রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইট খুলে পড়ছে বখতিয়ার খিলজির সমাধিস্থলের, ধ্বংসের মুখে গঙ্গারামপুরের প্রাচীন ইতিহাস

পিন্টু কুন্ডু, বালুরঘাট, ২৬ জানুয়ারি: রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ইতিহাস বিজড়িত বখতিয়ার খিলজির সমাধিস্থলের দেওয়ালের ইট খুলে পড়ছে প্রায় প্রতিদিনই। ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে গঙ্গারামপুরের প্রাচীন ইতিহাস। ইতিমধ্যে সমাধিস্থলের দেওয়ালের একাংশ ভেঙ্গে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সমাধিস্থলটি। বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপু থানার পীরপাল এলাকার বহু পুরনো ওই ঐতিহাসিক স্থান আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে দ্রুততার সাথে বখতিয়ার খিলজির সেই সমাধিস্থল মেরামত করা হোক বলে দাবি এলাকাবাসীর। একই দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন জেলার ইতিহাসবিদরাও।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুর ব্লকের নারায়ণপুরের পীরপাল এলাকায় অবস্থিত বখতিয়ার খিলজির সমাধিস্থল সম্পর্কে জানা যায়। ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ দেশে আসেন। এরপর লখনৌতি নামে রাজ্য ও দেবকোটকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বখতিয়ার খিলজি দেবকোট এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় তার আধিপত্যের পাশাপাশি সাম্রাজ্য বিস্তারও শুরু করেন। তার বিশ্বস্ত সেনাপতি আলি মর্দানকে ও সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার সেনা নিয়ে তিব্বত আক্রমণের জন্য রওনা দেন তিনি। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তিব্বত আক্রমণের আগেই বখতিয়ার খিলজির বহু সৈন্য মারা যায়। যার ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বখতিয়ার খিলজিকে পুনরায় দেবকোটে ফিরে আসতে হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে বখতিয়ার খিলজির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তার বিশ্বস্ত সেনাপতি আলী মর্দান তাকে হত্যা করেন। আর তারপরেই বখতিয়ার খিলজির সমাধি দেওয়া হয় বর্তমান পীরপাল নামক এই স্থানে। আজও সেই সমাধিস্থলের প্রতিটি ইট যেন প্রাচীন ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ঐতিহাসিকদের ভাষাতেই উঠে এসেছে এমন তথ্য।

নারায়ণপুরের পীরপাল এলাকার মানুষজনদের কাছে শোনা যায়, এই সমাধিস্থল বর্তমানে পীরবাবার সমাধিস্থল নামে পরিচিত হয়েছে। যার জেরে ওই এলাকার মানুষ আজও কাঠের তৈরি খাটে না ঘুমিয়ে মাটির বিছানায় ঘুমোন তারা। বছরের বৈশাখ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার সেই সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে এলাকায় বসে মেলা। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা প্রচুর মানুষ আজো সেই মেলায় অংশগ্রহণ করেন। শুধু মেলায় নয়, সারাবছর এই ঐতিহাসিক বখতিয়ার খিলজির সমাধিস্থল দেখতে ভিড় জমায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা। কিন্তু প্রশাসনিক অবহেলায় পড়ে থাকা প্রাচীন ইতিহাস বিজড়িত ওই ঐতিহাসিক বখতিয়ার খিলজির সমাধিস্থল আজ যেন ধ্বংসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। সমাধিস্থলের দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে, খুলে পড়ছে এক একটি করে ইটও। চারপাশ ঘিরে ফেলেছে আগাছায়।রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইতিহাসের পাতায় থাকা বখতিয়ার খিলজির ইতিহাস আজ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রামবাসী থেকে শুরু করে ইতিহাসবিদ সকলেই চাইছেন অতি দ্রুততার সাথে রক্ষা করা হোক বখতিয়ার খিলজির সেই সমাধিস্থলটি।

স্থানীয় বাসিন্দা সুকুমার রায় ও সঞ্জয় রায়রা বলেন, এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি রক্ষা করতে প্রশাসন এগিয়ে আসুক আমরা সেটাই চাই।

ইতিহাস বিশেষজ্ঞ সমিত ঘোষ বলেন, শুধুমাত্র দেখভালের অভাবে একটা ঐতিহাসিক নিদর্শন হারিয়ে যেতে বসেছে এটা ভাবলেই খারাপ লাগে। প্রশাসনের উচিত এব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা, এবং জেলার ইতিহাসের যে গরিমা তা অক্ষুণ্ণ রাখা হোক।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি লিপিকা রায় বলেন, আমরা দেখছি, যদি কোনো কাজ করা সম্ভব হয় তাহলে দ্রুততার সাথে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *