদের ছবি। নারায়ণ চন্দ্র ছিলেন প্রধান শিক্ষক। নিমাই চক্রবর্তী একসময় বাংলা পড়াতেন। “ওরে সবুজ ওরে আমার কাঁচা“— প্রাঞ্জল করে বোঝানোর চেষ্টা করতেন এই সব পংক্তি।

বাংলা ভাষা, বা বিষয় আমার বরাবরই প্রিয় বিষয়। ওনার পড়া মন দিয়ে শুনতাম। আগ্রহ পেতাম। উনিও সেটা বুঝতেন। একদিন সুদর্শন এক সহপাঠীকে পড়া ধরলেন। ও চুপ করে ঘাড় বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। নিমাইবাবু রাগতভাবে বললেন, “হুঁ, যেন দেবানন্দো!” সেই ‘দেবানন্দো’ পরবর্তীকালে শিল্পী হিসাবে যথেষ্ঠ নাম করেছে। তার কাকা ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘গুগাবাবা’-র অন্যতর কুশীলব।


ছবিঃ- সত্যজিৎ রায়ের চোখে স্কুলের সেই হলঘর

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের বটগাছ আর হলঘর ছিল স্কুলের প্রতীক। সত্যজিৎ রায় ওই হলঘরের স্কেচ এঁকেছেন। ‘যখন ছোট ছিলাম’ স্মৃতিকথায় লিখেছেন অনেক কথা— “দারোয়ানের ঘর পেরিয়ে মোরাম বিছানো পথ দিয়ে খানিকটা গিয়ে তিনধাপ সিড়ি উঠে পূর্বে-পশ্চিমে টানা ইস্কুলের বারান্দা। বারান্দার ডাইনে সারবাঁধা ক্লাসরুম আর বাঁয়ে অর্ধেক পথ গিয়ে হলঘরের দরজা। গ্যালারি-ওয়ালা হলঘরে সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটা ঘটে সেটা হল বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণী। এছাড়া সরস্বতী পুজোর পাত পেড়ে খাওয়া হয়, মাঝে মাঝে বক্তৃতা হয়, ….”।


ছবিঃ- স্কুলজীবনের স্মৃতি ফুটে উঠেছে সত্যজিৎ রায়ের আঁকায়

প্রভাতী শাখা থেকে উঠলাম দিবা শাখায়। জীবন এগোতে লাগল নিজের ছন্দে। নতুন বছরের গোড়ায় বাবা স্কুলে গিয়ে ২-৩ জন শিক্ষককে ডায়েরি-ক্যালেন্ডার দিয়ে আসতেন। জানতে চাইতেন, ছেলেটা পড়াশোনা করছে তো? অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন অতি খর্বাকৃতি, পুরু লেন্সের এক চশমাওয়ালা। ছাত্রদের কাছে ‘বেঁটে সুনীল’। খুব দাপট। ২-৪ জন সম্পন্ন পরিবারের ছেলের গৃহশিক্ষক ছিলেন তিনি।

পাশেই ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ। সেখান থেকে শিক্ষকরা পড়াতে আসতেন। তাঁদের নাম সুরেশ পাল। উত্তরবঙ্গের মফস্বল থেকে আসা। কথাতেও অন্যরকম ছাপ। ছাত্ররা কেউ কেউ ‘বাঙাল’ বলে আওয়াজ দিত। বাবা সেই শিক্ষককে আমার অঙ্কের গৃহশিক্ষক করেছিলেন। থাকতেন সন্তোষপুরে আমাদের বাড়ির কাছেই। পরে নিজে কাছেই বাড়ি করেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটা বড় দুঃখের। বহুকাল হ’ল তিনি আর নেই।

১৯৭১-’৭২ সাল নাগাদ বিড়লা শিল্প ও কারিগরি সংগ্রহশালায় আমরা এক বিতর্কসভায় তিন সহপাঠী প্রতিনিধিত্ব করি। বিষয় ছিল, ‘কলকাতার বুকে আমরা জুড়ে দিতে চাই সেই ডানা, যার আর এক নাম গতি’। আমি ছাড়া ছিলাম সোমপ্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় আর সুমন চট্টোপাধ্যায়। সোমপ্রকাশ উচ্চমাধ্যমিকে তৃতীয় হয়েছিল। সুমন ছিল কলা শাখার সবচেয়ে সফল ও কৃতী ছাত্র। পরে দু’জন হয়ে উঠলাম আনন্দবাজার পত্রিকার সহকর্মী।

