*৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্যদিবস* চিকিৎসকের আত্মহত্যা ও কিছু প্রশ্ন

অশোক সেনগুপ্ত
আমাদের ভারত, ৭ এপ্রিল: সম্প্রতি এক চিকিৎসকের ‘আত্মহত্যা’র জেরে তুলকালাম হয় রাজস্থানে। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় ২২ বছরের এক বধূর। এই মৃত্যুর জন্য ওই তরুণীর স্বামী ও আত্মীয়রা চিকিৎসক অর্চনা শর্মাকে দায়ী করেন। মৃতদেহ নিয়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। অর্চনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের দাবি ওঠে।

অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপের জেরে তাঁকে ও তাঁর স্বামী ডা. সুনীত উপাধ্যায়কে পুলিশ ধরে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই দম্পতি লালসটের হাসপাতালটি চালাতেন।

এরপরই আত্মহত্যা করেন ডা. শর্মা। সঙ্গে একটি সুইসাইড নোটও লিখে যান। সেই সুইসাইড নোটে লেখা রয়েছে, “আমি আমার স্বামী এবং বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসি। আমার মৃত্যুর পর দয়া করে ওঁদের কেউ বিরক্ত করবেন না। আমি কোনও ভুল কাজ করিনি এবং কাউকে খুন করিনি। ময়নাতদন্তেই স্পষ্ট ওই মহিলার কিছু গুরুতর সমস্যা ছিল। এভাবে চিকিৎসকদের হেনস্থা করা বন্ধ করুন। আমার মৃত্যুই হয়তো আমার নিরপরাধ হওয়ার প্রমাণ দেবে। দয়া করে নিপরাধ চিকিৎসকদের হেনস্থা করা বন্ধ করুন।”

ছবি: ডা. অর্চনা শর্মা।

এই ঘটনার পর ডা. শর্মার স্বামী ডা. উপাধ্যায় একটি ভিডিয়ো বার্তায় জানান, মহিলার মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকরা কেউ দায়ী নন। তিনি স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু, তারপর কিছু সমস্যা তৈরি হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্যই তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচাতে দু’ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু, তাতে কোনও লাভ হয়নি।

সাম্প্রতিক এই ঘটনা ফের নতুন করে উস্কে দিয়েছে স্বাস্থ্যকর্মী-রোগী সম্পর্ককে। ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তা কার্যকর হয় ১৯৫০ সালে। অর্থাৎ ৭ এপ্রিল ’বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ বলে নির্ধারিত হয়।

কী বলছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা?

”সম্পর্কে এখন  যেন শুধুই অবিশ্বাস”—ডাঃ অগ্নিক পাল 
(বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সহকারী অধ্যাপক, কলেজ অফ মেডিসিন এন্ড জেএনএম হসপিটাল, কল্যাণী)

২০০৮ এ ইন্টার্নশিপ করার সময় থেকে সরাসরি রোগীদের সাথে নিবিড়ভাবে যোগাযোগের শুরু। সরকারি এবং বেসরকারি, দুই ক্ষেত্রেরই চিকিৎসা পরিষেবার সাথে বিভিন্ন সময় যুক্ত থাকায় এক দশকের বেশি সময়ে চিকিৎসক ও রোগীর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমাগত অবনতি চোখে পড়েছে। এই সম্পর্কে এখন  যেন শুধুই অবিশ্বাস।  আর তাতে ক্ষতি দু’পক্ষেরই। কারণ, চিকিৎসকরা সবাই এখন ঝুঁকি নিতে ভয় পান। যে কোনও জটিল রোগে বা দুর্ঘটনায় সবরকম চেষ্টা করার পরেও মৃত্যু হতে পারে, বাড়ির লোক অনেক ক্ষেত্রেই তার জন্য দায়ী করেন ডাক্তারকেই! যার জেরে চিকিৎসককে শারীরিক ও মানসিক হেনস্থার শিকার হতে হয়। সম্প্রতি, তারই এক ভয়াবহ পরিণতি রাজস্থানের ডাক্তার অর্চনা শর্মার আত্মহত্যার ঘটনায়। 

ক্রেতা সুরক্ষা আইনের আওতায় আনা সত্ত্বেও, চিকিৎসক রোগী সম্পর্ক কিন্তু কখনও শুধুমাত্র অর্থ নির্ভর না। কারণ, রোগীর প্রতি যে দায়বোধ চিকিৎসকের থাকে তা কেবল অর্থের নিরিখে নয়! চিকিৎসক তাঁর সমস্ত সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করেন রোগীকে সুস্থ করে তোলার। কিন্তু তার পরেও সব সময় একশো ভাগ সাফল্য হয় না! 

এই সম্পর্কের মানোন্নয়ন খুব জরুরি। এক ভয়হীন পরিবেশ দরকার। সবসময় রোগীদের পরিজনের গন্ডগোল বা আইনি জটিলতার কথা ভেবে চিকিৎসা করা মানে কোনো রকম ঝুঁকি না নেওয়া, অতিরিক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, চিকিৎসার গূঢ় বৈজ্ঞানিক চিন্তার থেকে কি করেছি আর কি করিনি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ডকুমেন্টেশন— এসবই এখন বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে, যা কিন্তু কখনোই কাম্য ছিল না। 

তাই সরকার, ডাক্তার আর রোগীদের সব সংগঠনের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া উচিত।  তার সাথে দু তরফেই থাকা উচিত নির্দিষ্ট আইন আর তা পালনের সদিচ্ছা। তবেই এই সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব। 
***

“চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো ভরসা“
— ডাঃ শুভজিৎ ব্যানার্জি

আমি বছর কুড়ি ধরে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হোমিওপ্যাথি প্র‍্যাকটিস করছি। চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো ভরসা। এটি কমছে। তবে তা অবশ্যই ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভরশীল। শহুরে কৃত্রিমতা অতিক্রম করলে ওই ভরসাটা আর ‘ভিজিট’ নির্ভর থাকে না। যেমন একটু গ্রাম্য এলাকায় রোগীর বাচ্চার ‘ইস্কুল’-এর ফরম’ ভরে দিতে হয়েছে, তিরুপতি যাবার ‘টিরেনের’ টিকিট ‘কম্পুটারে’ কাটা, বাচ্চার পড়ার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা, ঘটকালিও করার আবদারও মেটাতে হয়েছে। এই উদাহরণগুলো ‘ভিজিট’-এর উপরেও রোগী-ডাক্তারের সম্পর্কের প্রমাণ। উল্টো দিকে আমার শিশুকন্যার হাসপাতালে ভর্তির খবর পেয়ে বেশ কিছু ‘রোগী’-র সপরিবারের হাসপাতালে উপস্থিতি এই সম্পর্ককে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। এই সম্পর্ককে পেশার উপরেও ‘আত্মীয়তা’র জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। মনে হয় যেখানে বিকল্প ব্যবস্থা সহজলভ্য সেখানে ‘পেশাদারীত্ব’র দোহাই দেওয়ার রেয়াত প্রাধান্য পায়। অর্থ ও অন্য ডাক্তারের প্রতুলতা রোগীকে ‘মেটিরিয়ালিস্টিক’ করে তোলে, আর ডাক্তারও একবারে ‘সুদাসল’ নিংড়ানোর চেষ্টায় থাকেন। সঙ্গে থাকা ওষুধ কোম্পানি ও ল্যাবের চাপ থাকা অস্বীকার করা যায় না।

তবে এটাও ঠিক আজ ‘পেরাইভেট’ কলেজ থেকে স্নাতকত্তোর ডিগ্রী করে বেরোনো নবীন প্রজন্মের মাথায় ‘লোনের’ বা ‘তিরস্কারের’ বোঝা থাকে। তাই তারাও প্রথমদিন থেকেই ‘রির্টান অন ইনভেষ্টমেন্ট’ এর জন্য ঝাঁপায়। সেখানে অপার্থিব সম্পর্ক স্থাপনের বিশেষ সুযোগ থাকে না। অনলাইন চিকিৎসা পরামর্শ ডাক্তার-রোগী সম্পর্ককে আরও দূরের করছে। তবু বলা ভালো আগের মতো এখনো কিছু  ডাক্তার, তাঁর রোগীর অবস্থায় বিচলিত থাকেন। তাঁদের ন্যূনতম খরচে চিকিৎসা দেওয়ায় সচেষ্ট হন। রোগীর পেশা ও আর্থিক অবস্থা বুঝে ‘ডিজিট’ কাটছাঁট করেন। রোগীও ‘হায় ডক্’ র থেকে ‘ডাক্তারবাবু’ সম্বোধনে বেশি  জোর দেন। তাই বলা ভালো ‘ক্রেতা সুরক্ষা’র বলয়ে আবদ্ধ থাকা ‘ডকুমেন্টারি এভিডেন্স’ খোঁজার উপরেও ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’ চিরকালই পড়া হবে।
***

“চিকিৎসা করতে গিয়ে হেনস্থা ও নিঃস্ব হওয়ার কাহিনী বিচ্ছিন্ন ঘটনা”— মৌমিতা চ্যাটার্জি
(সোসাল ওয়েলফেয়ার অফিসার, চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট)

আমি ২০১৫ সাল সরাসরি স্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে যুক্ত। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুটি ভিন্ন এনজিও-তে চাকুরি সূত্রে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শিশু ও মানুষদের সামাজের মূল স্রোতে যুক্ত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সমাজভিত্তিক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামে কাজ করেছি। ২০১৯ সাল থেকে বর্তমানে একটি কেন্দ্রীয় সরকারী ক্যান্সার হাসপাতালে সোসাল ওয়েলফেয়ার অফিসার পদে কাজ করছি।

২০২০ সালে অতিমারির আগে পর্যন্ত রোগী ও স্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যে সম্পর্কের সাথে অতিমারি ও তার পরবর্তীসময়ের কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্য করেছি। বর্তমানে সম্পর্ক অনেক বেশী আন্তরিক বলে মনে হয়। আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি রোগী ও তার পরিবারের গয়ংগচ্ছভাব যেন অনেকখানি স্তিমিত লাগত, তার বদলে জায়গা নিয়েছে কিছুটা সম্মান-সম্ভ্রম। অন্তত সরকারি ক্ষেত্রে আমরা এটা লক্ষ্য করেছি।

বেসরকারী ক্ষেত্রেও কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থনির্ভরতা চোখে পরেনি। হয়তো আমার ওয়েলফেয়ার সম্পর্কিত কাজকর্ম তার জন্য দায়ী। অনেকের কাছেই শুনেছি চিকিৎসা করতে গিয়ে হেনস্থা ও নিঃস্ব হওয়ার কাহিনী। সেসব এক্কেবারে মিথ্যে নয়। তবে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হয়। আমাদের হাসপাতালেও আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে রোগীদের পরিষেবা দিই। আমাদের হাসপাতালে  অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অনেকে আছেন যাঁরা ভালো ডাক্তার হওয়ার সাথে সাথে রোগীদের কাছে সমান জনপ্রিয়।এতে আমাদের আরো ভালো পরিষেবা দেওয়ার মানসিকতা তৈরী হয়। জুনিয়রদের আমরা এগুলি উদাহরণ দিই। আমি নিজেও যেকোনও প্রয়োজনে রোগীর পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করিনা। দরকারে ঘটনাস্থলে পৌঁছে সমস্যা খতিয়ে দেখা ও সমাধান, এটি আমার নিজস্ব কাজের পদ্ধতি বলতে পারেন।এতে অযথা সময় নষ্ট হওয়া কমে।
***

“স্বাস্থ্যকর্মী-রোগীর সম্পর্কের মান নেমেছে কারণ স্বাস্থ্যকর্মীরা তো সমাজেরই অঙ্গ“— ডঃ শিবদত্ত চৌধুরী
(আইএমএ-র প্রাক্তন শাখা সভাপতি ও শাখা সম্পাদক)

১৯৮০ সাল থেকে আমি প্র্যাকটিসে আছি। এই ৪২ বছরই কেবল নয়, আমার বাবাও ছিলেন চিকিৎসক। সেই কারণে প্রায় শৈশব থেকে স্বাস্থ্যকর্মী-রোগী সম্পর্কের ব্যাপারটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। সন্দেহ নেই এই সম্পর্কের মান নেমেছে। কিন্তু কেবলই কি স্বাস্থ্যকর্মী-রোগী? সেভাবে দেখলে বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে, শিক্ষক-পড়ুয়া, আইনজীবী-মক্কেল— সব সম্পর্কেরই মান নেমেছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা তো সমাজেরই অঙ্গ। 

দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য ছিলাম। সে সময় আরও ভালভাবে স্বাস্থ্যকর্মী-রোগী সম্পর্কের বিষয়টা বোঝার অবকাশ হয়েছিল। এই সম্পর্কের অবনতির অনেক কারণ আছে। প্রথমত, আমরা অধিকাংশ মানুষই এখন টাকার পিছনে ছুটছি। এতে মানবিক সম্পর্ক ধাক্কা খাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জনস্ফিতী। যে হারে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব নয়। মণি ছেত্রীর মত চিকিৎসকরা দিনে হয়ত পাঁচটা রোগী দেখতেন। এখন এক একজন চিকিৎসক কত রোগী দেখেন, তার হিসেব আর কে রাখেন? তৃতীয়ত, সার্বিক পরিকাঠামোর অভাব। এরও আংশিক কারণ জনস্ফীতি। চতুর্থত, আমরা ব্রিটিশ পদ্ধতিতে ডাক্তারি পড়েছিলাম। তাতে ক্লিনিক্যাল সিস্টেমকে জোর দেওয়া হত। শিক্ষকরা বলতেন, রোগী ঘরে ঢোকার পর থেকে ওঁকে লক্ষ্য করে অনুভব করার চেষ্টা করবেন। এখন আমেরিকান সিস্টেমে জোর দেওয়া হয়। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যকর্মীর অনুভব নয়, যন্ত্রের রিপোর্ট দেখে কাজ কর। তবে এর মধ্যেই সার্বিকভাবে দক্ষিণ ভারতে পরিস্থিতি ভাল। কেন এত বিপুল পরিমাণ রোগী বছরের পর বছর দক্ষিণের হাসপাতালগুলোতে যায়, তা আন্তরিকভাবে খতিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারলে সবারই মঙ্গল। 
(জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সম্পাদক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *