আমাদের ভারত, ২২ এপ্রিল: পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি উদাসীনতা নিয়ে শুক্রবার বসুন্ধরা দিবসে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন দুই বরিষ্ঠ পরিবেশবিদ।
‘এই দেশ এই পরিবেশ’ শিরোনামে এক বিবৃতিতে পরিবেশ আকাদেমির সভাপতি বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় এবং সম্পাদক শংকর কুশারী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “একুশ শতককে পরিবেশ ভাবনার শতক হিসেবে চিহ্নিত করার কথা অনেক বিশিষ্ট মানুষই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বারংবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন। অনেকের ধারণা একুশ শতকে যুদ্ধের অন্যান্য কারণের মধ্যে জলের অধিকার নিয়ে যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল। একদিকে উপকূল এলাকা লোনা জলে ভরে যাওয়ার আশঙ্কায় পৃথিবীর কয়েক কোটি মানুষ দিন গুনছেন আর ঠিক সেই সময়েই মিষ্টি জলের চাহিদা মেটাতে সৃষ্টি হচ্ছে যুদ্ধের বাতাবরণ। এ বড় কঠিন সময়। এরকম একটা কঠিন সময়ে ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আজ থেকে প্রায় তিনবছর আগে। ভারতে পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন আইন প্রণীত হলেও সেগুলি মূলতঃ নিয়ন্ত্রক আইন। কখনোই সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কোনও সুসংহত পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ ভারতবর্ষে হয়নি। বর্তমানে ভারতের কয়েকটি পরিবেশ সমস্যার দিকে নজর দিলে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা অনেক সহজ হবে।
* ১৯৮৬ সালে ভারতবর্ষের সর্ব বৃহৎ নদী গঙ্গার শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল কিন্তু ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এই পরিকল্পনার ব্যর্থতা উপলব্ধি করে “গঙ্গা উপত্যকা কর্তৃপক্ষ” নামে একটি নতুন সংস্থার জন্ম দিয়েছেন – প্রধানমন্ত্রী তার সভাপতি এবং রাজ্যস্তরে মুখ্যমন্ত্রীদের নেতৃত্বে প্রত্যেক রাজ্যে “গঙ্গা উপত্যকা কর্তৃপক্ষ” তৈরি করা হয়। গঙ্গার গঙ্গাপ্রাপ্তি রোধ করার জন্য আবার একটি সরকারি প্রচেষ্টা! কিন্তু দুঃখের বিষয় এই প্রচেষ্টাটিও সাফল্যের মুখ দেখতে সক্ষম হয়নি। গঙ্গার দূষণমুক্তি বা ভাঙ্গনরোধের কোনটিই করা যায়নি। উল্টোদিকে দেশের অন্যান্য নদীগুলিও ভয়ংকরভাবে দূষণাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
* ভারতবর্ষে বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ সহ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৯১ সালে একটি আইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও পূর্ব মেদিনীপুরের মন্দারমনি সমুদ্র উপকূলে জীববৈচিত্র ধ্বংস করে হোটেল নির্মাণের কাজ অব্যাহত আছে। এই অবস্থা যে কেবলমাত্র মন্দারমনিতেই ঘটেছে এমন নয়, দেশের বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলে কৃত্রিম উপায়ে চিংড়ি মাছের চাষ বা নিয়মনীতি অগ্রাহ্য করে হোটেল গড়ে তোলার আয়োজন সর্বজনবিদিত।
* ভারতবর্ষের বিভিন্ন বড় বড় শহরে যানদূষণের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও কেবলমাত্র বিচার বিভাগের আনুকূল্যে কিছু কিছু শহরে যানদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক সমস্যার নিরীখে তা অকিঞ্চিৎকর।
* বিগত কালীপুজোর রাতে সমস্ত বড় বড় শহরে শব্দদানবের তান্ডবে মানুষ অতিষ্ঠ হয়েছে। হাসপাতালের শয্যাশায়ী রুগীরাও তার থেকে পরিত্রাণ পাননি। হাসপাতালের নার্সিং দিদিমণিরা কানে তুলো দিয়ে রুগীর সেবায় ব্যস্ত থেকেছেন ।
* স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দূষণে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে দূষণের তান্ডব অব্যাহত আছে। মাঠের ফসল কালো হয়ে যাচ্ছে, কারখানা সংলগ্ন গ্রামগুলিকে গ্রাস করছে সর্বগ্রাসী দূষণ।
* পাথর খাদান বা ইঁটখোলা শ্রমিকদের পেশাগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যর জন্য অপেক্ষারত সেই সকল শ্রমিকদের বেশিরভাগই আদিবাসী মানুষ।
* রেলগাড়ির ধাক্কায় কিংবা খাদ্যের অভাবে লোকালয়ে প্রবেশ করা হাতি এবং অন্যান্য বন্য জন্তুর মৃত্যু আজ আর কোনও নতুন ঘটনা নয়।
ভারতবর্ষের সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগের চিত্রায়ণে উপরোক্ত ঘটনাগুলি কেবলমাত্র এই বিশাল সমস্যা নিরূপণের একটি ভগ্নাংশ মাত্র । ১৯৭২ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রথম আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। তাঁর মত অনুযায়ী দারিদ্র্য পরিবেশের অন্যতম শত্রু। প্রয়াত নেত্রীর এই উক্তি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পরিবেশ বিষয়ক ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুযায়ী পানীয় জলের অভাবে পৃথিবীর অন্ততঃ দুশো কোটি মানুষ আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এই দুশো কোটি মানুষই এশিয়া বা আফ্রিকায় বসবাসকারী মানুষ। ভারতবর্ষের জনসংখ্যার একটি বড় অংশও জল না পাওয়া এই দুশো কোটির অংশ।
১৯৭২ সালের পর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা ভারতবর্ষের অর্থনীতির উন্নতিতে শ্লাঘা অনুভব করছেন। এমনকি আজকের পৃথিবীর অন্যতম একশো জন ধনী ব্যক্তির নামের তালিকায় ভারতের বেশ কয়েকজন শিল্পপতির নাম লেখা হয়ে গেছে। এতে অনেকেই উৎফুল্ল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্ষুধার সূচকের যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে ভারতের নাম অত্যন্ত লজ্জাজনক ভাবে একেবারে উপরের সারিতে জ্বলজ্বল করছে । অর্থাৎ ভারতবর্ষের কয়েক কোটি মানুষ ক্ষুধার জগতে বাস করেন, দিনান্তে দুমুঠো খেতেও তাঁরা পান না। ক্ষুধার সাম্রাজ্য এদেশের মাটিতে এখনও বিস্তৃতভাবে কায়েম হয়ে আছে!
সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। ৬১ কোটিরও অধিক মানুষ বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন স্থানে লাইনে দাঁড়িয়ে দেশের শাসককুলকে নির্বাচিত করেছেন। ভারতের মসনদে বসার জন্য যে কয়েক হাজার প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, তাঁদের ঝুলিতে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি। একটি কথাই তাঁরা সকলেই চিরকাল বলে এসেছেন বা ভবিষ্যতেও বলবেন, “আমরা জনগণের সঙ্গে ছিলাম, জনগণের সঙ্গে আছি এবং থাকবো!” অতীতেও যাঁরা দেশের মসনদে বসেছেন তাঁরাও প্রত্যেকেই এই একই কথা বলেছেন। কিন্তু ভারতের প্রান্তিক মানুষের দুঃখ অব্যাহত। প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করে ক্রমাগত পুঁজি তৈরি হয়েছে আর তার সুফল চলে গেছে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে। অন্যদিকে অগণিত জনগণ বাধ্যতামূলকভাবে লাঞ্ছিত দূষিত জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছেন। ভারতবর্ষের উন্নতির সোপানে বা ব্যবস্থাপনায় দারিদ্র্য দূরীকরণ ও পরিবেশ সুরক্ষা প্রকৃত অর্থে আজও ব্রাত্যই থেকে গেছে।
একবিংশ শতাব্দী পরিবেশগত সংকটের শতাব্দী হিসাবে চিহ্নিত। কিন্তু ভারতবর্ষ এই সংকটের মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বা সতর্ক সেই প্রশ্ন নিয়ে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা হলেও তা কখনই এমন মাত্রা গ্রহণ করেনি যা আগামীদিনে রাজনীতিবিদদের দেশ চালানোর পরিকল্পনাতে যোগ্য স্থান পায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবীর দশটি নদী শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। যে দশটি নদীকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে দুটি নদী ভারতবর্ষে অবস্থিত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ভারতের নদীগুলিকে সজীব রাখার জন্য কোন বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়নি! দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য যে ব্যাপক পরিমাণের বর্জ্য তৈরি হচ্ছে তারও বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত পূণর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ কোন সর্বভারতীয় নীতি নির্ধারিত হয়নি। দ্রুত ক্ষীয়মান কয়লা ও তেলের ভান্ডার আগামীদিনে যে বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করবে তার মোকাবিলার জন্য আমাদের কোনরকম প্রস্তুতি নেই।
গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলিই দেশের উৎপাদিকা শক্তির নীতি নির্ধারণ করে থাকেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষাকর্তা হিসাবে কাজ করেন। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলির দেশ পরিচালনার কর্মসূচিতে পরিবেশবান্ধব নীতির অনুসরণ ছাড়া পরিবেশ বিষয়ক কোন আইনই কখনই কোন কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে না। কিছু কিছু পরিবেশ বিষয়ক আইন কার্যকরী করতে গেলেও রাজনীতির প্রাঙ্গণের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই অনেক সময়ে তাঁদের অস্থিরতা প্রকাশ করে ফেলেন। তখনই থমকে যায় পরিবেশ আইনের কার্যকারিতা।
সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের অনেক স্থানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছেন। এমনকি কোলকাতার রাজপথ সহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের এই একই উদ্দেশ্যে সাক্ষর সংগ্রহের অভিযান এক নতুন পথের সন্ধান দিচ্ছে। পরিবেশের সুচারু সংরক্ষণ আগামীদিনের অনিবার্য বার্তা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “নতুন কাল মানুষের কাছে নতুন অর্ঘ্য দাবী করে, যারা যোগান বন্ধ করে দেয় তারা বরখাস্ত হয়।”

