স্নেহাশীষ মুখার্জি, আমাদের ভারত, নদিয়া, ২৫ আগস্ট: নদিয়া জেলা আগেভাগেই নির্মল জেলা হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা হওয়ার পরেও এখনো বহু মানুষ আছে যারা টাকার অভাবে পায়খানা তৈরি করতে পারেনি। আবার কেউ কেউ গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্যকে টাকা দিলেও মেলেনি পায়খানা। যার ফলে, প্রাতঃকৃত্য সারতে মাঠে যান ছেলেমেয়ে নিয়ে সকলেই। এমনই চিত্র ধরা পরল নদিয়ার গাংনাপুর থানার মাঝের গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণপুর এলাকায়।
এই গ্রামটি মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। পায়খানা তো দূরের কথা অনেকেরই ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। আবেদন করেও মেলেনি আবাস যোজনার ঘর। ১৩০ ঘর আদিবাসীর মধ্যে মাত্র ৩০ জন আবাস যোজনার ঘর পেয়েছেন। পঞ্চায়েত সদস্যের কাছে বারবার দরবার করা হলেও কোনও সুরাহা হয়নি। আম্ফান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তরাও কোনো সাহায্য পাননি। অসহায় গরিব মানুষগুলো বারবার আবেদন নিবেদন করেও কোন ফল না মেলায় আশা ছেড়েই দিয়েছেন।
গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য বাপ্পা ঘোষ জানান, “মিথ্যে অভিযোগ করা হচ্ছে ঘরের ক্ষেত্রে। আর আমফান ঝড়ের সময় সেভাবে ক্ষতি না হওয়ায় সাহায্য মেলেনি। আর পায়খানার ক্ষেত্রে ফ্যামিলিতে বেশি লোক থাকলে সবাইকে দেওয়া সম্ভব নয়, তাছাড়া মাঠে যাওয়া ওটা ওদের অভ্যাস।”
রানাঘাট উত্তর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক অসীম বিশ্বাস বলেন, “বিষয়টা হচ্ছে 2013 -2018 বাণী রায় যখন জেলার সভাধিপতি ছিলেন সেই সময় কেন্দ্রের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। সেই সময় 2014 সালে বিজেপি সরকার আসে মোদীজির নেতৃত্বে। স্বচ্ছ ভারত অভিযানের জন্য প্রত্যেকটা প্রান্তিক মানুষ, গরিব মানুষ, তপশিলি সম্প্রদায়ের লোকজন যেখানে আছে, সেখানে হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু আমরা দেখেছি জেলার এক বৃহৎ অংশের মানুষ যারা তপশিলি আদিবাসী আছেন তারা এই স্বচ্ছ ভারত বা নির্মল বাংলা থেকে বঞ্চিত। বাণীরায় তৎকালীন সময়ের জেলাশাসক পি বি সেলিমের সঙ্গেযোগসাজশে এই জেলাকে ভারতবর্ষের মধ্যে স্বচ্ছ জেলা হিসেবে বা নির্মল জেলা হিসেবে ঘোষণা করবার জন্য ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকের কাছ থেকে লিখিত নেওয়া হয়েছিল যে আমাদের বাড়িতে পায়খানা আছে বা আমি স্বচ্ছ ভারতের পরিষেবা পেয়েছি। সেই তথ্যটা দিয়ে তৎকালীন জেলা সভাপতি কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক থেকে একটা পুরস্কার পেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে নদিয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এখনোও দেখা যায় যে তপশিলি জাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের এক বৃহৎ অংশ এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত।

হরিণঘাটার বিজেপি বিধায়ক তথা বিশিষ্ট কবিয়াল অসীম সরকার মাঝের গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল সদস্য বাপ্পা ঘোষের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, “এর চাইতে বাজে কথা কিছু থাকে না। সবার জন্য টয়লেটের ব্যবস্থা করেছেন মোদীজি। কিন্তু এই টাকাগুলো ওরা খেয়ে ফেলেছে। আমার বাড়িও নদিয়া জেলায়। আমার এখানেও অনেক মানুষ আছে যারা এখনো টয়লেট পায়নি। আর যারা পেয়েছে তাদের টাকা দিতে হয়েছে। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের যত প্রকল্প আছে সেখান থেকে টাকা মেরে মেরে শাসকদল পেট মোটা করেছে। এইজন্যই তো আমাদের চোর ধরো জেল ভরো অভিযান।”
নদিয়া জেলার মেন্টর তথা প্রাক্তন জেলা সভাধিপতি বাণী কুমার রায় জানান, “স্বচ্ছ ভারত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে একটা তদন্ত হয়। ইউএনএ এগুলো তদন্ত করে। ইউএনএ আমাদেরকে জানায় আমরা কিভাবে কাজটাকে ত্বরান্বিত করব। প্রথমবার কিছু কিছু ভুল ত্রুটি ওরা আমাদেরকে জানায় আমরা সেগুলো সংশোধন করি। তারপর আবার দুবার তদন্ত হয়। ২০১৫ সালে আমরা ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম হয়েছি সেটা কথা নয়। ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের টিম এনকোয়ারি করেছে। ইউ এন এ (রাষ্ট্রপুঞ্জ) থেকে প্রতিনিধি দল এসে তদন্ত করেছে। এইরকম প্রত্যেকটা জায়গা থেকে আলাদা আলাদা ভাবে তদন্ত হয়েছে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে ওরা আমাদের জানিয়েছে। আমরা সেটা পেয়েছি। তদন্ত ছাড়া তো কিছু হয়নি। কারো যোগসাজশের প্রশ্নই ওঠে না।
আমরা যখন প্রথম এই স্বচ্ছ ভারত অভিযান শুরু করি তখন একটা সার্ভে করেছিলাম। সেই সার্ভের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেকটা বাড়ি বাড়ি আমরা টয়লেট করে দিই। টয়লেট করে দেওয়ার পর দেখা যায় পরে একটা পরিবার ভাগ হয়ে গেছে। আমরা তো তাকে প্রথমে একটা টয়লেট দিয়েছিলাম। এরপর পরিবার ভাগ হতেই পারে। আমরা পঞ্চায়েতকেও বলেছিলাম যে যখন বাড়ি তৈরীর অনুমোদন দেওয়া হবে তখন টয়লেট থাকা বাধ্যতামূলক।”
রানাঘাট দু নম্বর ব্লকের বিডিও খোকন বর্মন বলেন বিষয়টা শুনেছি, টয়লেট থাকা দরকার, যদি না থাকে ব্যবস্থা করে দেব।

