জয় লাহা, দুর্গাপুর, ১৫ অক্টোবর: অবশেষে গ্রামবাসীদের দাবি মতো ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় বসল ইসিএল। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের লিখিত আশ্বাস পেয়ে আন্দোলন তুলে নিল অন্ডালের সিঁদুলি বাঁচাও কমিটি। শনিবার থেকে সিঁদুলি ইনক্লাইন্টের সম্প্রসারনের কাজ পুনরায় শুরু করল ইসিএল।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক ইসিএলের কেন্দা এরিয়ার সিঁদুলি কোলিয়ারি সম্প্রসারিত প্রজেক্টের জন্য অনুমোদন দেয়। জানা গেছে, ২৩ বছরে প্রায় ২৬ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদিত হবে ওই প্রজেক্টে। খোলামুখ ও ভূ-গর্ভস্থ খনি হবে। তার জন্য প্রায় ২৫৪ হেক্টর জমির প্রয়োজন। যার মধ্যে ১২৪ হেক্টর জমি ইসিএলের রয়েছে। কিছু খাস জমি রয়েছে। এছাড়াও আর জমি প্রয়োজন।
ইসিএল সুত্রে জানাগেছে, প্রজেক্টের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। তবে প্রাথমিক ভাবে সিঁদুলির ভূ-গর্ভস্থ খনির ড্রাইভের জন্য জায়গা তৈরীর কাজ শুরু হয়েছে। তাতে ইসিএলের একটি স্টেডিয়াম ভাঙ্গার কাজ শুরু হয়েছে। ওই কাজ করছে একটি বেসরকারি সংস্থা। ওই খনি সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে সিঁদুলি গ্রাম। প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা রয়েছে গ্রামে। রয়েছে স্কুল। খেলার জন্য স্টেডিয়াম। খনির সম্প্রসারনে তার ফলে ভাঙ্গা হচ্ছে সিঁদুলি স্টেডিয়াম মাঠ। কেটে ফেলা হচ্ছে কয়েক হাজার গাছ। ভূ-গর্ভস্থ খনিতে ক্রমাগত ব্লাস্টিং- এর ফলে এলাকার বহু ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ। যার ফলে আতঙ্কিত বাসিন্দারা। আতঙ্কিত বাসিন্দারা পূনর্বাসনের দাবিতে সরব হয়। গ্রামবাসীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে খনি কর্তৃপক্ষ সম্প্রসারনের কাজ শুরু করছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীরা। গ্রামের স্বার্থে তৈরি হয়েছে “সিদুলি গ্রাম বাঁচাও কমিটি”।
গত ২৯ ডিসেম্বর কমিটির পক্ষ থেকে বিক্ষোভ দেখায় সিঁদুলি কোলিয়ারি এজেন্ট অফিসে। পুনর্বাসন, নতুন খেলার মাঠ, খনি সম্প্রসারণ এর কাজে স্থানীয়দের নিয়োগ, পানীয় জল, এলাকায় বিনামূল্যে বিদ্যুতের ব্যবস্থা, আলো লাগানোর সহ ১৪ দফা দাবি সহ স্মারকলিপি জমা দেয় ওই কমিটি। বিক্ষোভের জেরে খনি সম্প্রসারনের প্রাথমিক কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ইসিএলের। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সিঁদুলিতে স্থানীয় খান্দরা পঞ্চায়েত প্রশাসনকে নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা বসে ইসিএল কর্তৃপক্ষ। আলোচনায় ইসিএলের আধিকারিক, স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান ও সিঁদুলি বাঁচাও কমিটি’র সদস্যরা ছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর ইসিএলের মৌখিক আশ্বাস পেয়ে আন্দোলন স্থগিত রাখে গ্রামবাসীরা। কিন্তু দাবী মত লিখিত প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় পুনরায় লাগাতার অন্দোলন শুরু করে
সিঁদুলি বাঁচাও কমিটি’। তাদের অভিযোগ, “খনির সম্প্রসারণের জন্য ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে সিঁদুলির কোহিনূর স্টেডিয়াম। এটি এলাকার একমাত্র খেলার মাঠ। এছাড়াও চলছে গাছ কাটা। ক্রমাগত ব্লাস্টিং বিপন্ন হয়ে পড়েছে গোটা গ্রাম। গ্রামবাসীদের ক্ষতিপূরণের কোনো আলোচনা না করেই সম্প্রসারনের কাজ শুরু করেছে। দাবি’র লিখিত চুক্তি না হওয়ায় কাজ বন্ধ করা হয়েছিল।” দীর্ঘ টালবাহানার পর শুক্রবার আবারও ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় বসে ইসিএল। তাতে ইসিএল আধিকারিকরা ছাড়াও স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রশাসন ও আন্দোলনকারীরা ছিলেন। তাতে গ্রামবাসীদের দাবি মেনে ক্ষতিপুরনের লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় ইসিএল। তারপরই আন্দোলন তুলে নেয় সিঁদুলি বাঁচাও কমিটি’।
এ বিষয়ে খান্দরা পঞ্চায়েত প্রধান শ্যামলেন্দু অধিকারী জানান, “খনির সম্প্রসারণে আমাদের আপত্তি নেই। গ্রামবাসীদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গ্রামবাসীদের দাবী মতো সরকারি নিয়ম মেনে ক্ষতিপূরণ ও পুনরবাসনের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে এলাকার ঐতিহ্য কেহিনূর স্টেডিয়াম, যেটা ভাঙ্গা হচ্ছে। দাবি মতো ব্লকের অন্যত্র যেখানে জমি পাওয়া যাবে, সেখানে তৈরী করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।” তিনি আরও জানান,” খনি সম্প্রসারনের কাজে
আন-স্কিল শ্রমিকের কাজে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিও মেনে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।” আন্দোলনকারী গ্রামবাসীরা জানান,
“প্রতিশ্রুতি মতো নির্ধারিত সময়ে দাবি পূরণ হলে আপত্তি নেই। তবে দাবি পূরণ না হলে পুনরায় বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”
সিঁদুলি কোলিয়ারির আধিকারিক রাজেন্দ্র কিশোর প্রসাদ সিং জানান, “ত্রিপাক্ষিক আলোচনা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থে কয়লা উত্তোলনের জন্য খনি প্রয়োজন। ২০১৮ সালে প্রজেক্টের অনুমোদন হয়েছে। নতুন ওই প্রজেক্টে দৈনিক দেড় হাজার থেকে দু’হাজার টন কয়লা উৎপাদিত হবে। মূল প্রজেক্টের সম্প্রসারনের কাজ এখনও শুরু হয়নি। এখন ইনক্লাইন্ট প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে।সরকারি নিয়ম মেনে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাবে৷”