আরও অনেক পরে, বাম আমলের শেষদিকে মহাকরণে যেতাম খবর সংগ্রহের জন্য। তখন সিঙ্গুর নিয়ে উত্তাল বাংলা। প্রসাদরঞ্জন রায় স্বরাষ্ট্রসচিব। মস্তিষ্কের অ্যান্টেনা খাড়া করে তাঁর ঘরের সামনে ঘুরঘুর করতাম। যে কোনও মুহূর্তে খবর হতে পারে! একদিন হঠাৎ পুলিশকর্তা গৌতম মোহন চক্রবর্তী এলেন প্রসাদবাবুর ঘরে। দু’জ্যনেই বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের প্রাক্তনী। কিছুক্ষণ বাদে দু’জনে একসঙ্গে বেড়িয়ে গেলেন। কোথায় যাচ্ছেন, প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। ধরে নিলাম, বড় কোনও ঘটনা ঘটেছে। আমাদের কাজই তো টিকটিকির মতো। সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানলাম ওঁরা গিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক সুপ্রভাতবাবুর বাড়ি। উনি আর নেই খবর পেয়েই দুই ছাত্রের ওই তৎপরতা। একাকী সুপ্রভাতবাবুর শেষ জীবনে অনেকটাই সাহচর্য দিয়েছিলেন তাঁর প্রাক্তন ছাত্ররা।


ছবিঃ- এটি স্কুলের প্রাক্তনী রত্নদীপ দাসের ফেসবুক থেকে নেওয়া

স্কুলের বিখ্যাত প্রাক্তনীদের তালিকা অতি দীর্ঘ। দেশে-বিদেশে ওদের কতজন যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা ভাবলে অবাক হয়ে যেতে হয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের মধ্যে গৌতম ভট্টাচার্য, শম্ভু সেন, সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, সব্যসাচী সরকার প্রমুখ ছিল বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের প্রাক্তনী।

কর্মসূত্রে যে যাঁর মত ছড়িয়ে পড়েছিলাম। ক’বছর আগে আবার শৈশবের বেশ কিছু সহপাঠী একত্রিত হয়েছি মুঠোফোনের মাধ্যমে। তৈরি হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ‘কিচিরমিচির’। “হাতে মসী, মুখে মসী, মেঘে ঢাকা শিশু-শশী”— যখন আমরা মাঝে মাঝে আড্ডায় বসি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করি সেই সময়টায়। সহপাঠীদের যাঁরা অনেকদিন ধরে বিদেশে, তাঁরাও দেশে এলে হাজিরা দেয় ‘কিচিরমিচির’-এর মজলিসে।


ছবিঃ- বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের অনুষ্ঠানে ভাগ্নে ও দুই বোনের সঙ্গে আমি

২০১৮-র ২১ জানুয়ারি পড়ুয়াদের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় আমার বাবা-মায়ের স্মৃতিতে পুরস্কার প্রদানের ছোট্ট ব্যবস্থা করেছিলাম শৈশবে বেড়ে ওঠা বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে। সেখানে আমরা তিন ভাইবোন, ভাগ্নে বুবাইও ছিল। পাশাপাশি বসেছিলাম। আমার অজান্তে স্কুলেরই এক অনুজ প্রাক্তনী মৈনাক শিকদার এই সুন্দর ছবি তুলে আমাকে পাঠিয়েছিল। মৈনাকের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া মঞ্জুদি গোটা বিশ্ব পরিক্রমা করেছেন। আমি কয়েকটিতে তাঁর সফরসঙ্গী হয়েছি। ভীষণ ভালো পারস্পরিক সম্পর্ক। সেই হিসাবে মৈনাক আমার নামের সঙ্গে পরিচিত ছিল।

এখনও স্কুলের চেহারা খুব সুন্দর। দেওয়ালে আকর্ষণীয় অলংকরণ। দোতলায় সিঁড়ির মুখে দেওয়ালে ‘মেরিট বোর্ড’ দেখলে গর্বে বুক ভরে ওঠে। তবে বাইরের বেলতলা বস্তি হয়ে উঠেছে নরককুন্ড। খোদ শহরে এরকম নোংরা, অপরিচ্ছন্ন, ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল স্কুলে যাতায়তের পক্ষে যথেষ্ঠ বিরক্তিকর। স্কুলে সদ্য অনুষ্ঠিত সমাবেশে নাকি ওই বস্তি খুবই বিরক্তির কারণ হয়েছিল।

সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, “জয়ন্ত আমার চেয়ে দু’ক্লাস উপরে পড়ত, পর পর দু’বার ফেল করে আমাদের ক্লাসে এসে যায়। পরীক্ষায় যে সে পাশ করবে না সেটা বুঝেছিলাম যখন সে আমাদের সঙ্গে এক ক্লাসে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমরাও লক্ষ করছিলাম সে খাতার দিকে না চেয়ে বার বার নিজের কোলের দিকে চাইছে। কোলে বই খোলা আছে কি? যে মাস্টারমশাই গার্ড দিচ্ছিলেন তিনিও ব্যাপারটা দেখে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন জয়ন্তর দিকে। – “নিচে কী দেখা হচ্ছে?” জয়ন্ত হাত তুলে দেখিয়ে দিল তাতে একটি আস্ত মর্তমান কলা।- “টিফিনে খাব স্যার। তাই দেখে নিচ্ছিলাম ঠিক আছে কিনা।” আর, আমাদের ‘কিচিরমিচির’-এর জয়ন্ত? সেই যে স্কুল আর সেন্ট জেভিয়ার্সের পাট চুকিয়ে মার্কিন মুলুকে গিয়েছে, এখনও তাঁর আর ফেরা হয়নি।


ছবিঃ- প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগের সহপাঠী সুদীপকে ‘কিচিরমিচির’-এর তরফে ‘কবিপ্রিয়’ সম্মানে ভূষিত করছি

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের ‘কিচিরমিচির’-এর আমরা সবাই এখন কমবেশি ৭০। আমাদের অন্যতম সুব্রত সেন ছিল অত্যন্ত কৃতি। বেশ ক’বছর ধরে একেবারে একা। অসুস্থ। স্কুলের আর এক সহপাঠি অমিত গাঙ্গুলি একদিন ‘কিচিরমিচির’-এর আড্ডাতেই বলেছিল, “অশোক, মা মারা যাওয়ার পর তুই ‘ধরা’ পরে এসেছিলি। তোর বাবা এসে আমাকে বলেছিলেন, ওকে একটু দেখে রেখো!”

এককালে সেই অমিত ছিল অত্যন্ত সম্পন্ন ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। কিন্তু সময়ের ঝড়ো হাওয়া সব ওলোটপালট করে দিয়েছে। অনেকদিন ধরে খুবই অসুস্থ। মাঝে একটা বৃদ্ধাবাসে ছিল। আমরা ২-৪ জন ২-৩ দফায় গিয়ে দেখে এসেছি। কর্মসূত্রে পুত্র থাকে ভিন রাজ্যে। ওকে সেখানে নিয়ে গিয়েছে।

বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের ‘কিচিরমিচির’-এর কেউ কেউ আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে চিরকালের মতো। এই যেমন তিন সপ্তাহের অসুস্থতার পর সেদিন চলে গেল শিবাজী। খবর পেয়ে আমরা কজন শ্মশাণঘাটে গিয়েছিলাম। পরে ওর বাড়িতেও গেলাম শেষকৃত্যে। সেখানে আমাদেরই একজন, বাবুল (দেবজ্যোতি সোম) বলল, “দ্যাখ অশোক, আমরা সবাই এখন এক্সস্ট্রা ইনিংস খেলছি। কে যে কত দিন থাকব, কে বলতে পারেন!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *