সংস্কারের অভাবে ভেঙ্গে পড়ছে, কাঁকসার বনকাটিতে অনাদরে ভগ্নপ্রায় প্রাচীন স্থাপত্য 

জয় লাহা, দুর্গাপুর, ৮ আগষ্ট:  বদলে গেছে রাজত্ব। বদলে গেছে পরিবেশ। পড়ে আছে জমিদারদের ভগ্নপ্রায় মন্দির। সংস্কারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য। ঝোপ জঙ্গলে ভর্তি। খসে পড়ছে মন্দিরের টেরাকোটার কাজ। এমনই দুরবস্থায় রয়েছে কাঁকসার বনকাটির রায় পরিবারের প্রাচীন মন্দির।  

বনকাটি রায় পরিবার। রাজা বল্লাল সেনের কুল গুরুর বংশধর। কথিত আছে রাজার আমলে ঘন জঙ্গল কেটে গ্রাম তৈরী হয়। তাই বনকাটি নামকরণ। রাজা বল্লাল সেন বাংলাদেশ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দীক্ষাগুরু তান্ত্রিক আচার্য মহেশ্বর প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে কাঁকসার গড়জঙ্গলে রাজ্যপাট শুরু করেন। অজয় নদী মাধ্যমে ব্যবসা বানিজ্য সুবিধার্থে বনকাটি গ্রাম পর্যন্ত খাল তৈরী করেন। বনকাটি এলাকা থেকে লাক্ষা ও কাঠ কয়লা কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হত এবং সেখান থেকে মশলাপাতি নিয়ে আসা হত। এককথায় বনকাটি ছিল রাজা বল্লাল সেনের বানিজ্যিক কেন্দ্র। পানাগড়- মোরগ্রাম রাজ্য সড়কের এগারো মাইল মোড় থেকে পশ্চিম দিকে অজয় নদীর লাগোয়া বনকাটি গ্রাম। 

তৎকালীন সময়ে রাজার কুল গুরু মহেশ্বর প্রসাদ ওই গ্রামেই শশ্মানকালী পুজো শুরু করেন। তান্ত্রিক মতে পুজো করতেন। কথিত আছে ছাগ, মেষ ও মহিষ বলির পাশাপাশি ওই সময় নরবলিও দেওয়া হত। যদিও বর্তমানে সেসব প্রথা উঠে গেছে। তবে পরিবারের একজন একফোঁটা রক্ত নিবেদন করেন।

পরবর্তীকালে মহেশ্বর প্রসাদের বংশধর বৃটিশদের সঙ্গে কোনও মামলায় ডিগ্রি পায়। তখন বৃটিশদের কাছ থেকে রায়বাহাদুর খেতাব পায়। আর তারপর থেকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদলে রায় পদবি হয় আচার্যের বংশধরদের। ১৭০০ সালে বনকাটিতে লক্ষ্মী ও বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও রায় পরিবারের পুর্ব পুরুষরা যাতে জল পায়, তার জন্য তাদের নামে পাঁচটি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহেশ্বর প্রসাদের এক বংশধর লক্ষ্মীকান্ত রায়। ১৭০৪ সালে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তীকালে ১৭৩৯ সালে দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। সেসব মন্দির এখনও রয়েছে। তবে টেরাকোটার নকশার কাজ করা ওইসব মন্দির সংস্কারের অভাবে ভগ্নপ্রায়। ঝোপজঙ্গলে ভর্তি। খসে পড়ছে টেরাকোটার কাজ। খসে পড়ছে মন্দিরের চাঙড়। দেওয়াল ফেটে গজিয়ে উঠছে আগছা, গাছ। এককথায় প্রাচীন ওই সব স্থাপত্য ধ্বংসের পথে। একই অবস্থা হয়েছিল কালী মন্দিরের। চলতি বছর মন্দিরটি নিজেদের উদ্যোগে সংস্কার করে রায় পরিবার। যেখানে রয়েছে পঞ্চমুন্ডীর আসন।

পুজোর নিয়মনীতি প্রসঙ্গে রায় পরিবারের প্রবীন বংশধর অনিল কুমার রায় জানান, “তান্ত্রিক মতে এবং পুর্বপুরুষের লেখা পুঁথি দেখে পুজো হয়। পুজোয় বসার আগে শশ্মানে কিছু ক্রীয়াকর্ম করতে হয়। তারপর গুরুপুজন এবং মায়ের বারিঘট নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করা হয়। মায়ের নিজস্ব পুকুর জরুলি পুকুর থেকে বারি নিয়ে আসা হয়। নিশিরাতে মায়ের হোম যজ্ঞ করা হয়, তাতে ১ হাজার ৮ টি বেলপাতা, ৫ কেজি ২৫০ গ্রাম গাওয়া ঘি লাগে। তারপর ভক্তদের ঘি, বেলপাতা থাকে। এছাড়াও পরিবারের একটি ছাগ, একটি মেষ, একটি মহিষ বলি দেওয়া হয়। তারপর ভক্তদের মানত করা ছাগ বলি দেওয়া হয়। সবশেষে নিজের রক্ত একফোঁটা নিবেদন করতে হয়। তারপর পুর্নাহুতি দেওয়া হয়।”

সম্প্রতি স্থানীয় পঞ্চায়েত উদ্যোগী হয়ে প্রাচীন ওইসব স্থাপত্য এলাকার ঝোপ জঙ্গল পরিস্কার করানোর ব্যবস্থা করে। কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ সরাতেই প্রাচীন নিদর্শন বেরিয়ে আসে। ততৎকালীন সময়ের পিতলের মোমবাতিদান, লোহার শেকল, কব্জা। অনিলবাবুর ছেলে লালু রায় জানান, “প্রাচীন এইসব স্থাপত্য সংস্কারের অভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হচ্ছে। তাই সরকারি উদ্যোগে সংস্কার করা হোক। আগামী প্রজন্ম এইসব ইতিহাস দেখতে পাবে। তৎকালীন সময়কার ইতিহাস জানতে পারবে। এখনও বাইরের লোকজন এসব মন্দির দেখতে আসে। তাই রক্ষনাবেক্ষণ দরকার।” স্থানীয় বনকাটি পঞ্চায়েত প্রধান পিন্টু বাগদী জানান, “মন্দিরের কারুকার্য ও নকশা এখনও ইতিহাস বহন করে। মাঝে মধ্যে মন্দিরের আশপাশের জঙ্গল পরিস্কার করানো হয়। মন্দিরের আগাছার জঙ্গলও পরিস্কার করানো হয়।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *